মূল লেখায় যান

মহাসড়কের ধাবা

ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের ধারে রাত দুটোর এক টিনের ধাবা। হাসিমুখের এক কিশোর চা এনে দিল, পয়সা নিল না—বলল, ‘চাচা, আপনের কাছে আগের পাওনা আছে।’ কোন পাওনা, তখন বুঝিনি।

নিনিশাচর রায়হান@nishachar
  • ৫ মিনিট
  • ০ বার পড়া হয়েছে
মহাসড়কের ধাবা

রাত দুটোর পর

বাইশ বছর ধরে ঢাকা–চিটাগাং লাইনে ট্রাক চালাই। যাওয়ার সময় গার্মেন্টসের মাল, ফেরার পথে কখনো চাল, কখনো সিমেন্ট। এই রাস্তার প্রতিটা বাঁক আমার মুখস্থ। কোথায় গর্ত, কোথায় পুলিশ দাঁড়ায়, কোন হোটেলের ডাল ভালো—সব।

তাই সেই রাতে মিরসরাইয়ের একটু আগে রাস্তার বাঁ পাশে একটা টিমটিমে আলো দেখে অবাকই হয়েছিলাম। ওই জায়গায় কোনো হোটেল থাকার কথা না। দুই পাশে শুধু ধানখেত, আর দূরে পাহাড়ের কালো রেখা।

রাত তখন দুটো দশ। হেলপার রতন পেছনের সিটে ঘুমে কাদা। আমার চোখও জ্বলছিল। ভাবলাম, এক কাপ চা খেয়ে নিই।

টিনের চালের ছোট্ট একটা ঘর। সামনে দুটো কাঠের বেঞ্চ। চুলার আগুন নিভু নিভু। সাইনবোর্ডে রং-চটা অক্ষরে লেখা—হোটেল মায়ের দোয়া।

আশপাশে আর কোনো গাড়ি দাঁড়িয়ে নেই। মহাসড়কে তখন একটার পর একটা ট্রাক ছুটছে, হেডলাইটের আলো এসে টিনের দেয়ালে পড়ছে আর সরে যাচ্ছে। অথচ কেউ থামছে না। কেউ যেন জায়গাটা দেখতেই পাচ্ছে না।

বেঞ্চে বসতেই ভেতর থেকে একটা ছেলে বেরিয়ে এল। বারো-তেরো বছর হবে। গায়ে হলুদ গেঞ্জি, তাতে কালো তেলের দাগ। মুখভরা হাসি।

“চাচা, চা দিমু? দুধ চা না রং চা?”

“দুধ চা। চিনি কম।”

ছেলেটা এমনভাবে মাথা নাড়ল, যেন আমার পছন্দ আগে থেকেই জানে।


পাওনা

অমন চা জীবনে খাইনি। এলাচের গন্ধ, ঘন দুধ, চিনি ঠিক যতটুকু আমি খাই। কাপটা অবশ্য অদ্ভুত ঠান্ডা ছিল—চা গরম, কিন্তু কাপের গা বরফের মতো। তখন অত খেয়াল করিনি।

ছেলেটা আমার পাশে বসে পা দোলাচ্ছিল আর বকবক করছিল। কোন কোম্পানির ট্রাক রাতে বেশি জোরে চালায়, কোন ড্রাইভার মোড়ে হর্ন বাজায় না, এইসব। তারপর হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “চাচা, আপনে আগে হেলপারি করতেন না?”

আমি চমকে তাকালাম। করতাম। ড্রাইভার হওয়ার আগে চার বছর।

“তুই জানলি কেমনে?”

ও কিছু বলল না। শুধু হাসল। হাসিটা যেন একটু বেশিক্ষণ মুখে ধরে রাখল।

চা শেষ করে পকেট থেকে বিশ টাকার নোট বের করলাম। ছেলেটা হাত গুটিয়ে নিল।

“লাগবো না, চাচা। আপনের কাছে আগের পাওনা আছে।”

“কিসের পাওনা? আমি তো এই প্রথম আইলাম।”

“আপনে প্রথম আইলেন। আমি তো আপনেরে আগেই দেখছি।”

ট্রাক থেকে রতন হর্ন বাজাল। ঘুম ভেঙে আমাকে খুঁজছে। নোটটা বেঞ্চের ওপর রেখে চলে এলাম। ট্রাকে উঠে আয়নায় তাকিয়ে দেখি, ছেলেটা রাস্তার একদম কিনারে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছে। হেডলাইটের আলো তার গায়ে পড়ছে, কিন্তু পেছনের মাটিতে কোনো ছায়া নেই।

রতন হাই তুলে বলল, “ওস্তাদ, এতক্ষণ অন্ধকারে একলা বইসা ছিলেন ক্যান?”


মালিকের কথা

দশ দিন পর আবার ওই রাস্তায়। এবার দিনের বেলা। জায়গাটা খুঁজে পেতে কষ্ট হলো না। হোটেল আছে, তবে আমি যেটা দেখেছিলাম সেটা না। পাকা দালান, টাইলস করা মেঝে, নতুন সাইনবোর্ড।

ক্যাশে বসা মোটাসোটা লোকটাকে জিজ্ঞেস করলাম, “ভাই, আপনাগো এইখানে একটা পোলা কাম করে? হলুদ গেঞ্জি পরে, বারো-তেরো বছর বয়স?”

লোকটার হাত থেকে খুচরা পয়সাগুলো টেবিলে পড়ে গেল।

অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলল, “আপনে কি রাইতে আইছিলেন? দুইটার পর?”

আমি মাথা নাড়লাম।

“ওর নাম মন্টু। আমার ভাইগ্না। এই হোটেল আগে টিনের আছিল, আমার বইনের। মন্টু রাইতে কাস্টমারগো চা দিত। এগারো বছর আগে এক শীতের রাইতে রাস্তা পার হইতেছিল, একটা ট্রাক...” লোকটা গলা পরিষ্কার করল। “থামে নাই। নম্বরও কেউ দেখে নাই। সকালে আমরা ওরে পাইছি খাদের পাশে। হাতে তখনো চায়ের কাপ।”

আমার পিঠ বেয়ে ঠান্ডা ঘাম নামছিল।

লোকটা উঠে গিয়ে ড্রয়ার থেকে একটা ভাঁজ-পড়া ছবি বের করল। হলুদ গেঞ্জি, মুখভরা হাসি, হাতে চায়ের কেতলি। আমি বেশিক্ষণ তাকাতে পারলাম না।

“মাঝেমইধ্যে ড্রাইভাররা আইসা কয়, রাইতে এক পোলা চা খাওয়াইছে। আমরা আর কিছু কই না।”

“সবাইরে খাওয়ায়?”

লোকটা আমার চোখের দিকে তাকাল। “না। ও খুঁজতেছে। একজনরে।”


এগারো বছর আগে

সেদিন বাকি রাস্তা আমি একটাও কথা বলিনি।

এগারো বছর আগে আমি ছিলাম হেলপার। আমার ওস্তাদ ছিলেন জলিল ভাই। এক শীতের রাতে, ঠিক ওই রকম জায়গায়, গাড়িটা হঠাৎ একটা ঝাঁকি খেয়েছিল। ঘুম ভেঙে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “কী হইল, ওস্তাদ?”

জলিল ভাই আয়নার দিকে না তাকিয়ে বলেছিলেন, “কুত্তা। ঘুমা।”

আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সকালে চিটাগাং পৌঁছে দেখি, সামনের বাম্পারে এক টুকরো হলুদ কাপড় আটকে আছে। জলিল ভাই গাড়ি ধুয়ে ফেলতে বলেছিলেন। আমিই ধুয়েছিলাম। দুই বালতি পানি ঢেলে, নিজের হাতে, কোনো প্রশ্ন না করে।

এত বছর কথাটা একবারও মনে পড়েনি।

ওই রাতে ও আমাকে দেখেছিল। কেবিনের জানালা দিয়ে, আমার ঘুমন্ত মুখ। শেষ যে মুখটা ও দেখেছিল, সেটা হয়তো আমারই।

পাওনাটা তাহলে চায়ের দাম না।


শেষ প্রশ্ন

জলিল ভাই এখনো গাড়ি চালান। বয়স হয়েছে, তবু ছাড়েননি। নারায়ণগঞ্জ থেকে চিটাগাং, সপ্তাহে দুই খেপ। আমি তাঁকে কিছু বলিনি। কী বলব?

গত মাসে আবার রাতের ট্রিপ পড়ল। মিরসরাইয়ের কাছে আসতেই দেখি, বাঁ পাশে সেই টিমটিমে আলো। আমি গাড়ি থামাইনি। পা চেপে রেখেছিলাম এক্সেলেটরে।

কিন্তু আলোটা পার হওয়ার মুহূর্তে, জানালার ঠিক বাইরে, আমার কানের পাশে কে যেন খুব স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করল—

“চাচা, আপনের ওস্তাদ এখনো এই রাস্তায় গাড়ি চালায়, না?”

আমি উত্তর দিইনি। দিতে চাইনি।

কিন্তু আমার মাথাটা, আমার নিজের মাথাটা, আপনা থেকে একবার, শুধু একবার, ওপর-নিচে নড়ে গিয়েছিল।

সেই থেকে আমি জানালার কাচ তুলে গাড়ি চালাই। তবু প্রতি রাতে কেবিনে এলাচ-চায়ের গন্ধ পাই।

পরশু রাতে জলিল ভাইয়ের ট্রিপ। নারায়ণগঞ্জ থেকে চিটাগাং।

আমি এখনো ঠিক করতে পারিনি, তাঁকে ফোন করব কি না।

০ বার পড়া হয়েছে · প্রকাশ ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এরপর কী পড়বেন

সব দেখুন
অলৌকিক

ঝড়ের রাতের অতিথি

দশ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের রাতে চরফ্যাশনের এক ঘরের দরজায় কড়া নাড়ল ভেজা এক কিশোর। সবাই দ্বিধায়, শুধু দাদি ছুটে গিয়ে খিল খুললেন—কারণ এই মুখ তিনি চেনেন, বহু বছর আগের এক ঝড়ের রাত থেকে।

অঅধীর সেন
  • ৫ মিনিট
  • ১ বার পড়া হয়েছে

৩ অক্টোবর ২০২৬

পরিত্যক্ত বাড়ি

রূপমহল হলের শেষ শো

তেত্রিশ বছর ধরে তালাবন্ধ মফস্বলের সিনেমা হল। মাঝরাতে নিজে নিজে চালু হয় পোড়া প্রজেক্টর, আর পর্দায় ভেসে ওঠা পুরনো দিনের দর্শকদের ভিড়ে একটা চেনা মুখ।

নিনিশাচর রায়হান
  • ৫ মিনিট
  • ০ বার পড়া হয়েছে

২ অক্টোবর ২০২৬

লোককাহিনি

বেলতলার ব্রহ্মদৈত্য

পোড়ো ভিটার বেলগাছে থাকেন এক জ্ঞানী ব্রহ্মদৈত্য, যিনি পথিককে শুধু ধাঁধা জিজ্ঞেস করেন। কুয়াশার রাতে তেইশ বছরের অভিজ্ঞ এক মাস্টার দুটোর ঠিক উত্তর দিলেন। তৃতীয়টার দিলেন না।

শ্যাশ্যামল দত্ত
  • ৬ মিনিট
  • ০ বার পড়া হয়েছে

৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬