মেছো ভূতের মাছ
খালুই ভর্তি কই আর শোল নিয়ে রাতের আইল ধরে ফিরছিল কাশেম। পেছন থেকে ভেজা পায়ের শব্দ আর নাকি সুরে একটাই আবদার, “একটা মাছ দে।” কাশেম দেয়নি।
- ৫ মিনিট
- ০ বার পড়া হয়েছে
চাতলের বিল
ময়মনসিংহের গৌরীপুর থেকে আরো ভেতরে, কংসের একটা মরা শাখা যেখানে বিল হয়ে পড়ে আছে, লোকে তাকে বলে চাতলের বিল। দিনের বেলা শাপলা আর কচুরিপানা। রাতে ঘন কালো পানি, তার ওপর কুয়াশা জমে থাকে বুক সমান।
সে রাতে কাশেম মিয়া বিল থেকে ফিরছিল অনেক দেরিতে।
সারা বছর এমন দিন আসে না। সন্ধ্যা থেকে চাঁইয়ে মাছ ঢুকছিল তো ঢুকছিলই। হলুদ পেটের মোটা মোটা কই, কাঁটা খাড়া করে লাফায়। আর শোল — চারটা, প্রত্যেকটা হাতের কনুই সমান লম্বা, কালো পিঠে চাকা চাকা দাগ।
নৌকায় বসে কাশেম গুনেছিল দুবার। সাতাশটা কই, চারটা শোল।
মহাজনের দেনা তিন মাসের। বৃহস্পতিবার হাট। এই মাছ বেচলে অন্তত অর্ধেকটা শোধ হয়, ছেলে মানিকের জন্য একটা জামাও হয়।
খালুইটা কোমরে বেঁধে সে যখন আইলে উঠল, মসজিদের মাইকে এশার আজান হয়ে গেছে অনেক আগে। চারদিকে শুধু ঝিঁঝির ডাক, আর পায়ের নিচে কাদার চপচপ।
দাদির কথা মনে পড়ল তখনই। ছোটবেলায় দাদি বলতেন, মাছ নিয়ে রাতে বিল থেকে ফেরার সময় পেছন থেকে কেউ ডাকলে ফিরে তাকাবি না। কথা কবি না। আর যদি চায়, একটা মাছ ছুঁড়ে দিবি। একটা মাছেই ওরা খুশি।
গ্রামের বুড়োরা আরো বলত, চাতলের বিলে বহু বছর আগে এক জেলে ডুবে মরেছিল, মাছের লোভে কুয়াশার রাতে মাঝবিলে জাল ফেলতে গিয়ে। লাশ পাওয়া যায়নি। শুধু তিন দিন পর তার খালুইটা ভেসে উঠেছিল, ভেতরে একটাও মাছ নেই, কেবল কাদা আর আঁশ।
কাশেম আপনমনে হাসল। ওসব বুড়োদের গল্প। এই মাছের একটাও সে কাউকে দেবে না।
একটা মাছ দে
হিজলগাছটা পার হওয়ার পরই শব্দটা শুরু হলো।
পেছনে, ঠিক তার পায়ের তালে তালে, আরেক জোড়া পা। চপ। চপ। কিন্তু সেই পায়ের শব্দ ভেজা, যেন কেউ পানি থেকে সদ্য উঠে আসছে, গা থেকে ঝরঝর করে পানি পড়ছে।
তারপর এল গন্ধটা। পচা শ্যাওলা আর অনেক দিনের পুরনো মাছের আঁশটে গন্ধ, এত তীব্র যে কাশেমের গলায় বমি ঠেলে উঠল।
আর তারপর গলাটা।
নাকি সুর। টেনে টেনে, ভেজা, যেন কথাগুলো নাকের ভেতর দিয়ে গড়িয়ে বের হচ্ছে।
কাশেম ফিরে তাকাল না। পা চালাল জোরে।
“একঁটা দেঁ না রেঁ... এঁত্তগুলাঁ মাঁছ...”
গলাটা কাছে আসছিল। কাশেমের মনে হচ্ছিল, তার ঘাড়ের ঠিক পেছনে কেউ মুখ এনে দাঁড়িয়েছে। একটা হিম নিঃশ্বাস তার কানের লতি ছুঁয়ে যাচ্ছিল, আর সেই নিঃশ্বাসে কাদাপানির গন্ধ।
খালুইয়ের ভেতর কইগুলো হঠাৎ পাগলের মতো লাফাতে শুরু করল। যেন পালাতে চাইছে।
দাদির কথা মনে পড়ল আবার। একটা মাছ। শুধু একটা।
কিন্তু কাশেম ভাবল মহাজনের কথা, মানিকের ছেঁড়া জামার কথা। দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলল, “একটাও না। যা, ভাগ।”
সঙ্গে সঙ্গে পেছনের পায়ের শব্দ থেমে গেল।
অনেকক্ষণ কিছু নেই। শুধু ঝিঁঝি।
তারপর, অনেক দূর থেকে, বিলের দিক থেকে, একটা চাপা নাকি হাসি ভেসে এল। আর শেষ কথাটা:
“নাঁ দিঁলি তোঁ... আঁমি নিঁজেই যাঁমু।”
পাঁচটা শোল
বাড়ি ফিরে কাশেম উঠানের কোণে মাটির বড় গামলায় খালুই উপুড় করল। কুপির আলোয় চকচক করে উঠল মাছগুলো।
বউ জরিনা চোখ কচলাতে কচলাতে বেরিয়ে এল। “আল্লাহ গো! এত মাছ!”
কাশেম অভ্যাসমতো আবার গুনল। সাতাশটা কই।
শোল — এক, দুই, তিন, চার।
পাঁচ।
সে আবার গুনল। পাঁচটা শোল।
পঞ্চমটা সবচেয়ে বড়। গায়ের রং অন্যগুলোর মতো চাকা চাকা নয় — একদম কুচকুচে কালো, পিচ্ছিল, কুপির আলো যেন পিছলে যাচ্ছে তার গা থেকে। অন্য শোলগুলো খাবি খাচ্ছে, লেজ আছড়াচ্ছে। এটা নড়ছে না।
শুধু তার চোখ দুটো খোলা। সাদাটে, ঘোলা। আর কাশেমের দিকে ফেরানো।
“কী হইল?” জরিনা জিজ্ঞেস করল।
কাশেম কিছু বলল না। ক্লান্ত শরীর, মাথা ঝিমঝিম করছে। হয়তো নৌকায় গুনতে ভুল হয়েছিল। হয়তো অন্ধকারে একটা চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল।
হয়তো।
“এইটারে কাইল হাটে নিমু না,” সে শুধু বলল। “ফালায়া দিমু।”
জরিনা কিছু বুঝল না। এত বড় শোল কেউ ফেলে দেয়? সে মাথা নেড়ে ঘরে চলে গেল।
ঘরের ভেতর চৌকিতে কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছিল মানিক। ঘুমের মধ্যে সে একবার পাশ ফিরল, আর বিড়বিড় করে কী যেন বলল। কাশেম শুনতে পেল না।
সে হাত-পা ধুয়ে শুয়ে পড়ল। ঘুমিয়ে পড়ার আগে শেষ যা শুনল, তা হলো উঠানের গামলায় পানির ছপছপ। আর তার মনে হলো, খুব আস্তে, যেন কেউ নাক দিয়ে লম্বা শ্বাস টানছে।
আরেকটা
ঘুম ভাঙল অনেক বেলায়। রোদ উঠে গেছে, মোরগ ডাকা শেষ। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে সর্ষেবাটা আর কাঁচামরিচের ঝাঁঝালো গন্ধ।
কাশেম ধড়মড় করে উঠে বসল।
“জরিনা! মাছ কী করছস?”
জরিনা হাসিমুখে বেরিয়ে এল, আঁচলে হাত মুছতে মুছতে। “কইগুলা হাটে নেওনের লাইগা পানিতে জিয়াইয়া রাখছি। খালি বড় শোলটা রানছি। কতদিন পোলাটা ভালো মাছ খায় নাই। ভোর থাইকা খালি কইতেছিল, শোল খামু, শোল খামু।”
কাশেমের বুকের ভেতর কী যেন একটা ঠান্ডা হয়ে নেমে গেল।
“মানিক কই?”
দাওয়ায় বসে ছিল মানিক। সাত বছরের ছেলে, সামনে একটা খালি টিনের থালা। ভাত শেষ, তরকারি শেষ।
থালায় একটাও কাঁটা নেই। একটাও না। শোল মাছের অত বড় মাথাটা পর্যন্ত নেই।
মানিক ধীরে ধীরে মুখ তুলল। ঠোঁটের কোণে হলুদ ঝোল লেগে আছে। চোখ দুটো একটু বেশি বড়, একটু বেশি ঘোলাটে। পলক পড়ছে না।
তারপর সে কথা বলল। নাকি সুরে, টেনে টেনে, ভেজা গলায়।
জরিনা হেসে উঠল, “দেখছ, পোলায় ঢং শিখছে।”
কাশেম হাসল না। সে তাকিয়ে ছিল উঠানের দিকে, যেখানে সকালের রোদে মানিকের ছায়া পড়েছে।
মানিক বসে আছে দাওয়ায়। কিন্তু তার ছায়াটা দাঁড়িয়ে আছে উঠানের কোণে, পানিভরা হাঁড়িটার পাশে — যেখানে জিয়ানো আছে সাতাশটা কই। লম্বা, ভেজা একটা হাত বাড়িয়ে।