শেষরাতের রিকশা
বৃষ্টিভেজা ঢাকায় রাত তিনটায় এক চুপচাপ যুবক কুদ্দুসের রিকশায় উঠল, যাবে আজিমপুর। ভাড়া দিল না, বলল সকালে মায়ের কাছ থেকে নিতে। সকালে সেই ঠিকানায় গিয়ে কুদ্দুস যা দেখল, তা সে আজও কাউকে বোঝাতে পারে না।
- ৫ মিনিট
- ০ বার পড়া হয়েছে
বৃষ্টির রাত
শ্রাবণ মাস। রাত তখন পৌনে তিনটা। সন্ধ্যা থেকে একটানা বৃষ্টি, ঢাকা মেডিকেলের সামনের রাস্তায় হাঁটুপানি। ল্যাম্পপোস্টের হলদে আলো পানিতে ভেঙে ভেঙে কাঁপছে।
আমি কুদ্দুস মিয়া। বাড়ি গাইবান্ধা, ঢাকায় রিকশা চালাই বারো বছর। কামরাঙ্গীরচরের একটা টিনশেড ঘরে থাকি। রাতের খ্যাপে ভাড়া বেশি, তাই বর্ষার রাতেও বের হই। সেদিন খ্যাপ পাইনি একটাও। পলিথিন মাথায় দিয়ে ইমার্জেন্সি গেটের উল্টো দিকে রিকশার সিটে বসে বিড়ি টানছিলাম।
হাসপাতালের গেট দিয়ে মাঝে মাঝে অ্যাম্বুলেন্স ঢুকছে, সাইরেন বাজিয়ে। ভেতর থেকে ভেসে আসছে কারও কান্না, কারও চিৎকার। এই গেটের সামনে বারো বছর রিকশা নিয়ে দাঁড়িয়ে আমার এসব গা-সওয়া হয়ে গেছে। মানুষ আসে, মানুষ যায়। কেউ হেঁটে বেরোয়, কেউ খাটিয়ায়।
তখনই সে এসে দাঁড়াল।
বাইশ-তেইশ বছরের একটা ছেলে। গায়ে সাদা পাঞ্জাবি, ভিজে গায়ের সঙ্গে লেপ্টে আছে। পায়ে স্যান্ডেল নেই। মুখটা ফ্যাকাশে, কিন্তু শান্ত। হাতে ছাতা নেই, অথচ বৃষ্টিতে ভিজছে বলে কোনো তাড়া নেই।
“চাচা, আজিমপুর যাবেন?”
গলাটা খুব নিচু, প্রায় ফিসফিসে। “যামু। একশো টাকা।”
সে কোনো দরদাম করল না। শুধু মাথা নেড়ে উঠে বসল।
পলাশীর মোড়
রিকশা চলতে শুরু করার পর প্রথম যেটা টের পেলাম, সেটা একটা গন্ধ। কর্পূরের গন্ধ। খুব তীব্র, ঠান্ডা, নাকের ভেতর জ্বালা ধরানো। সঙ্গে হালকা আতরের ঘ্রাণ।
আর রিকশাটা অদ্ভুত হালকা লাগছিল। প্যাডেল মারতে গিয়ে মনে হচ্ছিল পেছনে কেউ নেই। দুইবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম। আছে। চুপচাপ বসে আছে, দুই হাত কোলের ওপর জড়ো করা, চোখ সামনের দিকে।
বকশীবাজার পার হয়ে পলাশীর মোড়ে আসতেই সে বলল, “চাচা, একটু আস্তে চালান। এই রাস্তাটা একটু দেখি।”
আমি আস্তে চালালাম। সে বুয়েটের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর পলাশী বাজারের বন্ধ দোকানগুলোর দিকে। একটা চায়ের দোকানের ঝাঁপের সামনে এসে তার ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল।
“এইখানে বন্ধুদের সাথে রোজ চা খাইতাম,” সে বলল। কেমন যেন দূর থেকে আসা গলায়। “আর খাওয়া হইব না।”
আমি কিছু বললাম না। ঢাকা শহরে রাতের প্যাসেঞ্জার কত রকম কথা বলে। তবু ঘাড়ের কাছে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল।
নীরবতা ভাঙতে জিজ্ঞেস করলাম, “এত রাইতে হাসপাতালে কী করতেছিলেন, ভাই? রোগী আছে কেউ?”
সে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “না চাচা। আমিই আসছিলাম। এখন কাজ শেষ, বাসায় যাই। আম্মা একলা জাইগা বইসা আছে।”
আর একটা জিনিস খেয়াল করলাম। বৃষ্টি তখনো পড়ছিল, ঝিরঝির করে। আমার পলিথিনে টুপটাপ শব্দ হচ্ছে। কিন্তু রিকশার হুডের নিচে ছেলেটার গায়ে, তার চুলে, পড়ছিল না একফোঁটাও। অথচ তার পাঞ্জাবি ভেজা, চুল থেকে টপটপ করে পানি ঝরছে।
যেন সে অন্য কোনো পানিতে ভেজা।
হলুদ দোতলা বাড়ি
আজিমপুরে ঢুকে সে পথ দেখাল। কবরস্থানের দেয়াল ঘেঁষে গিয়ে বাঁয়ে, ছাপরা মসজিদের পাশের গলি, তারপর একটা হলুদ রঙের পুরোনো দোতলা বাড়ি। নিচতলার জানালায় আলো জ্বলছে। এত রাতেও।
সে নামল। আমি হাত বাড়ালাম।
“চাচা,” সে বলল, “আমার কাছে তো কিছু নাই। আপনি সকালে আইসা আম্মার কাছ থেকে ভাড়াটা নিয়েন। আম্মারে বইলেন, রাফি পাঠাইছে।”
রাগ উঠছিল। কিন্তু তার মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে পারলাম না। এত বিষণ্ণ মুখ আমি জীবনে দেখিনি।
গেটের দিকে যেতে যেতে সে একবার ফিরে তাকাল।
তারপর সে গেটের ভেতর ঢুকে গেল। গেটটা খুলল না। আমি স্পষ্ট দেখলাম, লোহার গ্রিলের তালা যেমন ঝুলছিল তেমনই ঝুলছে। তবু সে ভেতরে।
আমি আর দাঁড়াইনি। কিসের যেন ভয়ে সোজা কামরাঙ্গীরচর ফিরে গেলাম। শাহবাগের দিকে আর যাইনি, যদিও প্রতি রাতে শেষ খ্যাপের আশায় আমি ওখানেই দাঁড়াই।
সকালের খবর
সকাল দশটায় ভাড়ার আশায় না, কৌতূহলে আবার গেলাম সেই হলুদ বাড়িতে।
গলির মুখেই মানুষের ভিড়। আগরবাতির গন্ধ। উঠানে একটা খাটিয়া, তার ওপর সাদা কাপড়ে ঢাকা একজন। চারপাশে কান্না।
পাশের এক ভদ্রলোক বললেন, রাত আড়াইটার দিকে নীলক্ষেতের মোড়ে একটা প্রাইভেট কার মোটরসাইকেলটাকে চাপা দিয়ে চলে যায়। ছেলেটাকে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হয়েছিল। বাঁচানো যায়নি। এই বাড়ির ছোট ছেলে, রাফি। বুয়েটে পড়ত।
কেউ একজন খাটিয়ার কাপড়টা মুখের কাছ থেকে একটু সরাল, শেষবার দেখানোর জন্য।
আমি দেখলাম।
সেই ফ্যাকাশে, শান্ত মুখ। কপালের বাঁ দিকে ছোট্ট একটা কাটা দাগ, যেটা রাতে ল্যাম্পপোস্টের আলোয় একবার চোখে পড়েছিল, কিন্তু মনে রাখিনি। খাটিয়ার পায়ের কাছে রাখা একজোড়া স্যান্ডেল, রাস্তার কাদা মাখা। রাতে ছেলেটার পায়ে কোনো স্যান্ডেল ছিল না।
আমার পা আর চলছিল না। ফিরে যাওয়ার জন্য ঘুরতেই একজন মাঝবয়সী মহিলা ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলেন। চোখ ফুলে লাল। আমার রিকশার দিকে, আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
“বাবা, তুমি রিকশা চালাও?”
আমি মাথা নাড়লাম।
তিনি আঁচলের গিঁট খুলে একটা একশো টাকার নোট আমার হাতে গুঁজে দিলেন। হাত কাঁপছিল তাঁর।
আমি টাকাটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। কিছু বলতে পারলাম না।
বিকেলে বস্তিতে ফিরে খবর পেলাম। ভোর সাড়ে তিনটার দিকে শাহবাগের মোড়ে একটা বালুর ট্রাক ব্রেক ফেল করে ফুটপাতে উঠে গিয়েছিল। ঠিক যেখানে রাতের রিকশাগুলো সারি দিয়ে দাঁড়ায়। যেখানে আমি রোজ দাঁড়াই।
দুইজন রিকশাওয়ালা সেখানেই মারা গেছে।
সেই একশো টাকার নোটটা আমি আজও খরচ করিনি। লুঙ্গির কোঁচড়ে রাখি। নোটটা কখনো শুকায় না। সবসময় একটু ভেজা থাকে, আর তাতে লেগে থাকে কর্পূরের গন্ধ।