রাতের বাড়ি · পর্ব ৩
রাতের বাড়ি — পর্ব ৩
পূর্ণিমার রাতে আবার খুলে যায় উঠানের কল। আয়নার পেছনের দেয়াল ভাঙতেই বেরিয়ে আসে ষাট বছরের পুরোনো এক সত্য—আর বাড়ির ভেতরে জেগে ওঠে আরেকজন, যে কখনো চলে যায়নি।
- ৫ মিনিট
- ১৩ হাজার বার পড়া হয়েছে
- ৯১০ জন পছন্দ করেছেন
পূর্ণিমার আগের দিন
মাহবুব চট্টগ্রাম থেকে ফিরে এসে দেখলেন, তাঁর স্ত্রী আর এক বুড়ো কেয়ারটেকার মিলে চিলেকোঠার আয়নাটা দেয়াল থেকে নামানোর চেষ্টা করছে। প্রথমে রাগ হয়েছিল, তারপর শিরিন তাঁর হাতে ডায়েরিটা দিল। তিনি পড়লেন। পড়া শেষ হলে অনেকক্ষণ ছাদে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানলেন—যে সিগারেট তিনি সাত বছর আগে ছেড়ে দিয়েছিলেন।
"আমি এসব বিশ্বাস করি না," শেষে বললেন। "কিন্তু যদি ওই দেয়ালের ভেতরে সত্যিই কিছু থাকে, তাহলে সেটা পুলিশের ব্যাপার। ভূতের নয়।"
শিরিন জানত, এটা মাহবুবের রাজি হওয়ার ভঙ্গি।
হারুন মিয়া বলল, কাল পূর্ণিমা। নূরী যে রাতে হারিয়েছিল, সেটাও ছিল আষাঢ়ের পূর্ণিমা। ষাট বছরে যতবার পূর্ণিমায় এ বাড়িতে কোনো বাচ্চা থেকেছে, ততবার উঠানের কল খুলে গেছে। আর ততবার সেই পরিবার এক মাসের মধ্যে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে।
"কেন চলে গেছে?" মাহবুব জিজ্ঞেস করলেন।
হারুন মিয়া উত্তর দেওয়ার আগে একবার সিঁড়ির দিকে তাকাল। "কারণ নূরী ডাকে খেলার জন্য। কিন্তু আরেকজন ডাকে অন্য কারণে।"
যে কখনো যায়নি
ডায়েরিতে সৎমায়ের নাম লেখা ছিল না। হারুন মিয়া নামটা উচ্চারণও করে না। শুধু বলে, "উনি।" নূরী হারানোর দুই বছর পর উনি মারা যান—এই চিলেকোঠাতেই, এক বর্ষার রাতে, আয়নার সামনে বসে থাকা অবস্থায়। ডাক্তার বলেছিল হার্ট অ্যাটাক। কিন্তু যে বুয়া প্রথম লাশ দেখেছিল, সে বলেছিল মহিলার দুই চোখ খোলা ছিল, আর তিনি এমনভাবে আয়নার দিকে তাকিয়ে ছিলেন, যেন আয়নার ভেতর থেকে কেউ তাঁকে দেখছে।
"তারপর থেকে," হারুন মিয়া বলল, "রাত তিনটায় কল খোলে নূরী। আর সিঁড়িতে যে চুড়ির শব্দ হয়—সেইটা উনার।"
শিরিন শিউরে উঠল। গত দুই সপ্তাহে সে বেশ কয়েকবার গভীর রাতে সিঁড়িতে চুড়ির টুংটাং শব্দ শুনেছে। ভেবেছিল পাশের বাড়ি থেকে আসছে।
রাত তিনটা দুই
পূর্ণিমার রাতে কেউ ঘুমাল না। মিতুকে মাঝখানে রেখে শিরিন আর মাহবুব বিছানায় বসে রইলেন। হারুন মিয়া বসল বারান্দায়, হাতে একটা হারিকেন, ঠোঁটে দোয়া-দরুদ।
রাত আড়াইটায় বিদ্যুৎ চলে গেল। গোটা গলি অন্ধকার। শুধু জানালা দিয়ে উঠানে পূর্ণিমার আলো, দুধের মতো সাদা।
তিনটা বাজার একটু আগে সিঁড়িতে শব্দ হলো। টুং। টুং। টুং। কাচের চুড়ি। ধীর পায়ে কেউ নামছে। এক ধাপ। আরেক ধাপ।
মাহবুব টর্চ জ্বেলে দরজার দিকে ধরলেন। সিঁড়ি ফাঁকা। কিন্তু শব্দটা থামল না। নেমে এল দোতলার বারান্দায়। তাদের দরজার সামনে এসে থামল।
তারপর একটা মহিলার গলা, মিষ্টি, শান্ত, কিন্তু তার ভেতরে একটা ধাতব শীতলতা:
মিতু ঘুম থেকে উঠে বসল। চোখ খোলা, কিন্তু দৃষ্টি শূন্য। শিরিন মেয়েকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তখনই উঠান থেকে পানির শব্দ এল—কল খুলে গেছে। আর পানির শব্দ ছাপিয়ে একটা বাচ্চা মেয়ের চিৎকার, পরিষ্কার, মরিয়া:
"মিতু, দরজা খুলিস না! ও আমারেও এইভাবে ডাকছিল!"
দরজার ওপাশে চুড়ির শব্দ হঠাৎ দ্রুত হলো, যেন কেউ রাগে হাত ঝাঁকাচ্ছে। দরজার কাঠে নখ আঁচড়ানোর শব্দ। তারপর সব থেমে গেল।
হারুন মিয়া বারান্দা থেকে চিৎকার করে উঠল, "উনি ছাদে যাইতেছে! আয়নার দিকে!"
দেয়ালের ভেতর
মাহবুব আর হারুন মিয়া শাবল নিয়ে ছাদে উঠলেন। শিরিন মিতুকে কোলে নিয়ে পেছনে। চিলেকোঠার আয়নাটা চাঁদের আলোয় রুপার মতো জ্বলছে। আর আয়নার ভেতর দাঁড়িয়ে আছে এক মহিলা—শাড়ির আঁচল মাথায়, দুই হাতে লাল কাচের চুড়ি, মুখটা স্থির হাসিতে জমে আছে। তার পেছনে, দেয়ালের দিকে, হলুদ ফ্রক পরা মেয়েটা কুঁকড়ে বসে আছে।
মাহবুব আর কিছু ভাবলেন না। শাবলের এক ঘায়ে আয়নাটা ভেঙে পড়ল। কাচের টুকরো ছড়িয়ে পড়ল মেঝেতে, আর প্রতিটা টুকরোয় এক মুহূর্তের জন্য সেই মহিলার মুখ দেখা গেল—তারপর মিলিয়ে গেল।
আয়নার পেছনের দেয়ালটা আশপাশের দেয়ালের চেয়ে নতুন। ইটের গাঁথুনি অসমান। হারুন মিয়া কাঁপা হাতে শাবল চালাল। একটা ইট খসল। তারপর আরেকটা।
ভেতরে একটা ফাঁপা জায়গা। আর সেখানে, ষাট বছরের ধুলোর নিচে, একটা ছোট কঙ্কাল—হাঁটু মুড়ে বসে থাকা ভঙ্গিতে। হাড়ের পাশে একটা কাচের চুড়ি। লাল রঙের।
হারুন মিয়া মেঝেতে বসে পড়ল। ষাট বছর পর সে কাঁদল, শিশুর মতো, শব্দ করে।
ভোরের আজানের সময় উঠানের কলটা আপনা থেকেই বন্ধ হয়ে গেল।
পুলিশ এল, সাংবাদিক এল, পুরান ঢাকার অলিগলিতে কয়েক সপ্তাহ গল্পটা ঘুরে বেড়াল। নূরজাহান বেগমকে দাফন করা হলো আজিমপুরে, তাঁর মায়ের কবরের পাশে। জানাজায় হারুন মিয়া সামনের কাতারে দাঁড়িয়ে ছিল, সোজা হয়ে, যেন বহু বছরের কুঁজো পিঠটা হঠাৎ হালকা হয়ে গেছে।
মাহবুবরা সেই মাসেই বাড়ি ছেড়ে দিলেন। ধানমন্ডিতে ছোট একটা ফ্ল্যাট, উঠান নেই, চৌবাচ্চা নেই, চিলেকোঠা নেই।
নতুন বাসায় যাওয়ার প্রথম সপ্তাহে এক বিকেলে শিরিন দেখল, মিতু বারান্দার মেঝেতে চক দিয়ে এক্কা-দোক্কার ঘর আঁকছে। ছয়টা ঘর। শিরিনের বুক ধক করে উঠল।
"সাত নম্বরটা আঁকবি না?"
মিতু মাথা নাড়ল। "নূরী আপা বলছে, সাত নম্বর ঘরটা ওর ছিল। ও এখন আর খেলবে না। ও ঘুমাবে।"
শিরিন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
তারপর মিতু, চক হাতে, খুব স্বাভাবিক গলায় যোগ করল:
"কিন্তু আপা বলছে, ওই বাড়িটা এখনো একা না। আর নতুন যারা আসছে, তাদেরও একটা ছোট মেয়ে আছে।"