রাতের বাড়ি · পর্ব ১
রাতের বাড়ি — পর্ব ১
সূত্রাপুরের গলির শেষে দোতলা পুরোনো বাড়ি, ভাড়া আশ্চর্য রকম কম। কেয়ারটেকার শুধু দুটো নিয়ম বলে দিয়েছিল—চিলেকোঠা খুলবেন না, আর রাত তিনটায় কলের পানি বন্ধ করতে যাবেন না।
- ৫ মিনিট
- ১৮ হাজার বার পড়া হয়েছে
- ১.১ হাজার জন পছন্দ করেছেন
গলির শেষ বাড়ি
সূত্রাপুরের যে গলিটা লোহারপুলের দিক থেকে বেঁকে নদীর গন্ধের দিকে চলে গেছে, তার একেবারে শেষ মাথায় বাড়িটা। দোতলা, চুন-সুরকির দেয়াল, কার্নিশে বট আর অশ্বত্থের চারা, সদর দরজায় পিতলের কড়া—যেটা বহু বছর কেউ নাড়েনি বলে সবুজ হয়ে গেছে। ভেতরে ঢুকলে চারকোনা উঠান, উঠানের এক পাশে সিমেন্টের পুরোনো চৌবাচ্চা আর তার ওপরে একটা পেতলের কল।
মাহবুব সাহেব বাড়িটা দেখে প্রথম যে কথা বলেছিলেন, তা হলো, "এত বড় বাড়ি, এত কম ভাড়া—কোথাও একটা গোলমাল আছে।"
শিরিন হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। মিরপুরের দুই কামরার ফ্ল্যাটে তিন বছর কাটানোর পর এই উঠান, এই খোলা ছাদ, এই আলো-বাতাস—তার কাছে স্বপ্নের মতো লেগেছিল। নয় বছরের মিতু তো ঢুকেই উঠানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ঘুরপাক খেতে শুরু করেছিল, দুই হাত মেলে, যেন পাখি।
বাড়িওয়ালা থাকেন কানাডায়। দেখাশোনা করে হারুন মিয়া—সত্তরের কাছাকাছি বয়স, কুঁজো পিঠ, সাদা দাড়ি, চোখে ঘোলাটে ছানি। চাবির গোছা শিরিনের হাতে তুলে দেওয়ার সময় সে অনেকক্ষণ মিতুর দিকে তাকিয়ে ছিল। তারপর গলা নামিয়ে বলেছিল,
"আম্মা, দুইটা কথা মনে রাখবেন। ছাদের চিলেকোঠার ঘরটা খুলবেন না। আর রাত তিনটার সময় উঠানের কল থেকে পানি পড়ার শব্দ পাইলে, বন্ধ করতে যাবেন না। সকালে আমি আইসা বন্ধ করব।"
শিরিন জিজ্ঞেস করেছিল, "কেন?"
হারুন মিয়া উত্তর দেয়নি। শুধু বলেছিল, "পুরান বাড়ি, আম্মা। পুরান বাড়ির নিজের নিয়ম থাকে।"
প্রথম সপ্তাহ
প্রথম কয়েকটা দিন সব ঠিকঠাক চলল। মাহবুব সকালে সচিবালয়ে চলে যান, ফেরেন সন্ধ্যায়। শিরিন ঘর গোছায়, পুরোনো কাঠের আলমারি মোছে, জানালার কাচে জমে থাকা বছরের পর বছরের ধুলো সরায়। মিতু নতুন স্কুলে ভর্তি হয়েছে, বিকেলে উঠানে একা একা এক্কা-দোক্কা খেলে।
একা একা—এটাই শিরিন প্রথমে ভেবেছিল।
চতুর্থ দিন বিকেলে রান্নাঘরের জানালা দিয়ে সে দেখল, মিতু খেলার ঘর আঁকছে চক দিয়ে। একটা ঘর আঁকছে, তারপর পাশের ঘরের দিকে তাকিয়ে কী যেন শুনছে, তারপর মাথা নেড়ে হাসছে। যেন কেউ তাকে বলে দিচ্ছে কোথায় দাগ টানতে হবে।
"কার সঙ্গে কথা বলিস, মা?"
মিতু খুব স্বাভাবিকভাবে বলল, "নূরী আপার সঙ্গে।"
"নূরী আপা কে?"
"ওপরে থাকে।" মিতু চক দিয়ে ছাদের দিকে দেখাল। "আপা বলে, এই খেলাটা আমি ভুল খেলি। আগে নাকি সাতটা ঘর হতো, এখন ছয়টা হয় কেন।"
শিরিনের বুকের ভেতর একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল, তবে সে নিজেকে বোঝাল—নতুন জায়গা, বন্ধু নেই, বাচ্চারা এমন কাল্পনিক সঙ্গী বানায়। মনোবিজ্ঞানের বইয়েও লেখা থাকে।
সেদিন রাতে মাহবুবকে বলতেই তিনি হাসলেন। "তোমার মেয়ে তোমার মতোই গল্পবাজ।"
রাত তিনটার কল
দ্বিতীয় সপ্তাহের এক রাতে শিরিনের ঘুম ভাঙল পানির শব্দে।
ঝিরঝির নয়—পূর্ণ বেগে পানি পড়ছে। চৌবাচ্চার সিমেন্টে আছড়ে পড়ার ভারী, একটানা শব্দ। সে বালিশের পাশ থেকে মোবাইল তুলে দেখল।
৩টা ০২।
হারুন মিয়ার কথাটা মনে পড়ল। শিরিন কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে পড়ে রইল। কিন্তু শব্দটা থামে না। বরং মনে হলো, পানির শব্দের ফাঁকে ফাঁকে আরেকটা শব্দ আছে—খুব হালকা, ছলাৎ ছলাৎ, যেন কেউ চৌবাচ্চার পানিতে হাত ডুবিয়ে খেলছে।
পাশে মাহবুব গভীর ঘুমে। শিরিন উঠে জানালার পর্দা একটু সরাল।
উঠানে চাঁদের আলো। কল খোলা, পানি উপচে পড়ছে চৌবাচ্চা থেকে। আর কেউ নেই।
তবে চৌবাচ্চার কিনারা থেকে সিঁড়ির দিকে ভেজা দাগ। ছোট ছোট পায়ের ছাপ। এক জোড়া। ঠিক মিতুর পায়ের মাপের।
শিরিন দৌড়ে পাশের ঘরে গেল। মিতু বিছানায়, কাঁথা গায়ে, ঘুমে অচেতন। পা দুটো শুকনো।
সে আবার জানালায় ফিরে এল। ছাপগুলো সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেছে দোতলায়, তারপর আরও ওপরে—ছাদের দিকে। চিলেকোঠার দিকে।
নিজেকে বোঝানোর মতো কোনো যুক্তি তখন শিরিনের মাথায় এল না। শুধু একটা অদ্ভুত টান অনুভব করল—যেমন টান মা হিসেবে সে অনুভব করে যখন মিতু ঘুমের মধ্যে কেঁদে ওঠে। কেউ ওপরে আছে। ছোট কেউ। একা।
সে টর্চ নিয়ে সিঁড়ি ভাঙল।
ছাদের দরজা খোলা। বাইরে ঠান্ডা বাতাস, বুড়িগঙ্গার দিক থেকে ভেসে আসা লঞ্চের ভোঁ। চিলেকোঠার ঘরটা ছাদের কোনায়, সবুজ রঙের কাঠের দরজা, তাতে একটা মরচে-ধরা পুরোনো তালা। অন্তত দিনের বেলায় তাই দেখেছিল শিরিন।
এখন তালাটা ঝুলছে খোলা অবস্থায়। কড়ার সঙ্গে আটকে আছে, কিন্তু আংটাটা বাইরে বেরিয়ে এসেছে—যেন কেউ ভেতর থেকে খুলেছে।
ভেজা পায়ের ছাপগুলো দরজার সামনে এসে থেমে গেছে।
শিরিন টর্চটা দরজার ফাঁকে ধরল। ভেতরে অন্ধকার। একটা পুরোনো গন্ধ—কর্পূর, ভেজা কাঠ আর কেমন একটা মিষ্টি, পচা ফুলের গন্ধ। টর্চের আলো গিয়ে পড়ল দেয়ালে ঝোলানো একটা বড় আয়নার ওপর। ধুলোয় ঢাকা, তবু আলো ফিরিয়ে দিল।
আর আয়নার ভেতর, শিরিনের নিজের প্রতিবিম্বের ঠিক পেছনে, ছাদের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে একটা ছোট মেয়ে। ফ্রক পরা। চুল ভেজা। মুখ দেখা যায় না।
শিরিন ঝট করে পেছনে ঘুরল।
ছাদ ফাঁকা।
পরদিন সকালে হারুন মিয়া এসে কলটা বন্ধ করল। শিরিনের মুখের দিকে একবার তাকিয়েই সে বুঝে গেল। কিছু বলল না। শুধু ছাদে গিয়ে চিলেকোঠার তালাটা আবার লাগিয়ে দিল, আর নামার সময় বিড়বিড় করে বলল, "এতদিন তো চুপ আছিল। আবার শুরু হইল।"
বিকেলে শিরিন উঠানে গিয়ে দেখল, মিতুর চক দিয়ে আঁকা এক্কা-দোক্কার ঘরগুলো। সে গুনল।
এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ, ছয়।
আর সাত নম্বর ঘরটা আঁকা হয়েছে চৌবাচ্চার ঠিক কিনারায়। অন্য ঘরগুলোর চেয়ে সেটা একটু ছোট। আর তার দাগ চক দিয়ে টানা নয়।
ভেজা আঙুল দিয়ে টানা।
(চলবে)