মূল লেখায় যান

রাতের বাড়ি · পর্ব ২

রাতের বাড়ি — পর্ব ২

চিলেকোঠার ট্রাঙ্কে পাওয়া গেল ১৯৬৪ সালের একটা ডায়েরি আর একটা ছোট ফ্রক। নূরী নামের মেয়েটা এ বাড়িতেই থাকত—আর যেদিন সে হারিয়ে যায়, সেদিনও উঠানের কল সারা রাত খোলা ছিল।

ততমসী আফরোজ@tamosi
  • ৫ মিনিট
  • ১৪ হাজার বার পড়া হয়েছে
  • ৮৯০ জন পছন্দ করেছেন
রাতের বাড়ি — পর্ব ২

হারুন মিয়ার নীরবতা

শিরিন জানত, হারুন মিয়া কিছু জানে। বুড়ো মানুষটা রোজ সকালে এসে উঠান ঝাঁট দেয়, চৌবাচ্চার কলটা একবার ঘুরিয়ে দেখে, তারপর চিলেকোঠার দিকে তাকিয়ে কী যেন বিড়বিড় করে। কিন্তু জিজ্ঞেস করলেই সে চোখ নামিয়ে ফেলে।

"পুরান কথা, আম্মা। পুরান কথা ঘাঁটলে পুরান মানুষ জাগে।"

মাহবুবকে বলে কোনো লাভ হয়নি। তিনি ধৈর্য ধরে শুনেছিলেন, তারপর বলেছিলেন, "শিরিন, তুমি নতুন বাড়িতে ঠিকমতো ঘুমাচ্ছ না। ভেজা ছাপ বিড়ালেরও হতে পারে। আর আয়নায় আলোর খেলা—" তিনি বাক্যটা শেষ করেননি, কিন্তু তাঁর চোখে যে দুশ্চিন্তা, সেটা ভূতের জন্য নয়, স্ত্রীর জন্য।

শিরিন তাই ঠিক করল, প্রশ্নের উত্তর সে নিজেই খুঁজবে।


চিলেকোঠার ট্রাঙ্ক

বৃহস্পতিবার দুপুরে, যখন হারুন মিয়া জুমার আগের দিনের বাজারে গেছে আর মিতু স্কুলে, শিরিন একটা স্ক্রু-ড্রাইভার আর হাতুড়ি নিয়ে ছাদে উঠল। তালাটা এত পুরোনো যে দুই ঘা দিতেই কড়া থেকে খুলে এল।

দিনের আলোয় ঘরটা রাতের মতো ভয়ংকর নয়। ছোট একটা কামরা, একটা ভাঙা খাট, দেয়ালে সেই বড় আয়না—সেগুন কাঠের ফ্রেম, কোনায় লতাপাতার খোদাই। জানালা একটাই, তাও ইট দিয়ে বন্ধ করা। আর খাটের নিচে একটা কালো টিনের ট্রাঙ্ক।

ট্রাঙ্ক খুলতেই কর্পূরের সেই গন্ধ। ভেতরে ভাঁজ করা একটা ছোট হলুদ ফ্রক, কলার জুড়ে হাতের কাজ করা ফুল। কয়েকটা কাচের চুড়ি। একটা পুরোনো স্লেট, যার ওপর আজও আবছা দেখা যায় একটা এক্কা-দোক্কার ঘর—সাতটা ঘর। আর একটা খাকি মলাটের ডায়েরি।

প্রথম পাতায় পরিষ্কার হাতে লেখা: নূরজাহান বেগম, সূত্রাপুর, ১৯৬৪।

কিন্তু হাতের লেখাটা নয় বছরের মেয়ের নয়। আরেকটু বড় কারও—গোটা গোটা অক্ষর, স্কুলের খাতার মতো যত্নে লেখা। শিরিন পাতা ওলটাল।

শিরিন ধীরে ধীরে পড়ে গেল। ডায়েরিটা লিখেছে নূরীর বড় ভাই, বয়স তখন তেরো কি চৌদ্দ। প্রতিটি পাতায় একই গল্প—সৎমায়ের কঠোরতা, বাবার দীর্ঘ অনুপস্থিতি, আর একটা ছোট মেয়ের অদ্ভুত ধৈর্য। নূরী কখনো কাঁদত না। শুধু চিলেকোঠা থেকে বের হলে উঠানে গিয়ে চৌবাচ্চার পানিতে হাত ডুবিয়ে বসে থাকত। বলত, পানি ঠান্ডা, পানি কাউকে বকে না।

তারপর একটা পাতায় তারিখ, আর তার নিচে কাঁপা হাতের লেখা:

বাকি পাতাগুলো ফাঁকা। শুধু শেষ পাতায় একটা লাইন, অন্য কালিতে, অনেক পরে লেখা মনে হয়:

"আমি এই বাড়ি ছাড়ব না। যতদিন নূরী ফেরে না।"


আয়নার ভেতর

সেদিন বিকেলে মিতু স্কুল থেকে ফিরে খেতে বসল না। সোজা উঠানে গিয়ে চক বের করল। শিরিন জানালা দিয়ে দেখল, মেয়েটা ছয়টা ঘর আঁকল। তারপর থমকে দাঁড়াল, যেন কারও কথা শুনছে। তারপর চৌবাচ্চার দিকে এগিয়ে গেল।

"মিতু!"

মিতু ফিরে তাকাল। তার চোখ দুটো ঘোলাটে, যেন ঘুমের মধ্যে হাঁটছে। "আম্মু, নূরী আপা বলছে ওর খুব শীত লাগে। ওর ঘরে জানালা নাই।"

শিরিন দৌড়ে গিয়ে মেয়েকে জড়িয়ে ধরল। মিতুর গা বরফের মতো ঠান্ডা। অথচ ভাদ্রের দুপুর, উঠানে রোদ গনগন করছে।

সে রাতে শিরিন মিতুকে নিজের পাশে শোয়াল। মাহবুব অফিসের কাজে চট্টগ্রাম গেছেন, দুই দিন ফিরবেন না। রাত একটা পর্যন্ত শিরিন জেগে রইল, তারপর কখন চোখ লেগে এল টের পায়নি।

ঘুম ভাঙল পানির শব্দে। বিছানার পাশে হাত দিয়ে দেখল—মিতু নেই।

ঘড়িতে ৩টা ০২।

সে দৌড়ে উঠানে নামল। কল খোলা। চৌবাচ্চা উপচে পড়ছে। কিন্তু মিতু নেই। ভেজা ছাপ এবার দুই জোড়া—একটা বড়, একটা ছোট। পাশাপাশি। সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেছে।

ছাদে পৌঁছে শিরিন দেখল, চিলেকোঠার দরজা হাট করে খোলা। ভেতরে মিতু দাঁড়িয়ে আছে আয়নার সামনে, পিঠ ফিরিয়ে। আয়নায় মিতুর প্রতিবিম্ব—কিন্তু সেটা একা নয়। প্রতিবিম্বের মিতুর হাত ধরে আছে হলুদ ফ্রক পরা একটা মেয়ে, ভেজা চুল মুখের ওপর নেমে এসেছে।

আর আয়নার ভেতরের ঘরটা এই ঘর নয়। সেখানে ইট দিয়ে বন্ধ করা জানালাটা খোলা। বাইরে পূর্ণিমার চাঁদ। খাটের ওপর নতুন চাদর। দেয়ালে একটা ক্যালেন্ডার—১৯৬৪।

"মিতু, আমার কাছে আয়।"

মিতু নড়ল না। কিন্তু আয়নার ভেতরের মেয়েটা ধীরে ধীরে মুখ তুলল। ভেজা চুল সরে গেল। শিরিন একটা নয় বছরের মেয়ের মুখ দেখল—ফ্যাকাশে, শান্ত, আর অসম্ভব দুঃখী। মেয়েটা ঠোঁট নাড়ল। শব্দটা এল আয়নার কাচ ভেদ করে, খুব ক্ষীণ।

তারপর আয়নাটা হঠাৎ কুয়াশায় ঢেকে গেল। মিতু শিরিনের কোলে ঢলে পড়ল, গভীর ঘুমে।

পেছনে সিঁড়ির মুখে টর্চের আলো। হারুন মিয়া। হাঁপাচ্ছে, সাদা দাড়ি বেয়ে ঘাম গড়াচ্ছে। সে আয়নার দিকে তাকাল, তারপর শিরিনের হাতে ধরা খাকি মলাটের ডায়েরিটার দিকে।

অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বুড়ো মানুষটা বলল, "ডায়েরিটা আমার লেখা, আম্মা।"

শিরিন তার দিকে তাকিয়ে রইল।

"নূরী আমার বোন। ষাট বছর ধইরা আমি ওরে খুঁজি।" হারুন মিয়ার গলা ভেঙে গেল। "কিন্তু ও কোনোদিন আমারে দেখা দেয় নাই। দেখা দিছে আপনার মাইয়ারে। কারণ আপনার মাইয়া ওর বয়সী।"

সে আয়নার ফ্রেমে হাত রাখল, যেমন করে মানুষ ঘুমন্ত শিশুর মাথায় হাত রাখে।

"আর আমার ভয় কী জানেন, আম্মা? যে নূরীরে ওই রাতে দেয়ালে রাইখা গেছে, সেও এই বাড়ি ছাইড়া যায় নাই।"

(চলবে)

ধারাবাহিক

রাতের বাড়ি

০/৩ পর্ব পড়া

  1. ১রাতের বাড়ি — পর্ব ১৫ মি.
  2. ২রাতের বাড়ি — পর্ব ২৫ মি.
  3. ৩রাতের বাড়ি — পর্ব ৩৫ মি.

১৪ হাজার বার পড়া হয়েছে · প্রকাশ ২ আগস্ট ২০২৬

এরপর কী পড়বেন

সব দেখুন
জিনের গল্প

সিরিজ: জিনের চিঠি · পর্ব ১

জিনের চিঠি — পর্ব ১

হাওরপাড়ের এক প্রাইমারি স্কুলে বদলি হয়ে এলেন আনোয়ার মাস্টার। প্রথম রাতেই টেবিলের ওপর পাওয়া গেল একটা চিঠি—আতরের গন্ধ মাখা, প্রেরকের জায়গায় লেখা শুধু: প্রতিবেশী।

কাকালবেলা মাহমুদ
  • ৫ মিনিট
  • ৯.৮ হাজার বার পড়া হয়েছে

৯ আগস্ট ২০২৬

জিনের গল্প

সিরিজ: জিনের চিঠি · পর্ব ২

জিনের চিঠি — পর্ব ২

ঠিকাদার জব্বার শেখ কারও কথা শোনেননি। করাত নিয়ে রাতের অন্ধকারে বুড়া বটের কাছে গিয়েছিলেন। ভোরে আনোয়ার মাস্টারের টেবিলে এল শেষ চিঠি—আর সেই চিঠিতে লেখা ছিল তাঁর দাদাজানের নাম।

কাকালবেলা মাহমুদ
  • ৬ মিনিট
  • ৮.৬ হাজার বার পড়া হয়েছে

২৩ আগস্ট ২০২৬

ভূতের গল্প

স্কন্ধকাটার শেষ ট্রেন

রাত বারোটার লোকাল ট্রেনে একা এক যাত্রী। প্ল্যাটফর্মের লোকটা হাত নাড়ছে ঠিকই, কিন্তু তার কাঁধের ওপর মাথাটা নেই।

নিনিশাচর রায়হান
  • ১১ মিনিট
  • ২৫ হাজার বার পড়া হয়েছে

৩ জুলাই ২০২৬