জিনের চিঠি · পর্ব ২
জিনের চিঠি — পর্ব ২
ঠিকাদার জব্বার শেখ কারও কথা শোনেননি। করাত নিয়ে রাতের অন্ধকারে বুড়া বটের কাছে গিয়েছিলেন। ভোরে আনোয়ার মাস্টারের টেবিলে এল শেষ চিঠি—আর সেই চিঠিতে লেখা ছিল তাঁর দাদাজানের নাম।
- ৬ মিনিট
- ৮.৬ হাজার বার পড়া হয়েছে
- ৫৪০ জন পছন্দ করেছেন
সতর্কবাণী
রাস্তার কাজ শুরু হলো পৌষের প্রথম সপ্তাহে। ট্রাকে করে ইট-বালু এল, এল দশ-বারোজন শ্রমিক। স্কুলমাঠের এক কোনায় তারা তাঁবু খাটাল। দিনভর মাটি কাটার শব্দ, রোলারের গর্জন, আর সন্ধ্যায় শ্রমিকদের রান্নার ধোঁয়া।
আনোয়ার চেয়ারম্যানকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। বলেছিলেন, রাস্তাটা পুকুরের পূর্ব পাশ দিয়ে ঘুরিয়ে নিলে মাত্র দুশো গজ বাড়ে, গাছটা বাঁচে, পুকুরটাও। চেয়ারম্যান রাজি ছিলেন—গ্রামের মানুষ হিসেবে বুড়া বটের কথা তিনি জানতেন। কিন্তু জব্বার শেখ হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।
"দুইশো গজ মানে দুই লাখ টাকার মাল, মাস্টার সাব। গাছের লাইগা কেউ টাকা দিব?"
সেদিন রাতে আনোয়ারের টেবিলে তৃতীয় চিঠি এল।
আনোয়ার চিঠিটা নিয়ে পরদিন জব্বার শেখের তাঁবুতে গেলেন। জব্বার চিঠি পড়ে হো হো করে হাসলেন, তারপর সেটা দলা পাকিয়ে পাশের চুলার আগুনে ফেলে দিলেন।
কাগজটা পুড়ল না।
আগুনের মধ্যে কয়েক সেকেন্ড পড়ে থেকে সেটা যেমন ছিল তেমনই রইল—দলা পাকানো, হলদে, অক্ষত। শুধু আতরের গন্ধটা আগুনের তাপে ছড়িয়ে পড়ল তাঁবুর ভেতর। জব্বারের হাসি থেমে গেল। একজন শ্রমিক উঠে তাঁবু থেকে বেরিয়ে গেল, আর ফিরল না—সেই রাতেই সে বাড়ির পথ ধরেছিল।
অসুখ
পরের সাত দিনে পাঁচজন শ্রমিক অসুস্থ হলো। অদ্ভুত অসুখ—জ্বর নেই, ব্যথা নেই, কিন্তু রাতে ঘুমাতে পারে না। সবাই একই কথা বলে: রাতে তাঁবুর বাইরে কেউ হাঁটে, খুব লম্বা পায়ে, আর তাঁবুর কাপড়ের গায়ে একটা ছায়া পড়ে যার মাথা বটগাছের সবচেয়ে উঁচু ডাল ছুঁয়ে যায়।
একজন বলল, সে রাতে পুকুরপাড়ে দেখেছে বহু মানুষ সারি বেঁধে বসে আছে—সাদা পোশাক, মাথা নিচু, যেন কারও জন্য অপেক্ষা করছে। সে চোখ কচলে আবার তাকাতেই কেউ নেই।
অন্য শ্রমিকেরা একে একে চলে যেতে লাগল। জব্বার শেখ শহর থেকে নতুন লোক আনলেন, বেশি মজুরিতে। তারাও তিন দিনের বেশি থাকল না।
গ্রামের বয়স্ক মাওলানা সাহেব আনোয়ারকে ডেকে নিয়ে বললেন, "মাস্টার সাব, আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে ওনারাও আছেন। কোরআনে ওনাদের কথা আছে। ওনারা আমাদের মতোই—কেউ ভালো, কেউ মন্দ। এই বটের বাসিন্দারা কোনোদিন গ্রামের ক্ষতি করে নাই। বরং বন্যার বছর এই গাছের তলায় যারা আশ্রয় নিছিল, কেউ ডোবে নাই। কিন্তু ঘর ভাঙলে, মানুষও তো ছাড়ে না।"
আনোয়ার জিজ্ঞেস করলেন, "আপনি কি ওনাদের দেখেছেন?"
মাওলানা সাহেব মৃদু হাসলেন। "দেখার দরকার হয় না। সম্মান করলেই হয়।"
করাতের রাত
মাঘের এক কুয়াশা-ঘেরা রাতে জব্বার শেখ আর থাকতে পারলেন না। কাজ তিন সপ্তাহ পিছিয়ে গেছে, ঠিকাদারির বিল আটকে আছে, শহরে তাঁর নামে গুজব ছড়াচ্ছে। তিনি ঠিক করলেন, গাছটা নিজে কাটবেন। রাতের অন্ধকারে, কাউকে না জানিয়ে। সকালে সবাই দেখবে গাছ নেই, তখন আর কারও কিছু বলার থাকবে না।
তাঁর সঙ্গে গেল শুধু তাঁর ভাগ্নে রফিক, একটা ইঞ্জিনচালিত করাত নিয়ে।
রাত একটার দিকে আনোয়ারের ঘুম ভাঙল করাতের শব্দে। কর্কশ, একটানা, কুয়াশার ভেতর দিয়ে ভেসে আসা যান্ত্রিক আর্তনাদ। তিনি টর্চ নিয়ে বেরিয়ে এলেন।
পুকুরপাড়ে কুয়াশা এত ঘন যে দুই হাত দূরের কিছু দেখা যায় না। টর্চের আলো সাদা দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে। শুধু করাতের শব্দ। তারপর হঠাৎ—থেমে গেল।
নিস্তব্ধতা। ঝিঁঝিও ডাকছে না।
তারপর কুয়াশার ভেতর থেকে রফিকের চিৎকার: "মামা! মামা, কই গেলেন? মামা!"
আনোয়ার শব্দ লক্ষ্য করে দৌড়ালেন। বটগাছের গোড়ায় রফিক বসে আছে, দুই হাতে মাথা চেপে ধরে, থরথর করে কাঁপছে। করাতটা পাশে পড়ে আছে, ইঞ্জিন বন্ধ। গাছের গুঁড়িতে একটা হালকা আঁচড় মাত্র।
"মামা কোথায়?"
রফিক ফিসফিস করে বলল, "মামা করাত চালাইল। তারপর গাছের ভেতর থিকা একটা হাত বাইর হইল। সাদা। লম্বা। মামার কাঁধে রাখল। মামা ঘুইরা তাকাইল—তারপর হাঁটা শুরু করল। আমি ডাকলাম। মামা শুনে নাই। কুয়াশার ভিতরে হাঁইটা গেল।"
সারা রাত গ্রামের লোক হারিকেন আর টর্চ নিয়ে খুঁজল। জব্বার শেখকে পাওয়া গেল ভোরবেলা, গ্রাম থেকে চার মাইল দূরে, হাওরের মাঝখানের এক শুকনো চরে। তিনি বসে ছিলেন মাটিতে, দুই চোখ খোলা, ঠোঁট নড়ছে—গুনছেন। এক, দুই, তিন... একশো... একশো এক... কেউ জানে না কী গুনছিলেন।
চরটার চারপাশে কাদায় শুধু তাঁর নিজের পায়ের ছাপ—একটা বিশাল বৃত্ত, বারবার, বারবার, যেন সারা রাত তিনি একই বৃত্তে হেঁটেছেন।
তিনি বেঁচে ছিলেন। চল্লিশ দিন কথা বলেননি। তারপর যেদিন প্রথম মুখ খুললেন, সেদিন বললেন একটাই কথা: "রাস্তা ঘুরাইয়া দাও।"
শেষ চিঠি
রাস্তা ঘুরিয়ে দেওয়া হলো পুকুরের পূর্ব পাশ দিয়ে। বুড়া বট দাঁড়িয়ে রইল আগের মতোই।
রাস্তার কাজ শেষ হওয়ার রাতে আনোয়ারের টেবিলে শেষ চিঠিটা এল। এবার কাগজের সঙ্গে ছিল একটা ছোট জিনিস—একটা পুরোনো রুপার কলম, মুখে খোদাই করা দুটি অক্ষর।
আনোয়ার কলমটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইলেন। খোদাই করা অক্ষর দুটি: আ. ক.
তাঁর দাদাজান সারা জীবন শিক্ষকতা করেছেন, কিন্তু কোথায় কোথায় করেছেন, আনোয়ার কখনো জানতে চাননি। শৈশবে শুধু একটা গল্প শুনতেন—দাদাজান বলতেন, এক হাওরের দেশে তাঁর কিছু বন্ধু আছে, যাদের কেউ দেখতে পায় না, কিন্তু তারা কখনো কথা দিয়ে কথা ভাঙে না।
আনোয়ার ভেবেছিলেন ওটা রূপকথা।
পরদিন তিনি শিক্ষা অফিসে চিঠি লিখলেন। বদলির আবেদন নয়—স্থায়ী থাকার আবেদন।