চরের স্কুলঘর
যমুনার চরের প্রাইমারি স্কুলের হাজিরা খাতায় একটা বাড়তি নাম। বর্ষা এলে রোল ডাকলেই খালি পেছনের বেঞ্চ থেকে একটা সরু গলা বলে ওঠে, “উপস্থিত, আপা।”
- ৫ মিনিট
- ০ বার পড়া হয়েছে
যমুনার মাঝখানে একটা টিনের ঘর
দুই হাজার তেরো সালে আমার প্রথম পোস্টিং হলো গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার এক চরে। চর কালাসোনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ঘাট থেকে শ্যালো নৌকায় দেড় ঘণ্টা, তারপর বালুর ওপর দিয়ে আধা ঘণ্টা হাঁটা। চারপাশে কাশবন, দূরে দূরে খড়ের ঘর, আর যতদূর চোখ যায় শুধু যমুনার ঘোলা পানি।
স্কুল বলতে একটা লম্বা টিনশেড ঘর, তিনটা কামরা। ছাত্রছাত্রী সব মিলিয়ে একশো বিশজন। শিক্ষক আমরা দুজন। আমি, আর প্রধান শিক্ষক মোখলেছুর রহমান। অবসরের আর দুই বছর বাকি, সাদা চুল, কথা বলেন কম, পান খান বেশি।
প্রথম দিনই তিনি আমার হাতে তৃতীয় শ্রেণির হাজিরা খাতাটা দিলেন। বললেন, “একটা কথা, আপা। খাতায় যত নাম আছে, সব ডাকবেন। একটাও বাদ দেবেন না।”
আমার থাকার ব্যবস্থা হলো স্কুলের পাশে এক কৃষকের বাড়ির বাইরের ঘরে। রাতে কুপির আলো, বাইরে শিয়ালের ডাক, আর সারারাত নদীর একটানা শব্দ। প্রথম কয়েক রাত ঘুমাতে পারিনি। পরে বুঝেছি, চরের মানুষ নদীর শব্দ শুনেই ঘুমায়। যেদিন শব্দটা বদলে যায়, সেদিন তারা জেগে বসে থাকে।
কথাটার মানে বুঝলাম খাতা খুলে।
রোল উনচল্লিশ
তৃতীয় শ্রেণিতে ছাত্রছাত্রী আটত্রিশজন। কিন্তু খাতায় নাম উনচল্লিশটা। আটত্রিশের পরে, নীল কালিতে, পুরনো ধাঁচের গোটা গোটা অক্ষরে লেখা একটা নাম।
আগের বছরের খাতা দেখলাম। সেখানেও নামটা আছে। তার আগের বছরেও। প্রতি বছর নতুন খাতায় কেউ হাতে লিখে নামটা তুলে এনেছে। আর প্রতিদিনের ঘরে একটা করে টিক চিহ্ন। উপস্থিত।
মোখলেছ স্যারকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি পানের পিক ফেলে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর শুধু বললেন, “পুরাতন কালাসোনা গ্রামটা এখন নদীর মাঝখানে, আপা। আটানব্বইয়ের বানে গেছে। স্কুলঘরটাও।”
আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি। শহরের মেয়ে, ভেবেছিলাম পুরনো মানুষের কোনো শোক, কোনো অভ্যাস। শুকনো মৌসুমের ক'মাস আমি নামটা ডাকতাম, কেউ উত্তর দিত না, আমি টিক দিতাম। ব্যাপারটা নিয়ে আর ভাবতাম না।
তারপর আষাঢ় এল।
পেছনের বেঞ্চ
সেদিন সকাল থেকে মুষলধারে বৃষ্টি। টিনের চালে এমন শব্দ যে নিজের গলা নিজে শোনা যায় না। অর্ধেক বাচ্চা আসেনি। ক্লাসে আঠারো-উনিশজন, সবাই সামনের দিকের বেঞ্চে গাদাগাদি করে বসা। পেছনের তিনটা বেঞ্চ খালি, চাল চুইয়ে পানি পড়ছে।
আমি রোল ডাকছিলাম। পঁয়ত্রিশ, ছত্রিশ, সাঁইত্রিশ, আটত্রিশ।
“উনচল্লিশ। আছিয়া খাতুন।”
বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে, একদম পেছনের খালি বেঞ্চ থেকে, একটা সরু মেয়েলি গলা ভেসে এল।
“উপস্থিত, আপা।”
আমার হাত থেকে কলম পড়ে গেল। পেছনের বেঞ্চে কেউ নেই। শুধু বেঞ্চের নিচে মাটির মেঝেতে ছোট ছোট দুটো খালি পায়ের ছাপ, কাদাপানিতে ভেজা, যেন এইমাত্র কেউ নদী থেকে উঠে এসে বসেছে।
সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার কী জানেন? বাচ্চারা কেউ পেছনে তাকাল না। কেউ চমকাল না। ওরা জানত।
সেদিন ছুটির পর মোখলেছ স্যার বললেন পুরো ঘটনা। আটানব্বইয়ের ভাদ্র মাসে আছিয়া তাঁর ক্লাসের ছাত্রী ছিল। একদিনও স্কুল কামাই করত না। বানের সময় স্কুল বন্ধ, তবু এক সকালে বাবার ডিঙি নিয়ে একা বেরিয়েছিল, স্কুলঘরে ফেলে আসা বইগুলো আনতে। ডিঙিটা পাওয়া গিয়েছিল তিন দিন পর, ভাটিতে। আছিয়াকে পাওয়া যায়নি।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, বাচ্চারা ভয় পায় না? স্যার একটু হাসলেন। বললেন, চরের বাচ্চারা নদীকে ভয় পায়, নদীর মানুষকে না।
“পরের বছর থেকে বর্ষায় সে হাজিরা দেয়,” স্যার বললেন। “আমি তার নাম কাটতে পারি নাই, আপা।”
যেদিন নাম ডাকিনি
দুই বছর পর মোখলেছ স্যার অবসরে গেলেন। সেই বর্ষাতেই উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে পরিদর্শনে এলেন একজন কর্মকর্তা। খাতায় উনচল্লিশ নম্বর দেখে তিনি রেগে গেলেন। ভুয়া নাম, উপবৃত্তির দুর্নীতি, শো-কজ। আমি কিছু বোঝাতে পারলাম না। তাঁর সামনেই লাল কালিতে নামটা কেটে দিলাম।
পরদিন রোল ডাকলাম আটত্রিশ পর্যন্ত। থামলাম। খাতা বন্ধ করলাম।
ক্লাসে একটা অদ্ভুত নীরবতা নামল। বাইরে বৃষ্টির শব্দও যেন থেমে গেল এক মুহূর্তের জন্য।
সেদিন বিকেলে ছুটির পর আমরা বাচ্চাদের নিয়ে স্কুলের নৌকায় খাল পার হচ্ছিলাম। স্রোত ছিল প্রবল। হঠাৎ নৌকা দুলে উঠল, আর ক্লাস ওয়ানের রাজু নামের ছোট্ট একটা ছেলে পানিতে পড়ে গেল। আমি সাঁতার জানি না। মাঝি বৈঠা ফেলে লাফ দেওয়ার আগেই রাজু ঘোলা পানির নিচে হারিয়ে গেল।
তারপর দেখলাম, নৌকার কিনারায় দুটো সরু হাত। একটা ফিকে নীল ফ্রক। রাজুকে কেউ ঠেলে তুলে দিল নৌকার ওপর, আর সঙ্গে সঙ্গে সেই হাত দুটো পানির ভেতর মিলিয়ে গেল। কোনো মাথা ওঠেনি, কোনো ঢেউ ওঠেনি।
রাজু কাশতে কাশতে বলল, “আছিয়া আপায় ধরছিল।”
পরদিন সকালে আমি নতুন করে নামটা লিখলাম, নীল কালিতে। রোল ডাকলাম। উনচল্লিশে এসে গলা কাঁপছিল।
“উপস্থিত, আপা।”
এবার গলাটা ভেজা, ক্লান্ত, যেন অনেক দূর থেকে সাঁতরে এসেছে।
খাতার শেষ পাতা
দুই হাজার সতেরোতে আমি বদলি হয়ে রংপুরে চলে আসি। যাওয়ার আগে নতুন শিক্ষককে খাতাটা বুঝিয়ে দিয়ে এসেছিলাম। একটা কথাই বলেছিলাম, যেটা আমাকে বলা হয়েছিল।
রংপুরের স্কুলে আমার ক্লাসে এখন পঞ্চাশজন বাচ্চা। পাকা দালান, বৈদ্যুতিক পাখা, পেছনের বেঞ্চগুলো সবসময় ভরা। তবু বর্ষার সকালে রোল ডাকার সময় শেষ নামটার পরে আমি অজান্তেই এক মুহূর্ত থেমে যাই। কান পেতে থাকি।
গত বছর বর্ষায় সেই শিক্ষক আমাকে ফোন করেছিলেন। মোখলেছ স্যার তার আগের মাসে মারা গেছেন। ফোনে ছেলেটার গলা কাঁপছিল।
“আপা, খাতায় উনচল্লিশের পরে কে যেন আরেকটা নাম লিখে রেখে গেছে। পুরনো নীল কালিতে। ডাকলে পেছনের বেঞ্চ থেকে একজন বুড়া মানুষের গলায় উত্তর আসে।”
নামটা মোখলেছুর রহমান। আর তার পাশে, মন্তব্যের ঘরে, সেই চেনা গোটা গোটা হাতের লেখায় লেখা: “মেয়েটা একা বসতে ভয় পায়।”