পদ্মার চরের অচেনা লোক
বানের পানি নামার পর চরের ঘাটে এসে বসে এক অচেনা লোক। সে গ্রামের সবার গোপন কথা জানে, আর জিজ্ঞেস করলে বলে দেয় কার মৃত্যু কোন দিন।
- ৫ মিনিট
- ১ বার পড়া হয়েছে
- ১ জন পছন্দ করেছেন
বানের পরের ভোর
সে বছর ভাদ্র মাসে পদ্মা যেন খেপে উঠেছিল। চর ভবানীপুরের অর্ধেক ঘরবাড়ি এক রাতে ভেসে গেল। গরু-ছাগল, ধানের গোলা, কলাগাছের সারি, সব। সেই রাতে আমি আর আব্বা নৌকা নিয়ে বেরিয়েছিলাম গোয়ালের গরু দুটো উঁচু ভিটায় সরাতে। স্রোত নৌকা উল্টে দিল। আব্বা কোনোমতে একটা বাঁশ ধরে পাড়ে উঠেছিল।
আমার শুধু মনে আছে কালো, ঠান্ডা, ভারী পানি। তারপর ভোরবেলা চোখ মেলে দেখি, আমি ঘাটের কাদায় শুয়ে আছি। গায়ের লুঙ্গি-গেঞ্জি ভেজা। সেই ভেজা ভাবটা তারপর আর কোনোদিন পুরো শুকায়নি।
পানি নামল সপ্তাহখানেক পর। আর তার পরদিন ভোরে ঘাটে এল অচেনা লোকটা।
কেউ তাকে নৌকা থেকে নামতে দেখেনি। ঘাটের পাশে উল্টে থাকা একটা পুরনো ডিঙির খোলের ওপর সে বসে ছিল, যেন বহুদিন ধরে সেখানেই বসা। রোগা, লম্বা, ছাই রঙের একটা পুরনো পাঞ্জাবি গায়ে। বয়স বোঝা যায় না। আর চোখ দুটো ঘোলা, ঠিক বর্ষার পদ্মার পানির রঙ।
গ্রামের লোক ভিড় করে তাকে দেখতে গেল। আমিও গেলাম। লোকটা সবার মুখের দিকে একে একে তাকাল। আমার মুখে এসে তার চোখ অনেকক্ষণ থেমে রইল। তারপর সে খুব আস্তে মাথা নাড়ল, যেন কিছু একটা বুঝে ফেলেছে।
সে সবার কথা জানে
প্রথম কথাটা সে বলল মাতবর হাশেম মোল্লাকে। ভিড়ের ভেতর থেকে মাতবর যখন হাঁক দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কেডা? কোন গেরামের?” লোকটা শান্ত গলায় উত্তর দিল।
“রিলিফের চাইল চল্লিশ বস্তা আইছিল, হাশেম। বিলি হইছে বাইশ বস্তা। বাকিডি তোমার খড়ের গাদার নিচে, পলিথিন দিয়া মোড়ানো। পানি ঢুকছে, পচন ধরছে।”
মাতবরের মুখ ছাইয়ের মতো হয়ে গেল। সেদিন বিকেলেই খড়ের গাদা সরানো হলো। আঠারো বস্তা চাল, অর্ধেক পচা।
তারপর থেকে সবাই তার কাছে যেতে লাগল, দূরে দাঁড়িয়ে, ভয়ে ভয়ে। আর সে বলতে লাগল। জমিলা খালাকে বলল, তার ছেলে বানে ডোবেনি, শহরে পালিয়েছে, নারায়ণগঞ্জের এক রঙের কারখানায় কাজ করে। মাসখানেক পর ছেলের চিঠি এল। কাশেম ব্যাপারীকে বলল, তার দাঁড়িপাল্লার নিচের পাল্লায় সীসা গলিয়ে লাগানো আছে। কাশেম আর হাটে বসেনি।
লোকটা কিছু খেত না। কেউ মুড়ি-গুড় দিয়ে গেলে সেটা পাশে পড়ে থাকত, পিঁপড়ে ধরত। রাতে কেউ তাকে ঘুমাতে দেখেনি। জোছনা রাতে ঘাটের দিকে তাকালে শুধু দেখা যেত, ডিঙির খোলের ওপর একটা লম্বা কালো ছায়া, নদীর দিকে মুখ করে বসা।
আর প্রত্যেককে, যে-ই জিজ্ঞেস করত, সে একটা তারিখ বলত।
মরার তারিখ।
ছমির চাচার বৃহস্পতিবার
প্রথমে কেউ বিশ্বাস করেনি। ছমির চাচা তো হাসতে হাসতেই জিজ্ঞেস করেছিল, বুড়ো মানুষ, দাঁত নেই, সারাদিন ঘাটে বসে হুঁকা টানে। লোকটা বলেছিল, “সামনের বিষ্যুদবারের পরের বিষ্যুদবার। আছরের ওক্ত। এই ঘাটেই।”
সেই বৃহস্পতিবার সারাদিন ছমির চাচার ছেলেরা তাকে ঘর থেকে বেরোতে দেয়নি। আছরের সময় চাচা বলল একটু পানি খাবে। ছোট বউ পানি আনতে গেল। ফিরে এসে দেখে ঘর খালি।
তাকে পাওয়া গেল ঘাটে, পানিতে পা ডুবিয়ে বসা, মাথা হেলানো, যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। হাতে তখনও হুঁকার নল।
সেই রাতে গ্রামের দশ-বারোজন লাঠি আর হারিকেন নিয়ে ঘাটে গেল লোকটাকে তাড়াতে। আমি পেছনে পেছনে গেলাম। লোকটা উল্টানো ডিঙির ওপর তেমনি বসে। সে কারো দিকে তাকাল না। শুধু একে একে প্রত্যেকের নাম ধরে ডাকল, আর প্রত্যেকের কানে কানে কী যেন বলল।
একজন একজন করে সবাই মাথা নিচু করে ফিরে গেল। কেউ কারো দিকে তাকাল না।
শুধু আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “বয়, নূরু।”
আমি তার নাম জানতাম না। সে আমার নাম জানত।
আমার তারিখ
তারপর থেকে প্রায় রোজ সন্ধ্যায় আমি গিয়ে তার পাশে বসতাম। গ্রামে আর কেউ আমার সঙ্গে তেমন কথা বলত না। বানের পর থেকে সবাই কেমন বদলে গেছে। আব্বা সারাদিন চুপ, আম্মা আমার দিকে তাকায়ই না, শুধু সন্ধ্যা হলে চুলার পাশে বসে একা একা কাঁদে। আমি কিছু বললে কেউ উত্তর দেয় না।
লোকটা উত্তর দিত। আমার সব কথার। নদীর কথা বলত, পুরনো চরের কথা, যেগুলো পদ্মা কবে খেয়ে ফেলেছে, কবে আবার উগরে দিয়েছে। তার পাশে বসলে শীত লাগত না। অথচ বাকি সবখানে, সবসময়, আমার হাড়ের ভেতর পর্যন্ত ঠান্ডা।
এক সন্ধ্যায় সাহস করে জিজ্ঞেস করলাম, “আমার তারিখটা কন।”
সে অনেকক্ষণ নদীর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “তোর তারিখ কওয়ার কাম নাই রে। কাইল বিদায় নিমু। তুই আমার লগে যাইস।”
“মায়েরে কইয়া আসি।”
সে মাথা নাড়ল। চোখে কেমন একটা মায়া।
বাড়ি ফিরে দেখি আম্মা চুলার পাশে বসে আছে। সামনে একটা টিনের থালায় ভাত, একটু ডাল, একটা শুকনো মরিচ পোড়া। আমার প্রিয়।
আম্মা থালাটার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করছিল।
আমি আম্মার কাঁধে হাত রাখলাম। আম্মা কেঁপে উঠল, গায়ের চাদরটা টেনে নিল। আব্বাকে ডেকে বলল, “দরজাডা লাগাও। নদীর দিক থেইকা কেমুন ঠান্ডা বাতাস আইতাছে।”
আমার হাত তখনও আম্মার কাঁধে। আম্মা টের পেল না।
সেই মুহূর্তে আমার মনে পড়ল, বানের রাতে আব্বা যখন বাঁশ ধরে পাড়ে উঠল, আমি তার হাত ছুঁতে পারিনি। পানি আমাকে নিচে টেনে নিয়েছিল। তারপর আর কিছু নেই। শুধু ভোরের কাদা, আর না-শুকানো ভেজা গা।
ঘাটে ফিরে গেলাম। উল্টানো ডিঙিটা সোজা হয়ে পানিতে ভাসছে। লোকটা তার গলুইয়ে দাঁড়িয়ে।
“আমার তারিখ কবে আছিল?”
“ভাদ্দরের তেরো,” সে বলল। “বানের রাইত। আমি তোরে নিতেই আইছিলাম রে, নূরু। তুই আসতে চাস নাই। তাই এতদিন বইসা আছিলাম।”
ডিঙিটা স্রোতের উল্টো দিকে চলতে শুরু করল, বৈঠা ছাড়াই। মাঝনদীতে গিয়ে একবার পেছনে তাকালাম।
ঘাটে আম্মা দাঁড়িয়ে আছে, হাতে হারিকেন, অন্ধকার নদীর দিকে চেয়ে। যেন কিছু একটা দেখতে পাচ্ছে।