বনবিবির দোহাই
সুন্দরবনে মধু কাটতে যাওয়া সাতজন মৌয়ালের মধ্যে একজনই বনবিবির থানে মাথা নোয়ায়নি। সেই রাত থেকে খালের পাড় ধরে নৌকার সঙ্গে সঙ্গে হাঁটছে কিছু একটা, আর বাওয়ালি বলছেন, কেউ বনের নিয়ম ভেঙেছে।
- ৫ মিনিট
- ০ বার পড়া হয়েছে
থানে মাথা নোয়ানো
চৈত্রের শেষ। শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী ঘাট থেকে আমাদের নৌকা ছাড়ল ভোরবেলা। সাতজন মৌয়াল, এক মাসের চাল-ডাল, খাবার পানির ড্রাম, আর বন বিভাগের পাস।
আমি হারুন। বয়স তখন উনিশ, দ্বিতীয়বার মধুর মৌসুমে যাচ্ছি। দলের সবচেয়ে বয়স্ক আজিবর চাচা, আমাদের বাওয়ালি। সত্তরের কাছাকাছি বয়স, সাদা দাড়ি, চোখ দুটো সবসময় আধবোজা, যেন বনের ভেতরের কোনো শব্দ শোনার চেষ্টা করছেন। লোকে বলে, তিনি বন বাঁধতে জানেন। মন্ত্র পড়ে চারপাশে এমন এক সীমানা টেনে দেন, যা পার হয়ে কেউ ক্ষতি করতে পারে না।
দলে নতুন এসেছিল ফারুক, আমার চাচাতো ভাই। খুলনা শহরে কয়েক বছর গার্মেন্টসে কাজ করে ফিরেছে, হাতে স্মার্টফোন, মুখে শহুরে কথা।
নৌকা ছাড়ার আগে ঘাটের পাশে বনবিবির থানে আমরা সবাই গিয়ে দাঁড়ালাম। ছোট্ট মাটির ঘর, ভেতরে রঙিন মূর্তি, পাশে বাঘের পিঠে দক্ষিণ রায়। আজিবর চাচা বাতাসা আর মোমবাতি দিলেন, আমরা সবাই মাথা নুইয়ে দোয়া চাইলাম।
ফারুক দাঁড়িয়ে রইল দূরে, সিগারেট হাতে।
“এইসব গল্প দিয়া বাঘ ঠেকে না, চাচা,” সে হাসল। “বাঘ ঠেকে টর্চে আর ঢাকঢোলের শব্দে। বনবিবি, দক্ষিণ রায়, সব দাদি-নানির কিচ্ছা।”
আজিবর চাচা কিছু বললেন না। শুধু অনেকক্ষণ ফারুকের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
পুরো চাক
প্রথম চার দিন ভালোই কাটল। চাকের পর চাক। গোলপাতা আর হেঁতালের ধোঁয়ায় মৌমাছি সরিয়ে আমরা মধু কাটতাম। আজিবর চাচার একটা কড়া নিয়ম ছিল: চাকের যে অংশে মধু, শুধু সেটুকু কাটবে। যে অংশে বাচ্চা আছে, সেটা গাছে রেখে আসবে। মৌমাছি যেন আবার ফিরতে পারে।
“বন আমাগো খাওয়ায়, আমরাও বনরে কিছু রাইখা আসি,” চাচা বলতেন। “এইটাই বনবিবির নিয়ম।”
পঞ্চম দিন দুপুরে একটা গরান গাছে বিশাল এক চাক পাওয়া গেল। ফারুক সবার আগে উঠে গেল। নামল পুরো চাকটা ঝাঁকায় নিয়ে। মধু, মোম, বাচ্চা, সব।
আজিবর চাচার মুখ ছাইয়ের মতো হয়ে গেল। “এইটা কী করলি তুই?”
“দুই কেজি বেশি হইব, চাচা। এত হিসাব করলে চলে?”
সেদিন বিকেলে চাচা কারও সঙ্গে কথা বললেন না।
পাড়ের পায়ের শব্দ
রাতে আমরা নৌকা বাঁধলাম একটা সরু খালের মাঝখানে, দুই পাড় থেকে সমান দূরে। এটাই নিয়ম। আজিবর চাচা নৌকার গলুইয়ে বসে বন বাঁধলেন। বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়লেন, মুঠো থেকে চারদিকে কী যেন ছিটালেন। তারপর বললেন, “আইজ রাইতে কেউ নৌকা থিকা নামবি না। কেউ ডাকলেও না।”
মাঝরাতে ঘুম ভাঙল একটা গন্ধে।
ঝাঁঝালো, বোটকা একটা গন্ধ, পচা মাছ আর ভেজা পশমের মতো। যে একবার এই গন্ধ পেয়েছে, সে জীবনে ভোলে না।
জোয়ার নামছিল। নৌকা খুব আস্তে ভাটার টানে সরছে। আর ডান পাড়ে, কেওড়া আর হেঁতালের ঝোপের ভেতর দিয়ে, কিছু একটা হাঁটছে।
ছপ। ছপ। ছপ।
কাদায় ভারী পা পড়ার শব্দ। নৌকা যতটুকু সরছে, শব্দটাও ঠিক ততটুকু সরছে। নৌকার সঙ্গে সঙ্গে।
নৌকার ছইয়ের নিচে সবাই জেগে গেছে, কেউ কথা বলছে না। মোতালেব ভাই দুই হাতে বইঠা আঁকড়ে ধরে বসে আছেন। ফারুক শুয়ে ছিল একেবারে কিনারে, চাদর মুড়ি দিয়ে। আমি স্পষ্ট দেখলাম, চাদরের নিচে ওর শরীরটা থরথর করে কাঁপছে। শহুরে সাহসটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।
“চাচা,” আমি ফিসফিস করে বললাম, “ওইটা কি...”
“নাম লইস না,” চাচা আরও নিচু গলায় বললেন। “এই বনে ওর নাম লইলে ও মনে করে ডাকছস।”
টর্চ জ্বালাতে গেলাম, আজিবর চাচা আমার হাত চেপে ধরলেন। অন্ধকারে তাঁর ঠোঁট নড়ছিল। পাড়ের ঝোপের ফাঁকে একবার দুটো সবুজাভ আলো জ্বলে উঠল, মাটি থেকে অনেকটা উঁচুতে, তারপর নিভে গেল।
ভোর হওয়ার আগে গন্ধটা মিলিয়ে গেল। কিন্তু সকালে দেখা গেল, ফারুক নৌকায় নেই।
বৃত্ত
সবাই ধরে নিয়েছিল, শেষ। এই বনে রাতে কেউ নিখোঁজ হলে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না।
তবু আমরা খুঁজলাম। ঢাক পিটিয়ে, টিন বাজিয়ে, চিৎকার করে। দুপুরের দিকে খালের বাঁক ঘুরতেই দেখলাম, একটা উঁচু কাদার চরে ফারুক বসে আছে। হাঁটু বুকে চেপে। গায়ে একটা আঁচড়ও নেই। কোলে ধরে আছে সেই পুরো চাকের ঝাঁকাটা।
নৌকায় তুলতেই সে শিশুর মতো কাঁদতে লাগল।
শেষ রাতে প্রকৃতির ডাকে সে চুপিচুপি পাড়ে নেমেছিল, আমাদের কাউকে না জাগিয়ে। ফেরার পথে আর নৌকা খুঁজে পায়নি। চারপাশে শুধু সেই গন্ধ আর ঝোপ ভাঙার শব্দ। তখন অন্ধকারে কেউ একজন তার হাত ধরে।
একজন বৃদ্ধা। ছোটখাটো, গায়ে সাদা শাড়ি, হাত দুটো খুব ঠান্ডা আর খুব নরম। কোনো কথা না বলে তিনি তাকে সারারাত বনের ভেতর দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে গেছেন। আর পুরোটা পথ তাদের পেছনে, খুব কাছে, একটা বিশাল কিছু হেঁটেছে। তার গরম নিশ্বাস ফারুক ঘাড়ে টের পেয়েছে।
ভোরে বৃদ্ধা তাকে ওই চরে বসিয়ে দিয়ে শুধু একটা কথা বলেছেন।
সেদিনই আমরা সেই গরান গাছে ফিরে গেলাম। ফারুক নিজের হাতে চাকের বাচ্চাওয়ালা অংশটা গাছের ডালে বেঁধে দিয়ে এল। আজিবর চাচা পাশে দাঁড়িয়ে মন্ত্র পড়লেন।
ফেরার আগে চাচা আমাকে আলাদা করে সেই চরে নিয়ে গেলেন, যেখানে ফারুক বসে ছিল। কাদার ওপর আঙুল দিয়ে দেখালেন।
চরটার চারপাশে, একটা নিখুঁত গোল বৃত্ত জুড়ে, বাঘের পায়ের ছাপ। গভীর, থালার মতো বড়। সারারাত ধরে সে ঘুরেছে, বারবার, একই পথে। কিন্তু একটা ছাপও বৃত্তের ভেতরে ঢোকেনি।
আর বৃত্তের ঠিক ভেতরে, ফারুকের বসার জায়গার পাশে, কাদায় আঁকা আছে খুব ছোট্ট একজোড়া খালি পায়ের ছাপ। মেয়েমানুষের পা।
ছাপগুলো কোথাও থেকে আসেনি। কোথাও যায়ওনি।
ফারুক এখনো প্রতি বছর মধুর মৌসুমে যায়। আর নৌকায় ওঠার আগে সবার আগে গিয়ে দাঁড়ায় বুড়িগোয়ালিনীর সেই ছোট্ট থানে। অনেকক্ষণ মাথা নুইয়ে থাকে।