জিনের চিঠি · পর্ব ১
জিনের চিঠি — পর্ব ১
হাওরপাড়ের এক প্রাইমারি স্কুলে বদলি হয়ে এলেন আনোয়ার মাস্টার। প্রথম রাতেই টেবিলের ওপর পাওয়া গেল একটা চিঠি—আতরের গন্ধ মাখা, প্রেরকের জায়গায় লেখা শুধু: প্রতিবেশী।
- ৫ মিনিট
- ৯.৮ হাজার বার পড়া হয়েছে
- ৬১০ জন পছন্দ করেছেন
হাওরের ধারের স্কুল
নেত্রকোনার খালিয়াজুরি থেকে নৌকায় আরও দেড় ঘণ্টা গেলে কাশিমপুর গ্রাম। বর্ষায় চারদিকে শুধু পানি আর পানি, গ্রামটা ভেসে থাকে একটা সবুজ দ্বীপের মতো। শুকনো মৌসুমে সেই পানি সরে গিয়ে জেগে ওঠে ধানখেত, আর গ্রামের মাঝখান দিয়ে একটা কাঁচা রাস্তা চলে যায় পুরোনো স্কুলঘর পর্যন্ত।
আনোয়ার হোসেন সেই স্কুলে প্রধান শিক্ষক হয়ে এলেন অগ্রহায়ণের শেষে। বয়স চল্লিশ, অবিবাহিত, শহুরে মানুষ। বদলির চিঠি হাতে পেয়ে সহকর্মীরা সান্ত্বনা দিয়েছিল, যেন তাঁকে নির্বাসনে পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু আনোয়ারের খারাপ লাগেনি। শহরের কোলাহল থেকে দূরে, নিরিবিলিতে কিছুদিন কাটানোর ইচ্ছা তাঁর বহুদিনের।
থাকার জায়গা হলো স্কুলঘরের পেছনের একটা টিনের কামরায়। সামনে একটা পুকুর, পুকুরপাড়ে বিশাল এক বটগাছ—এত পুরোনো যে তার ঝুরিগুলো মাটিতে নেমে নিজেরাই আলাদা আলাদা গাছ হয়ে গেছে। গ্রামের লোকে গাছটাকে বলে "বুড়া বট"। সন্ধ্যার পর কেউ তার তলায় যায় না।
স্কুলের দপ্তরি কালু মিয়া চাবি বুঝিয়ে দেওয়ার সময় বলেছিল, "স্যার, রাইতে কামরার জানালা খোলা রাখবেন না। আর কেউ যদি কিছু দিয়া যায়, ফিরাইয়া দিবেন না।"
"কে কী দিয়ে যাবে?"
কালু মিয়া হাসল, পান-খাওয়া লাল দাঁত বের করে। "গ্রামে কত মানুষ, স্যার। কত রকম প্রতিবেশী।"
প্রথম চিঠি
প্রথম রাতে আনোয়ার অনেকক্ষণ হারিকেনের আলোয় বই পড়লেন। বাইরে ঝিঁঝির ডাক, মাঝে মাঝে পুকুরে মাছের ঘাই। রাত বারোটার দিকে একটা অদ্ভুত গন্ধ পেলেন—আতরের গন্ধ। গোলাপ আর চন্দনের মিশেল, খুব পুরোনো ধরনের, যেমন গন্ধ তাঁর দাদাজানের পাঞ্জাবিতে থাকত।
তিনি উঠে জানালা দেখলেন। বন্ধ। দরজায় খিল। গন্ধটা কোথা থেকে আসছে বোঝা গেল না। কিছুক্ষণ পর মিলিয়ে গেল। তিনি হারিকেন কমিয়ে শুয়ে পড়লেন।
সকালে উঠে দেখলেন, টেবিলের ওপর একটা ভাঁজ করা কাগজ।
কাগজটা সাধারণ কাগজ নয়—হালকা হলদে, মোটা, আঁশওয়ালা, যেমন কাগজ আজকাল আর পাওয়া যায় না। হাতের লেখা বাংলায়, কিন্তু অক্ষরের ধরন পুরোনো, প্রতিটি অক্ষর যত্ন করে টানা। কালিতে এখনও সেই আতরের গন্ধ।
আনোয়ার প্রথমে হাসলেন। নিশ্চয়ই গ্রামের কোনো দুষ্টু ছেলের কাজ, নতুন মাস্টারকে ভয় দেখানোর চেষ্টা। কিন্তু দরজার খিল ভেতর থেকে লাগানো ছিল, জানালাও বন্ধ। তাহলে চিঠিটা ঢুকল কীভাবে?
কালু মিয়াকে দেখাতেই তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। সে কাগজটা ছুঁলও না। শুধু বলল, "উত্তর দিবেন, স্যার। ভদ্রলোকের চিঠির উত্তর দিতে হয়।"
"কাকে উত্তর দেব?"
কালু মিয়া বটগাছটার দিকে তাকাল। কিছু বলল না।
উত্তর
আনোয়ার যুক্তিবাদী মানুষ। বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন। জিন-পরি নিয়ে তাঁর কোনো স্পষ্ট মত ছিল না—মানতেন যে পৃথিবীতে মানুষের জানার বাইরেও অনেক কিছু আছে, কিন্তু নিজের চোখে কিছু দেখেননি কখনো। কৌতূহল থেকেই, অনেকটা খেলার ছলে, সেই রাতে তিনি একটা কাগজে লিখলেন:
কাগজটা ভাঁজ করে টেবিলের ওপর রেখে তিনি শুয়ে পড়লেন।
রাত তিনটার দিকে ঘুম ভাঙল। কেউ যেন টিনের চালে হাঁটছে। খুব হালকা পায়ে, ধীরে ধীরে, এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। তারপর থেমে গেল। বাতাসে আবার সেই আতরের গন্ধ।
আনোয়ার চোখ খুলে রাখলেন। অন্ধকারে টেবিলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর মনে হলো, টেবিলের পাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে—খুব লম্বা, মাথাটা প্রায় চালের কাছে। সাদা পোশাক। মুখ বোঝা যায় না। শুধু একটা উপস্থিতি, শান্ত, ধৈর্যশীল, যেন বহুদিনের চেনা কোনো আত্মীয় ঘুমন্ত মানুষকে না জাগিয়ে দেখে যাচ্ছে।
তিনি ভয় পাননি। অন্তত তখন নয়। একটা অদ্ভুত শান্তি এসেছিল, আর তারপর আবার ঘুম।
সকালে টেবিলে তাঁর নিজের চিঠিটা নেই। তার জায়গায় আরেকটা হলদে কাগজ।
আনোয়ার চিঠিটা হাতে নিয়ে জানালার কাছে গেলেন। পুকুরপাড়ে বুড়া বট সকালের রোদে দাঁড়িয়ে আছে, ঝুরিগুলো বাতাসে দুলছে। একটা কাক ডাল থেকে উড়ে গেল।
সেদিন দুপুরে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান স্কুলে এলেন। সঙ্গে জেলা শহরের এক ঠিকাদার—মোটা মানুষ, গলায় সোনার চেইন, চোখে কালো চশমা। নাম জব্বার শেখ।
চেয়ারম্যান খুশি খুশি গলায় বললেন, "মাস্টার সাব, সুখবর আছে। সরকার পাকা রাস্তা দিতেছে। হাওর থেকে বাজার পর্যন্ত। রাস্তা যাইব স্কুলের পাশ দিয়া।"
জব্বার শেখ নকশাটা টেবিলে বিছিয়ে দিলেন। আনোয়ার দেখলেন, লাল কালির রেখাটা স্কুলের পাশ দিয়ে এসে সোজা চলে গেছে পুকুরপাড়ের ওপর দিয়ে।
ঠিক যেখানে বুড়া বট দাঁড়িয়ে আছে।
"গাছটা?" আনোয়ার জিজ্ঞেস করলেন।
জব্বার শেখ হাসলেন। "গাছ কাইটা ফালামু। দুই দিনের কাম।"
আনোয়ার চুপ করে রইলেন। পকেটে হাত দিলেন—হলদে কাগজটা সেখানে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে, ভরদুপুরে, বন্ধ কামরার ভেতরে, তিনি আবার সেই আতরের গন্ধ পেলেন। এবার অনেক তীব্র।
জব্বার শেখ নাক কুঁচকে বললেন, "কীসের গন্ধ? কেউ আতর মাখছে নাকি?"
কেউ উত্তর দিল না। চেয়ারম্যান সাহেবের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। দরজার পাশে দাঁড়ানো কালু মিয়া বিড়বিড় করে কী যেন পড়ছে।
আনোয়ার জানালা দিয়ে বটগাছটার দিকে তাকালেন। রোদ ঝলমলে দুপুর, বাতাস নেই। তবু বটগাছের সবগুলো পাতা একসঙ্গে কাঁপছিল—যেন গাছটা নিজেই গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেলল।
(চলবে)