হাওরের ডুবো গ্রাম
বর্ষার হাওরে বুড়ো মাঝি বলেছিল, এই পানির নিচে একটা গ্রাম আছে, অমাবস্যার রাতে যেখানে এখনো কুপি জ্বলে। ঢাকা থেকে আসা তরুণ গবেষক নিজের চোখে দেখতে চেয়েছিল। দেখেও ছিল। আর ওরাও তাকে দেখেছিল।
- ৫ মিনিট
- ০ বার পড়া হয়েছে
মাঝির গল্প
শ্রাবণের মাঝামাঝি। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর থেকে ইঞ্জিনের নৌকায় ঘণ্টা তিনেক গেলে চারদিকে শুধু পানি আর পানি। দিগন্ত পর্যন্ত ধূসর, সমতল, নিস্তব্ধ। দূরে মেঘালয়ের পাহাড় মেঘে ঢাকা। মাঝে মাঝে পানির ওপর মাথা তুলে আছে হিজল আর করচ গাছের মাথা, যেন ডুবন্ত মানুষ শেষবারের মতো হাত তুলেছে।
আমি সাদিক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূগোলে মাস্টার্স করছি। থিসিসের বিষয়, হাওর অঞ্চলে নদীর গতিপথ বদলে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া জনবসতি। সেই কাজেই মাসখানেক ধরে এই অঞ্চলে ঘুরছি।
আমার মাঝি কালাম চাচা। ষাটোর্ধ্ব, রোদে পোড়া তামাটে শরীর, কথা কম বলেন। দ্বিতীয় দিন সন্ধ্যায়, ফেরার পথে, একটা জায়গায় এসে তিনি হঠাৎ ইঞ্জিন বন্ধ করে দিলেন। বইঠা দিয়ে খুব সাবধানে জায়গাটা পাশ কাটালেন।
“এইখানে ইঞ্জিন চালাই না, ভাইজান,” জিজ্ঞেস করতেই বললেন। “নিচে মানুষ ঘুমায়।”
তারপর ধীরে ধীরে বললেন গল্পটা। এই পানির নিচে একসময় একটা গ্রাম ছিল, নাম চানপুর। পঞ্চাশ-ষাট ঘর মানুষ। এক আষাঢ়ের রাতে পাহাড় থেকে এমন ঢল নামল যে ভোর হওয়ার আগেই গোটা গ্রাম তলিয়ে গেল। সেই রাতে গ্রামে বিয়ে ছিল। গীত হচ্ছিল, হলুদ বাটা হচ্ছিল। কেউ বের হতে পারেনি।
“অমাবস্যার রাতে এইখানে পানির নিচে কুপি জ্বলে,” কালাম চাচা বললেন। “আর গীতের আওয়াজ আসে। এখনো বিয়া চলতেছে, বুঝলেন? বউ আসে নাই তো, তাই শেষ হয় না।”
অমাবস্যা
আমি গবেষক মানুষ। গল্পটা নোটবুকে টুকে রাখলাম, লোককথা হিসেবে। কিন্তু মনের ভেতর একটা কৌতূহল খোঁচাতে লাগল। কে জানে, হয়তো পানির নিচে কোনো প্রাকৃতিক আলোর উৎস আছে। মিথেন গ্যাস, ফসফরাস, কিছু একটা।
পরদিন উপজেলা ভূমি অফিসের পুরোনো মহাফেজখানায় গিয়ে ধুলোমাখা খতিয়ানের স্তূপ ঘাঁটলাম। ঘণ্টা তিনেক পর পাকিস্তান আমলের একটা জীর্ণ মৌজা ম্যাপে নামটা পেয়ে গেলাম। চানপুর। হাওরের ঠিক ওই জায়গায়, ছোট ছোট চৌকো ঘর আঁকা, পাশে একটা মসজিদ আর একটা পুকুরের চিহ্ন। পরের বছরের ম্যাপে জায়গাটা শুধু নীল রঙে ভরাট। পাশে কেউ লাল কালিতে লিখে রেখেছে, “নদীগর্ভে বিলীন”।
কেরানি ভদ্রলোক ম্যাপটা আমার হাত থেকে নিয়ে তাড়াতাড়ি ভাঁজ করে ফেললেন। বললেন, “এইটা নিয়া বেশি ঘাঁটাঘাঁটি না করাই ভালো, স্যার।”
পাঁচ দিন পর অমাবস্যা। কালাম চাচা কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না। শেষে দ্বিগুণ ভাড়া আর অনেক অনুনয়ের পর রাজি হলেন, এক শর্তে। “পানির দিকে ঝুঁকবেন না। কেউ ডাকলে জবাব দিবেন না। আর আমি যখন কমু ফিরা যাই, তখন ফিরা যাইবেন।”
রাত সাড়ে এগারোটায় আমরা পৌঁছালাম। আকাশে একটা তারাও নেই। হাওরের বাতাস হঠাৎ থেমে গেছে। পানি এমন স্থির যে মনে হচ্ছিল কালো কাচের ওপর ভাসছি।
কালাম চাচা ইঞ্জিন বন্ধ করে বইঠা তুলে রাখলেন। নৌকার পাটাতনে বসে তসবিহ গুনতে লাগলেন। শুধু তাঁর ঠোঁটের মৃদু শব্দ, আর অনেক দূরে কোথাও একটা ডাহুকের একটানা ডাক। ঘড়ির কাঁটা বারোটা পেরোল। আমার গায়ের লোম কাঁটা দিয়ে উঠছিল, যদিও বাতাস ছিল ভ্যাপসা গরম।
প্রথমে কিছুই দেখা গেল না।
তারপর নৌকার ডান দিকে, অনেক নিচে, একটা মৃদু হলুদ আলো জ্বলে উঠল। তারপর আরেকটা। তারপর আরও।
কুপির আলো। কাঁপা কাঁপা, উষ্ণ, ঠিক যেমন গ্রামের উঠানে জ্বলে।
আলোয় আবছা ফুটে উঠল টিনের চাল। একটা মাটির উঠান। কলাগাছের ঝাড়। আর উঠানে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মানুষ। সবাই মুখ তুলে ওপরে তাকিয়ে আছে। আমাদের দিকে।
গীত
পানির নিচ থেকে খুব ক্ষীণ একটা সুর ভেসে আসছিল। মেয়েদের গলা। বিয়ের গীত।
আমি নিজের অজান্তে ঝুঁকে পড়েছিলাম। ক্যামেরা তাক করে ছবি তুলছিলাম, ফোনে রেকর্ড চলছিল। উঠানের মাঝখানে একজন বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে। তার হাতে একটা পিতলের থালা, থালায় হলুদ। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। তারপর ধীরে ধীরে হাত তুলে ইশারা করলেন।
নিচে আয়।
পানিটা হঠাৎ খুব ঠান্ডা লাগল। আমার হাতের আঙুল কখন পানিতে ডুবেছে, টের পাইনি। মনে হলো কেউ খুব নরম করে আঙুলগুলো ধরেছে।
কালাম চাচা আমার জামার কলার ধরে এক হ্যাঁচকা টানে পেছনে ফেলে দিলেন। তারপর গলা ছেড়ে আয়াতুল কুরসি পড়তে পড়তে ইঞ্জিন চালু করলেন। নৌকা ঘুরল। পেছনে তাকিয়ে দেখলাম, আলোগুলো একে একে নিভে যাচ্ছে।
শেষ আলোটা নেভার আগে মনে হলো, গীতটা থেমে গেছে। আর কেউ একজন খুব স্পষ্ট করে একটা নাম ধরে ডাকল।
দাদির গ্রাম
ফেরার পর তাহিরপুরের হোটেলে বসে রেকর্ডিংটা চালালাম। প্রথমে শুধু ইঞ্জিনের শব্দ, পানির ছলাৎ। তারপর, খুব নিচু, সেই গীত। আর একেবারে শেষে একটা বয়স্ক মহিলার কণ্ঠ।
জোবেদা।
আমার দাদির নাম জোবেদা খাতুন।
সেই রাতেই বাড়িতে ফোন দিলাম। আব্বা অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, দাদির বাপের বাড়ি ছিল সুনামগঞ্জের ভাটিতে কোথাও। দাদি কখনো গ্রামের নাম বলতেন না, জিজ্ঞেস করলে বলতেন, ওইটা পানির নিচে। ষোল বছর বয়সে বিয়ের আগের রাতে তিনি এক চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে নৌকায় করে পালিয়ে এসেছিলেন। পরদিন ভোরে খবর আসে, গোটা গ্রাম ঢলে ডুবে গেছে।
দাদি মারা গেছেন বারো বছর আগে। কিন্তু চানপুরের বিয়েটা এখনো শেষ হয়নি। বউ আসেনি।
আর এখন ওরা জেনে গেছে, বউয়ের রক্ত কোথায় আছে।
ফোন রাখার আগে আব্বা আরেকটা কথা বললেন, প্রায় ফিসফিস করে। মৃত্যুর আগের কয়েক মাস দাদি রাতে ঘুমের মধ্যে গীত গাইতেন। আর ঘুম ভেঙে উঠে বলতেন, ওরা ডাকে। ওরা এখনো আমার জন্য হলুদ বাইটা বইসা আছে।
ঢাকায় ফিরেছি তিন সপ্তাহ হলো। থিসিসের কাজ বন্ধ। রাতে ঘুম হয় না।
গতকাল রাতে বাথরুমে গিয়ে দেখি, বালতিতে জমানো পানি থেকে হাওরের কাদার গন্ধ আসছে। পানিটা অদ্ভুত রকম স্থির, কালো কাচের মতো। আর অনেক নিচে, বালতির তলা ছাড়িয়ে আরও অনেক নিচে, খুব মৃদু একটা হলুদ আলো কাঁপছে।
আমি কান পাতলাম।
গীত হচ্ছে।