মূল লেখায় যান

শ্মশানঘাটের চায়ের দোকান

কুমার নদের শ্মশানঘাটের পাশে হরি জ্যাঠার চায়ের দোকান। মাঝরাতে কুয়াশা ঠেলে খদ্দের আসে, চা খায়, দাম দেয় এমন পয়সায় যা বহু বছর আগে বাজার থেকে উঠে গেছে।

অঅধীর সেন@adhir
  • ৫ মিনিট
  • ০ বার পড়া হয়েছে
শ্মশানঘাটের চায়ের দোকান

ঘাটের পয়সা

কুমার নদের পাড়ে কমলাপুর শ্মশানঘাটের ঠিক পাশে হরি জ্যাঠার চায়ের দোকান। বাঁশের খুঁটি, চাটাইয়ের বেড়া, মাথায় খড়ের ছাউনি। সামনে দুটো নড়বড়ে বেঞ্চ আর একটা মাটির চুলা, যার আগুন কেউ কোনোদিন নিভতে দেখেনি।

আমি কাজে ঢুকলাম মাঘ মাসে। বাবা নেই, মা অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। জ্যাঠা মাসে দেড় হাজার টাকা আর দুবেলা খাওয়া দেবেন বলেছিলেন। আমার বয়স তখন ষোলো।

প্রথম দিন ভোরে ঘাটের সিঁড়ি ঝাড়ু দিতে গিয়ে একটা পয়সা পেলাম। পুরোনো তামার, মাঝখানে ফুটো। আঙুলে ঘষতেই লালচে চকচক করে উঠল। কী ভেবে পকেটে রেখে দিলাম।

হরি জ্যাঠা দেখে ফেললেন। দূর থেকেই। অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন, তারপর মাথা নাড়লেন আস্তে।

“রাইখা দে, বাবা। কামে লাগব।”

তখন কথাটার মানে বুঝিনি।


রাতের খদ্দের

দিনে খদ্দের বলতে শবযাত্রীরা। ক্লান্ত, চোখ লাল, মুখে ধোঁয়ার কালি। চিতা জ্বলে, ‘বলো হরি, হরিবোল’ ধ্বনি নদীর ওপর দিয়ে ভেসে যায়, আর তারা বেঞ্চে বসে নিঃশব্দে চায়ে চুমুক দেয়।

রাত দশটার পর জ্যাঠা আমাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেন। নিজে থেকে যান। চুলায় কাঠ গুঁজে কেতলিতে পানি চড়িয়ে বসে থাকেন, যেন কারও অপেক্ষায়।

পৌষের এক রাতে ঘন কুয়াশায় পথ দেখা যাচ্ছিল না। জ্যাঠা বললেন, “থাইকা যা আইজ। কিন্তু যা দেখবি, চুপ কইরা দেখবি।”

রাত একটার দিকে নদীর দিক থেকে কুয়াশা উঠে এল, আর সেই কুয়াশা থেকে বেরিয়ে এল একজন বুড়ি। সাদা থান, খালি পা। তার পেছনে ধুতি-ফতুয়া পরা এক মাঝবয়সী লোক। তারপর এক কিশোরী, চুল ভেজা, কপালে আবছা সিঁদুরের দাগ।

আমি চুলার পেছনে গুটিসুটি মেরে বসে ছিলাম। কিশোরী মেয়েটা একবার আমার দিকে তাকাল। চোখে কোনো রাগ নেই, কোনো ভয় নেই—শুধু অসম্ভব ক্লান্তি, যেন বহু পথ হেঁটে এসেছে আর আরও বহু পথ বাকি।

কেউ কথা বলে না। বেঞ্চে বসে। জ্যাঠা মাটির ভাঁড়ে চা ঢেলে একে একে হাতে দেন।

ওরা চা খায় খুব ধীরে, দুই হাতে ভাঁড় চেপে, যেন অনেক দিনের শীত হাড়ে জমে আছে। বাতাসে একটা গন্ধ ভাসছিল—ঘি, পোড়া চন্দন কাঠ, আর ভেজা ছাই।

চা শেষ করে প্রত্যেকে বেঞ্চের ওপর একটা করে পয়সা রাখল।

এক আনা। পাকিস্তান আমলের পাঁচ পয়সা। মাঝখানে ফুটোওয়ালা তামার পয়সা। এমন সব পয়সা, যা আমার জন্মেরও অনেক আগে বাজার থেকে উঠে গেছে।

তারপর ওরা উঠে চলে গেল ঘাটের দিকে। কারও পায়ের শব্দ হলো না। ঘাটের শেষ সিঁড়িতে পৌঁছে কুয়াশার সঙ্গে মিশে গেল।

আমার দাঁতে দাঁত লাগছিল। জ্যাঠা শান্তভাবে পয়সাগুলো তুলে একটা টিনের কৌটায় রাখলেন।


জ্যাঠার কথা

ভোরে জ্যাঠা কৌটা হাতে ঘাটে নামলেন। একটা একটা করে পয়সা নদীতে ছুড়ে দিলেন। প্রতিটা পয়সা পানিতে পড়তেই কুয়াশার ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাসের মতো শব্দ উঠল।

ফিরে এসে চুলার পাশে বসে বললেন সব।

“মরার মুখে পয়সা দেয়, জানস তো? পারানির কড়ি। ওপারে যাওনের ভাড়া। কিন্তু সবাই পায় না। কারও আপনজন থাকে না, কারও পয়সা চিতার ছাইয়ে হারায়, কারওটা কেউ চুরি কইরা নেয়। হেরা ঘাটে আটকাইয়া থাকে। শীতে কাঁপে।”

“আপনে ক্যামনে জানলেন?”

জ্যাঠা নিজের দুই হাতের দিকে তাকালেন। কুঁচকে যাওয়া, চুলার আঁচে পোড়া দাগে ভরা হাত। “এই ঘাটে জন্ম, এই ঘাটে বুড়া হওয়া। শ্মশানের মানুষ সব জানে, বাবা। খালি মুখে কয় না।”

“ওরা যে পয়সা দিল?”

“নিজের পয়সা খুঁইজা পায় ঠিকই। কিন্তু মরা হাতের পয়সা নদী নেয় না। জ্যান্ত হাত লাগে। আমি চা দেই, ওরা পয়সা দেয়, আমি ভোরে নদীরে দেই। যার পয়সা নদী নেয়, সে পার হয়।”

“আপনি কবে থেইকা...”

জ্যাঠা নদীর দিকে তাকালেন। “বিয়াল্লিশ বছর। আমার পোলাটা এই নদীতে ডুবছিল, সাত বছর বয়সে। তিন দিন পর পাইছিলাম। দাহ করলাম এই ঘাটে। সেই রাইতে ও আইসা চুলার পাশে বসল। হাত বাড়াইয়া দিল। মুঠায় একটা পয়সা।”

তাঁর গলা ধরে এল।

“তারপর থেইকা চুলা নিভাই নাই। ভাবি, আইজ যদি কেউ না থাকে, কারও পোলা যদি সারারাইত ঠান্ডায় ঘাটে বইসা থাকে...”


শেষ খদ্দের

ফাল্গুনের শেষে জ্যাঠা মারা গেলেন। ঘুমের মধ্যে, চুলার পাশে, হাতে তখনো কেতলির হাতল।

তাঁর কেউ ছিল না। পাড়ার কয়েকজন মিলে দাহ করল ওই ঘাটেই। পুরোহিত মশাই মুখে দেওয়ার জন্য পয়সা চাইলেন। কারও পকেটে খুচরা ছিল না। আমি অস্থির হয়ে খুঁজছিলাম, আর ঠিক তখন কে যেন আমার কাঁধে হাত রাখল। ঘুরে দেখি কেউ নেই।

পয়সার কথা আমি ভুলেই গেলাম।

চিতার আগুন যখন নিভে এল, ঘাটে আমি একা দাঁড়িয়ে। নদীর ওপর থেকে ঠান্ডা বাতাস আসছিল। মনে হচ্ছিল, পেছনে দোকানের বেঞ্চে কেউ বসে আছে, চুপচাপ, অপেক্ষা করছে।

সেই রাতে দোকান বন্ধ করে চলে যাওয়ার কথা ছিল। পারলাম না। চুলায় কাঠ দিলাম, কেতলি চড়ালাম। বসে রইলাম।

রাত একটায় কুয়াশা উঠল। আর কুয়াশা থেকে বেরিয়ে এলেন হরি জ্যাঠা।

খালি গা, খালি পা, ঠান্ডায় কুঁকড়ে আছেন। বেঞ্চে বসলেন। আমি কাঁপা হাতে ভাঁড়ে চা ঢেলে দিলাম। দুই হাতে ধরে খেলেন, ঠিক যেমন অন্যরা খেত।

তারপর হাত বাড়ালেন। মুঠা খোলা। খালি।

ওঁর কোনো পয়সা নেই। মুখে কেউ দেয়নি।

তখন মনে পড়ল। পকেটে হাত দিলাম। ঘাটের সিঁড়িতে কুড়ানো সেই ফুটো পয়সাটা, প্রথম দিন থেকে আছে। হাতে নিতেই সেটা গরম হয়ে উঠল, যেন কেউ এতক্ষণ মুঠোয় ধরে রেখেছিল।

জ্যাঠা হাসলেন। বহুদিন পর এমন হাসি।

“কইছিলাম না, কামে লাগব।”

ওই পয়সা ঘাটে কে রেখেছিল, তখন বুঝলাম। আর কেন আমাকে দেখে উনি মাথা নেড়েছিলেন।

ভোরে পয়সাটা নদীতে দিলাম। কুয়াশার ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাসের শব্দটা উঠল, তারপর মিলিয়ে গেল।

ঘাটের সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসার সময় দেখি, বেঞ্চে আরও দুজন বসে আছে। কাঁপছে। অপেক্ষা করছে।

আমি চুলায় কাঠ গুঁজে দিলাম।

০ বার পড়া হয়েছে · প্রকাশ ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এরপর কী পড়বেন

সব দেখুন
রহস্য

পদ্মার চরের অচেনা লোক

বানের পানি নামার পর চরের ঘাটে এসে বসে এক অচেনা লোক। সে গ্রামের সবার গোপন কথা জানে, আর জিজ্ঞেস করলে বলে দেয় কার মৃত্যু কোন দিন।

অঅধীর সেন
  • ৫ মিনিট
  • ১ বার পড়া হয়েছে

৪ অক্টোবর ২০২৬

অলৌকিক

ঝড়ের রাতের অতিথি

দশ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের রাতে চরফ্যাশনের এক ঘরের দরজায় কড়া নাড়ল ভেজা এক কিশোর। সবাই দ্বিধায়, শুধু দাদি ছুটে গিয়ে খিল খুললেন—কারণ এই মুখ তিনি চেনেন, বহু বছর আগের এক ঝড়ের রাত থেকে।

অঅধীর সেন
  • ৫ মিনিট
  • ১ বার পড়া হয়েছে

৩ অক্টোবর ২০২৬

পরিত্যক্ত বাড়ি

রূপমহল হলের শেষ শো

তেত্রিশ বছর ধরে তালাবন্ধ মফস্বলের সিনেমা হল। মাঝরাতে নিজে নিজে চালু হয় পোড়া প্রজেক্টর, আর পর্দায় ভেসে ওঠা পুরনো দিনের দর্শকদের ভিড়ে একটা চেনা মুখ।

নিনিশাচর রায়হান
  • ৫ মিনিট
  • ০ বার পড়া হয়েছে

২ অক্টোবর ২০২৬