মূল লেখায় যান

ঝড়ের রাতের অতিথি

দশ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের রাতে চরফ্যাশনের এক ঘরের দরজায় কড়া নাড়ল ভেজা এক কিশোর। সবাই দ্বিধায়, শুধু দাদি ছুটে গিয়ে খিল খুললেন—কারণ এই মুখ তিনি চেনেন, বহু বছর আগের এক ঝড়ের রাত থেকে।

অঅধীর সেন@adhir
  • ৫ মিনিট
  • ১ বার পড়া হয়েছে
ঝড়ের রাতের অতিথি

দশ নম্বর

বিকেল থেকে রেডিওতে একই কথা ঘুরে ঘুরে বাজছিল। “পায়রা ও চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে দশ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উপকূলীয় জেলা ভোলা এবং এর অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহ...”

আকাশটা ছিল পোড়া তামার রং। বাতাসে লবণের গন্ধ। বাড়ির পেছনের নারকেলগাছগুলো এমনভাবে দুলছিল, যেন কেউ তাদের চুল ধরে টানছে। পুকুরের পানি কালো হয়ে ফুঁসছিল।

চরফ্যাশনের এই চরে আমাদের বাড়ি বেড়িবাঁধের বাইরে। সাইক্লোন শেল্টার দেড় কিলোমিটার দূরে। মাগরিবের আগে স্বেচ্ছাসেবকেরা মাইকিং করে গেছে। পাশের বাড়ির সবাই চলে গেছে, গরু-ছাগল নিয়ে, বাক্স-পেটরা মাথায়।

আব্বা যাবেন না। “গরু দুইটা কই রাখমু? ঘর খালি পাইলে চোরে সব নিয়া যাইব। আগেও তো কত সিগনাল আইল, কী হইল?”

আম্মা কিছু বলেন না। ছোট বোন মিতু আমার হাত ধরে বসে থাকে। আমি কলেজের ছুটিতে বাড়ি এসেছি, তর্ক করার সাহস হয় না।

শুধু দাদি সারা সন্ধ্যা দরজার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। পানের বাটা খোলেননি। তসবি ঘুরছিল আঙুলে, ঠোঁট নড়ছিল নিঃশব্দে। একবার শুধু বললেন, “আইজকা দরজায় খিল দিস না কেউ।”

আমরা কেউ গা করিনি। দাদি কোনোদিনই খিল দিতে দেন না। বুড়ো মানুষের খেয়াল।


কড়া নাড়া

রাত সাড়ে দশটায় বিদ্যুৎ গেল। হারিকেনের আলোয় ঘরের দেয়ালগুলো কাঁপছিল। বাইরে বাতাসের শব্দটা আর বাতাসের মতো ছিল না—একটা টানা, চাপা গর্জন, যেন মাটির নিচ দিয়ে কোনো বিশাল জন্তু হেঁটে যাচ্ছে।

তারপর দরজায় শব্দ হলো।

ঠক। ঠক। ঠক।

আব্বা উঠে দাঁড়ালেন। “এই ঝড়ে কে?”

দরজার ওপাশ থেকে একটা কাঁপা গলা ভেসে এল। “একটু জায়গা দেন। ভিজা গেছি। খুব শীত।”

আব্বা ইতস্তত করছিলেন। এমন রাতে অচেনা লোক... কিন্তু দাদি তার আগেই উঠে গেছেন। সত্তর পেরোনো হাড্ডিসার শরীরটা নিয়ে, হাঁটুর ব্যথা ভুলে, প্রায় ছুটে গিয়ে দরজার পাল্লা টেনে খুলে দিলেন।

দমকা বাতাসের সঙ্গে ভেতরে ঢুকল একটা ছেলে। ষোলো-সতেরো বছর হবে। গায়ে একটা ছেঁড়া হাফশার্ট, কোমরে গামছা বাঁধা, পা খালি। সারা শরীর থেকে পানি ঝরছে। আর একটা গন্ধ—নোনা কাদা আর শ্যাওলার গন্ধ, যেন সে বৃষ্টি থেকে না, সমুদ্রের তলা থেকে উঠে এসেছে।

হারিকেনের আলোয় ছেলেটার মুখ দেখে দাদি দুই হাতে নিজের মুখ চেপে ধরলেন।

অনেকক্ষণ পর শুধু একটা শব্দ বেরোল তাঁর গলা দিয়ে।

“মজিদ।”


অনেক আগের এক রাত

ছেলেটা কিছু বলল না। দাদির দিকে তাকিয়ে রইল। ওর ঠোঁট নীল, চোখের পাতায় বালির দানা লেগে আছে।

আব্বা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলেন, “আম্মা, কারে কন?”

দাদি উত্তর দিলেন আমাদের দিকে না তাকিয়ে। গলাটা যেন অনেক দূর থেকে আসছিল।

“তোরা জানস না। কোনোদিন কই নাই।

“আমার তখন বারো বছর। এই রকমই এক রাইত। তখন সবার ঘরে রেডিও আছিল না, সিগনাল কারে কয় কেউ বুঝত না। আমার বড় ভাই মজিদ, ষোলো বছর বয়স। সন্ধ্যায় দেখল খালের পানি ফুইলা উঠতেছে। কইল, ‘আমি পাড়ার মাইনষেরে খবর দিয়া আসি। তোমরা দরজা দিয়া থাকো।’ বাইর হইয়া গেল।”

দাদি থামলেন। বাইরে কী একটা ভেঙে পড়ার শব্দ হলো।

“মাঝরাইতে দরজায় কড়া নড়ল। আমার আব্বা ভাবলেন বাতাস। নাইলে ডাকাইত—ওই সময় ডাকাইতের ভয়ও আছিল। খিল খুললেন না। কড়া নড়তেই থাকল, নড়তেই থাকল... আমি কানে হাত দিয়া শুইয়া আছিলাম। তারপর থাইমা গেল।”

“তারপর পানি আইল। ঘরের চাল পর্যন্ত। আমরা চালের উপর উইঠা বাঁচলাম। সকালে পানি নামলে দরজা খুইলা দেখি...”

দাদি আর বলতে পারলেন না।

দরকারও ছিল না। ছেলেটার পায়ের নিচে, মাটির মেঝেতে, ততক্ষণে একটা ছোট নোনা পানির পুকুর জমে গেছে। হারিকেনের শিখাটা কাঁপছিল না, যদিও দরজা দিয়ে হু হু করে বাতাস ঢুকছে। ঘরে আর কেউ নড়ছিল না।


দরজা খোলা

ছেলেটা এবার প্রথম কথা বলল। গলাটা পানির নিচ থেকে ওঠা বুদ্বুদের মতো ভাঙা ভাঙা।

“পানি আইতেছে, আমেনা। ঘরে থাকিস না। উঁচায় চল।”

আব্বা তখনো দাঁড়িয়ে। দাদি ঘুরে তাকালেন তাঁর দিকে। এই প্রথম দেখলাম, আমার শান্ত দাদির চোখে আগুন।

“গরু থাক। ঘর থাক। আমি একবার দরজা খুলি নাই। দ্বিতীয়বার কথা না শুইনা থাকুম না।”

আমরা বের হলাম। মিতুকে আমার পিঠে বেঁধে, আম্মা দাদির হাত ধরে, আব্বা সবার পেছনে। ছেলেটা হাঁটছিল সবার আগে। বাতাসে আমরা কাত হয়ে যাচ্ছিলাম, বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে লাগছিল পাথরকুচির মতো। কিন্তু ছেলেটা হাঁটছিল সোজা, যেন ঝড় ওকে ছুঁতেই পারছে না। অন্ধকারে কিছু দেখা যায় না, শুধু ওর ভেজা পিঠটা সামান্য আলো ছড়াচ্ছিল, ঝিনুকের খোলের ভেতরের মতো ফ্যাকাশে।

শেল্টারের সিঁড়িতে পা দিতেই পেছনে একটা শব্দ শুনলাম। গর্জন না—একটা দীর্ঘ, ভারী নিঃশ্বাস। সমুদ্র যেন ফুঁ দিল।

দাদি সারারাত শেল্টারের জানালার পাশে বসে ছিলেন, বাইরে তাকিয়ে। একবার শুনলাম, ফিসফিস করে বলছেন, “এইবার খুলছি, ভাই। এইবার খুলছি।” ভোরের দিকে তাঁর মাথা আমার কাঁধে ঢলে পড়ল। আম্মা বললেন, এত বছরে এই প্রথম তিনি দাদিকে ঝড়ের রাতে ঘুমাতে দেখলেন।

ভোরে ফিরে দেখি, আমাদের বাড়ি যেখানে ছিল, সেখানে কাদা আর দুমড়ানো টিন। গরু দুটো পাওয়া যায়নি।

ছেলেটাকেও শেল্টারে কেউ দেখেনি। আমরা যখন সিঁড়িতে উঠছিলাম, ও ওঠেনি। নিচে দাঁড়িয়ে ছিল, বৃষ্টির ভেতর, যতক্ষণ না দাদি শেষ ধাপে পা রাখলেন।

শেল্টারে বসে শুনলাম, আশপাশের আরও কয়েকটা পরিবার বলাবলি করছে—রাতে এক ভেজা ছেলে এসে তাদের দরজায়ও কড়া নেড়েছিল। যারা খুলেছিল, তারা এখানে।

যারা খোলেনি, তাদের কয়েকজনকে সকালে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এখন আমি ঢাকায় থাকি। ঝড়ের সিগনাল দিলে দাদিকে ফোন করি না। জানি, তিনি ঘুমাচ্ছেন না। নতুন ঘরের দরজার পাশে পিঁড়ি পেতে বসে আছেন, খিল খোলা, কান পেতে।

অপেক্ষা করছেন, কখন আবার কড়া নড়বে।

১ বার পড়া হয়েছে · প্রকাশ ৩ অক্টোবর ২০২৬

এরপর কী পড়বেন

সব দেখুন
রহস্য

পদ্মার চরের অচেনা লোক

বানের পানি নামার পর চরের ঘাটে এসে বসে এক অচেনা লোক। সে গ্রামের সবার গোপন কথা জানে, আর জিজ্ঞেস করলে বলে দেয় কার মৃত্যু কোন দিন।

অঅধীর সেন
  • ৫ মিনিট
  • ১ বার পড়া হয়েছে

৪ অক্টোবর ২০২৬

পরিত্যক্ত বাড়ি

রূপমহল হলের শেষ শো

তেত্রিশ বছর ধরে তালাবন্ধ মফস্বলের সিনেমা হল। মাঝরাতে নিজে নিজে চালু হয় পোড়া প্রজেক্টর, আর পর্দায় ভেসে ওঠা পুরনো দিনের দর্শকদের ভিড়ে একটা চেনা মুখ।

নিনিশাচর রায়হান
  • ৫ মিনিট
  • ০ বার পড়া হয়েছে

২ অক্টোবর ২০২৬

ভূতের গল্প

শাঁকচুন্নির শাঁখা

শ্রাবণের এক বৃষ্টির রাতে বাঁশবাগানের পুকুরঘাট থেকে ফিরল নতুন বউ মালতী—হাতে শাঁখা নেই। তারপর থেকে অমল বলে, বউ যেন আর আগের মানুষ নেই। আমি তো সব দেখি, সব বুঝি।

শ্যাশ্যামল দত্ত
  • ৫ মিনিট
  • ০ বার পড়া হয়েছে

১ অক্টোবর ২০২৬