নাইট ডিউটি
মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাত নম্বর ওয়ার্ডে প্রথম নাইট ডিউটি পড়ল ইন্টার্ন ডাক্তার নাদিয়ার। রাত দুটোয় বেড নম্বর উনিশ থেকে ডাক এল—অথচ সেই বেড গত তিন দিন ধরে খালি।
- ৫ মিনিট
- ১৪ হাজার বার পড়া হয়েছে
- ৮২০ জন পছন্দ করেছেন
সাত নম্বর ওয়ার্ড
ইন্টার্নশিপের তৃতীয় মাসে প্রথম একা নাইট ডিউটি পড়ল নাদিয়ার। মেডিসিন ওয়ার্ড, পুরোনো ভবনের তিনতলা, চল্লিশটা বেড আর মেঝেতে আরও বিশজন রোগী। রাতে ডাক্তার বলতে সে একা, আর সিনিয়র নার্স মমতাজ আপা।
মমতাজ আপার বয়স পঞ্চাশের ওপরে। এই ওয়ার্ডে বাইশ বছর। হাসপাতালের প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি জং ধরা বেড, প্রতিটি ঝিঁঝি করা টিউবলাইট তার চেনা। ডিউটি হ্যান্ডওভারের সময় তিনি নাদিয়াকে সব বুঝিয়ে দিলেন—কোন রোগীর স্যালাইন কখন বদলাতে হবে, কার শ্বাসকষ্ট বাড়তে পারে, কোন আত্মীয় ঝামেলা করে।
তারপর গলা একটু নামিয়ে বললেন, "আর উনিশ নম্বর বেড থেকে ডাক এলে, আগে আমাকে জানাবেন। একা যাবেন না।"
নাদিয়া চার্ট দেখল। "উনিশ তো খালি।"
"হ্যাঁ," মমতাজ আপা বললেন। "খালি।"
রাত দুটো
রাত বারোটা পর্যন্ত কাজের চাপে দম ফেলার ফুরসত ছিল না। একজন বৃদ্ধের হাইপোগ্লাইসেমিয়া, একজন তরুণের জ্বর একশো চারে, এক মহিলার বুকে ব্যথা—ইসিজি, ওষুধ, মনিটরিং। একটার দিকে ওয়ার্ড একটু শান্ত হলো। রোগীরা ঘুমিয়ে পড়ল, আত্মীয়রা মেঝেতে চাদর বিছিয়ে কাত হলো। শুধু মনিটরের বিপ বিপ আর ফ্যানের ঘরঘর।
নাদিয়া নার্সিং স্টেশনে বসে চা খাচ্ছিল। মমতাজ আপা গেছেন নিচে, ফার্মেসি থেকে জরুরি ইনজেকশন আনতে।
রাত দুটো বাজতে দুই মিনিট বাকি থাকতে কল বেল বাজল।
নার্সিং স্টেশনের পুরোনো প্যানেলে একটা লাল বাতি জ্বলছে। নাদিয়া তাকাল।
১৯।
সে উঠে ওয়ার্ডের দিকে তাকাল। উনিশ নম্বর বেড ওয়ার্ডের একেবারে শেষ মাথায়, জানালার পাশে। পর্দা টানা। অন্ধকার।
নিশ্চয়ই তারের সমস্যা, সে ভাবল। পুরোনো ভবন, পুরোনো ওয়্যারিং।
বেলটা আবার বাজল। এবার একটানা। জরুরি ডাকের মতো।
নাদিয়া মমতাজ আপার কথা মনে করল। কিন্তু সে ডাক্তার। একটা খালি বেডের কল বেল তাকে ভয় পাওয়াবে—এটা মেনে নিতে তার অহংকারে লাগল। সে টর্চ নিয়ে এগিয়ে গেল।
পর্দার ওপাশে
ওয়ার্ডের মাঝখান দিয়ে হাঁটার সময় সে খেয়াল করল, দুই পাশের রোগীরা সবাই ঘুমিয়ে। কিন্তু সবার মুখ ঘোরানো একই দিকে—উনিশ নম্বর বেডের দিকে। যেন ঘুমের মধ্যেও তারা কিছু একটা দেখছে।
পর্দার কাছে পৌঁছে নাদিয়া থামল। পর্দার ওপাশ থেকে একটা শব্দ আসছে। শ্বাসের শব্দ। ভারী, ঘড়ঘড়ে, ফুসফুসে পানি জমলে যেমন হয়। নাদিয়া এই শব্দ চেনে—টার্মিনাল স্টেজের নিউমোনিয়া।
সে পর্দা সরাল।
বেডে একজন বৃদ্ধ শুয়ে আছেন। শীর্ণ, সাদা দাড়ি, গায়ে হাসপাতালের পুরোনো ধরনের নীল ডোরাকাটা জামা—যে জামা এখন আর দেওয়া হয় না। নাকে অক্সিজেনের নল, কিন্তু নলটা কোনো সিলিন্ডারে লাগানো নেই। শূন্যে ঝুলছে।
বৃদ্ধ চোখ খুললেন। ঘোলাটে, কিন্তু সচেতন।
"ডাক্তার আপা," তিনি ফিসফিস করে বললেন। "আমার পোলারে একটা খবর দেন। ও বাইরে বইসা আছে। কন, আব্বা আর রাগ নাই।"
নাদিয়া স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার ডাক্তারি মন বলছিল—পালস দেখো, স্যাচুরেশন মাপো। কিন্তু তার হাত নড়ছিল না।
"আপনার ছেলে কোথায়?"
বৃদ্ধ জানালার দিকে ইশারা করলেন। "বাইরে। বারান্দায়। রাত দুইটায় আমি মরছিলাম, আর ও বারান্দায় বইসা কানতেছিল। ভিতরে আসে নাই। ঝগড়া কইরা দশ বছর কথা কই নাই তো। ও ভাবছিল আমি ওরে দেখতে চাই না।"
তারপর বৃদ্ধ হাসলেন—ভাঙা দাঁতে, অসম্ভব দুঃখী একটা হাসি।
"বাইশ বছর ধইরা বেল বাজাই, আপা। কেউ খবরটা দেয় না।"
মমতাজ আপার খাতা
নাদিয়া কীভাবে নার্সিং স্টেশনে ফিরে এসেছিল, মনে নেই। মমতাজ আপা তখন ফিরে এসেছেন। নাদিয়ার মুখ দেখে তিনি চেয়ার এগিয়ে দিলেন, এক গ্লাস পানি।
"দেখা হইছে?"
নাদিয়া মাথা নাড়ল।
মমতাজ আপা ড্রয়ার থেকে একটা পুরোনো রেজিস্টার খাতা বের করলেন। হলদে পাতা, বাইশ বছর আগের তারিখ। একটা এন্ট্রিতে আঙুল রাখলেন।
নিচে নার্সের সই। মমতাজ বেগম।
"আমার প্রথম নাইট ডিউটি ছিল সেইটা," মমতাজ আপা বললেন, খুব আস্তে। "ওয়ার্ডে তিনজন খারাপ রোগী। আমি ভাবছিলাম, একটু পরে বাইরে গিয়া বলমু। একটু পরে আর হয় নাই।"
তিনি খাতাটা বন্ধ করলেন।
"বাইশ বছর ধইরা এই ওয়ার্ডে আছি। বদলির সুযোগ পাইছি চারবার। যাই নাই। প্রতি রাতে ভাবি, আজ হয়তো উনি আমারে ডাকবেন। আমি গিয়া মাফ চামু। কিন্তু উনি কোনোদিন আমারে ডাকেন না। খালি নতুন ডাক্তারদের ডাকেন।"
পরের সপ্তাহে নাদিয়া হাসপাতালের পুরোনো রেকর্ড ঘেঁটে জাকির হোসেনের ঠিকানা বের করল। মিরপুরের একটা পুরোনো বাড়ি। দরজা খুললেন ষাট বছরের এক ভদ্রলোক। নাদিয়া পরিচয় দিল, তারপর কথাটা বলল—যেভাবে শুনেছিল, ঠিক সেভাবে।
"আব্বা আর রাগ নাই।"
ভদ্রলোক দরজার চৌকাঠ ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর বাইশ বছরের জমানো কান্না কাঁদলেন, একটা অচেনা মেয়ের সামনে, প্রকাশ্যে, নিঃসংকোচে।
সেই রাত থেকে সাত নম্বর ওয়ার্ডের উনিশ নম্বর বেডের বেল আর বাজেনি।
মমতাজ আপা অবসরে গেলেন সেই বছরের শেষে। বিদায়ের দিন তিনি নাদিয়ার হাত ধরে একটা কথা বলেছিলেন, যেটা নাদিয়া কোনোদিন কাউকে বলেনি।