মূল লেখায় যান

ছাদের ঘুড়ি

সাকরাইনের রাতে পুরান ঢাকার আকাশ যখন আতশবাজিতে লাল, আবির দেখল পাশের তালাবন্ধ বাড়ির ছাদ থেকে একটা ঘুড়ি উড়ছে। ঘুড়িটার কোনো সুতো নেই। বিশ বছর আগে ওই ছাদ থেকেই একটা ছেলে পড়ে গিয়েছিল।

ততমসী আফরোজ@tamosi
  • ৫ মিনিট
  • ০ বার পড়া হয়েছে
ছাদের ঘুড়ি

সাকরাইনের রাত

পৌষের শেষ দিন। লক্ষ্মীবাজারের সরু গলির দুই পাশে গায়ে গা লাগানো পুরোনো বাড়ি, আর সব বাড়ির ছাদে মানুষ। সকাল থেকে আকাশ ভরে আছে রঙিন ঘুড়িতে। চোখদার, পঙ্খীরাজ, মালাদার, চাঁদিয়াল। চারদিক থেকে চিৎকার, “ভোকাট্টা!” মাইকে গান বাজছে, ছাদে ছাদে পিঠা আর বাকরখানির গন্ধ।

সন্ধ্যা নামতেই শুরু হলো আতশবাজি আর মুখে কেরোসিন নিয়ে আগুন ছোড়ার খেলা। আকাশ লাল হয়ে উঠল।

আমার বয়স তখন এগারো। সারাদিন নাটাই হাতে ছাদে ছিলাম, সাতটা ঘুড়ি কেটেছি, দুটো খুইয়েছি। রাত দশটার দিকে উৎসব থিতিয়ে এলে আমি ছাদের কোণে বসে আমার মাঞ্জা দেওয়া সুতো গুটাচ্ছিলাম।

তখনই চোখে পড়ল।

আমাদের বাড়ির ঠিক পাশে একটা পুরোনো দোতলা বাড়ি। লাল ইটের, জানালায় কাঠের খড়খড়ি, সদর দরজায় মরচে ধরা তালা। আমার জন্মের আগে থেকেই বাড়িটা খালি। ছাদের কার্নিশ ভেঙে ঝুলে আছে, ফাটলে অশ্বত্থের চারা গজিয়েছে।

সেই ছাদের ঠিক মাঝখান থেকে, অন্ধকারে, একটা ঘুড়ি উড়ছে।

লাল-কালো একটা চোখদার ঘুড়ি। পুরোনো ধাঁচের, এখন যেমন বানায় তার চেয়ে একটু বড়। বাতাস তখন বেশ জোরে বইছিল, অথচ ঘুড়িটা নড়ছিল না। একদম স্থির, যেন আকাশে কেউ পেরেক দিয়ে গেঁথে দিয়েছে।

আমি চোখ সরু করে সুতো খুঁজলাম। ঘুড়ির নিচ থেকে কোনো সুতো নামেনি। ছাদে কেউ নেই।


দাদির নিষেধ

পরদিন সকালে দাদিকে বললাম। দাদি পান সাজছিলেন, হাত থেমে গেল।

“ওই ছাদের দিকে তাকাইবি না,” খুব শান্ত গলায় বললেন।

অনেক জোরাজুরির পর দাদি গল্পটা বললেন। বিশ-বাইশ বছর আগে ওই বাড়িতে থাকত সাহাদের পরিবার। তাদের ছোট ছেলে মন্টু, আট-নয় বছর বয়স, ছিল পাড়ার সবচেয়ে বড় ঘুড়িবাজ। এক সাকরাইনে সন্ধ্যায় তার প্রিয় লাল-কালো চোখদার ঘুড়িটা কাটা পড়ে। কাটা সুতো ধরতে সে দৌড়ে গিয়েছিল ছাদের কিনারে। কার্নিশটা তখনই ভেঙে পড়ে।

“ঘুড়িটা আর কেউ খুঁইজা পায় নাই,” দাদি বললেন। “সাহারা পরের বছর বাড়ি তালা দিয়া ইন্ডিয়া চইলা যায়। আর ফিরে নাই।”


প্যাঁচ

পরের দুই রাত ঘুড়িটা আবার এল। রাত দশটার পর, যখন সব ছাদ ফাঁকা। প্রতিবার একটু একটু কাছে। প্রথম রাতে ছিল পাশের ছাদের মাঝখানে। দ্বিতীয় রাতে একেবারে কিনারে, যেখানে কার্নিশ ভাঙা। দুই ছাদের মাঝখানে শুধু একটা সরু গলি।

তৃতীয় রাতে আমি আর পারলাম না। এগারো বছরের ছেলের কাছে একটা না-কাটা ঘুড়ি মানে অপমান। দাদি তখন নিচে এশার নামাজে।

আমি আমার সবচেয়ে ভালো ঘুড়িটা উড়ালাম, নীল পঙ্খীরাজ। সুতোয় তিনবার মাঞ্জা দেওয়া, কাচের গুঁড়ো আর সাবুদানার আঠা মেশানো। ঘুড়িটা তুলে নিয়ে গেলাম লাল-কালো ঘুড়িটার ঠিক পাশে। তারপর টান দিলাম।

সুতোয় সুতো লাগল। অথচ ওখানে তো কোনো সুতো থাকার কথা নয়।

হঠাৎ আমার নাটাই হাত থেকে টেনে নিতে চাইল কেউ। প্রবল টান। আমি দুই হাতে নাটাই চেপে ধরলাম। সুতো সরসর করে খুলে যাচ্ছে, হাতের তালু কেটে যাচ্ছে মাঞ্জায়। আর টানটা আমাকে নিয়ে যাচ্ছে ছাদের কিনারের দিকে। এক পা। আরেক পা।

সেই টানে কোনো রাগ ছিল না। খেলার টান। যেমন করে কোনো বাচ্চা হাত ধরে টেনে বলে, চল না, চল।

আমার পেট ঠেকে গেল রেলিংয়ে। নিচে গলির অন্ধকার।

পেছন থেকে দাদি এসে আমাকে জাপটে ধরলেন। এক হাতে আমার কোমর, অন্য হাতে দাঁত দিয়ে সুতোটা ছিঁড়ে দিলেন। আমরা দুজন ছাদের মেঝেতে আছড়ে পড়লাম।

আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি, দুটো ঘুড়িই নেই।


মরচে ধরা নাটাই

সকালে ছাদে উঠে দেখলাম, আমার নাটাইটা খালি। কয়েকশো গজ সুতো, পুরোটা নেই।

পাশের বাড়ির ছাদে তাকালাম। ভাঙা কার্নিশের পাশে, শ্যাওলা ধরা মেঝেতে, পড়ে আছে একটা কাঠের নাটাই। পুরোনো, কালচে, হাতল মরচে ধরা। আর সেই নাটাইয়ে খুব যত্ন করে, পরিপাটি করে প্যাঁচানো আমার সুতো। কাচের গুঁড়ো রোদে চিকচিক করছে। পাশে ভাঁজ করে রাখা আমার নীল পঙ্খীরাজ।

নাটাইয়ের হাতলে ছুরি দিয়ে খোদাই করা একটা অক্ষর। ম।

দুপুরে ছোট চাচা মই লাগিয়ে, গলির ওপর তক্তা ফেলে পাশের ছাদে গেলেন। ফিরলেন শুধু আমার নীল ঘুড়িটা হাতে নিয়ে। নাটাইটা আনেননি। বললেন, তুলতে গিয়েছিলেন, কিন্তু হাতল ধরতেই মনে হয়েছিল ওপাশ থেকে কেউ খুব জোরে ধরে আছে, ছাড়বে না। ছোট চাচার মুখ তখন কাগজের মতো সাদা।

দাদি ঘুড়িটা নিয়ে উঠানের চুলার পাশে গেলেন। আমার হাতে দেশলাই দিয়ে বললেন, “নিজের হাতে পোড়া। তোর জিনিস ওর কাছে থাকলে ও তোরে ভুলব না।” আমি কাঁদতে কাঁদতে আগুন দিলাম। কাগজটা পুড়ল খুব ধীরে, নীল শিখায়, আর পোড়ার সময় একটা অদ্ভুত গন্ধ বেরোল, কেরোসিন আর ভেজা মাটির।

দাদি সেদিনই মিলাদ পড়ালেন। ওই বাড়ির ছাদের দিকের জানালাটা পাকাপাকি বন্ধ করে দেওয়া হলো।

এখন আমার বয়স বত্রিশ। লক্ষ্মীবাজারের সেই বাড়িতেই থাকি। পাশের বাড়িটা এখনো খালি, এখনো তালাবন্ধ।

গত সাকরাইনে রাতে আমার সাত বছরের ভাতিজা রিফাত ছাদ থেকে দৌড়ে নেমে এল। চোখ উত্তেজনায় চকচক করছে।

“চাচ্চু, পাশের ছাদে দুইটা ঘুড়ি উড়তেছে! একটা লাল-কালো, একটা নীল। দুইটারই সুতা নাই। আর ওরা আমারে হাত নাইড়া ডাকতেছে।”

আমি ওকে বুকে চেপে ধরলাম।

নীল পঙ্খীরাজ। আমার হাতে বানানো।

অথচ সেই ঘুড়িটা আমি নিজের হাতে, একুশ বছর আগে, দাদির সামনে পুড়িয়ে ফেলেছিলাম।

রিফাতকে কোলে নিয়ে নিচে নামতে নামতে ও আমার কানে ফিসফিস করে আরেকটা কথা বলল। পাশের ছাদের ভাঙা কার্নিশের ধারে একটা পুরোনো নাটাই পড়ে আছে। বিকেলে ও নিজের চোখে দেখেছে।

নাটাইটায় নতুন সুতো প্যাঁচানো। লাল সুতো। ওর নিজের ঘুড়ির, যেটা দুপুরে কাটা পড়ে হারিয়ে গিয়েছিল।

০ বার পড়া হয়েছে · প্রকাশ ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এরপর কী পড়বেন

সব দেখুন
অলৌকিক

ঝড়ের রাতের অতিথি

দশ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের রাতে চরফ্যাশনের এক ঘরের দরজায় কড়া নাড়ল ভেজা এক কিশোর। সবাই দ্বিধায়, শুধু দাদি ছুটে গিয়ে খিল খুললেন—কারণ এই মুখ তিনি চেনেন, বহু বছর আগের এক ঝড়ের রাত থেকে।

অঅধীর সেন
  • ৫ মিনিট
  • ১ বার পড়া হয়েছে

৩ অক্টোবর ২০২৬

পরিত্যক্ত বাড়ি

রূপমহল হলের শেষ শো

তেত্রিশ বছর ধরে তালাবন্ধ মফস্বলের সিনেমা হল। মাঝরাতে নিজে নিজে চালু হয় পোড়া প্রজেক্টর, আর পর্দায় ভেসে ওঠা পুরনো দিনের দর্শকদের ভিড়ে একটা চেনা মুখ।

নিনিশাচর রায়হান
  • ৫ মিনিট
  • ০ বার পড়া হয়েছে

২ অক্টোবর ২০২৬

ভূতের গল্প

শাঁকচুন্নির শাঁখা

শ্রাবণের এক বৃষ্টির রাতে বাঁশবাগানের পুকুরঘাট থেকে ফিরল নতুন বউ মালতী—হাতে শাঁখা নেই। তারপর থেকে অমল বলে, বউ যেন আর আগের মানুষ নেই। আমি তো সব দেখি, সব বুঝি।

শ্যাশ্যামল দত্ত
  • ৫ মিনিট
  • ০ বার পড়া হয়েছে

১ অক্টোবর ২০২৬