মৃত নম্বরের মিসড কল
সাত মাস আগে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে নীলার ছোট ভাই, তার সিমটাও বন্ধ। তবু প্রতি রাতে ঠিক তিনটা বারোয় সেই নম্বর থেকে মিসড কল আসে। তারপর আসতে শুরু করে মেসেজ, যা আগেভাগেই সব জানে।
- ৫ মিনিট
- ০ বার পড়া হয়েছে
তিনটা বারো
প্রথম মিসড কলটা এসেছিল এক মঙ্গলবার রাতে।
মিরপুর দশের ছোট ফ্ল্যাটে আমি আর মা থাকি। তন্ময় চলে যাওয়ার পর থেকে আমার ঘুম পাতলা। সামান্য শব্দেই ভেঙে যায়। সেদিন ফোনের ভাইব্রেশনে চোখ খুলে দেখি স্ক্রিনে জ্বলছে একটা নাম।
তনু।
আমার হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। স্ক্রিনের কোণে সময় লেখা: রাত ৩:১২।
তন্ময় আমার চার বছরের ছোট। গত ফাল্গুনে বন্ধুদের সঙ্গে মোটরসাইকেলে মাওয়া গিয়েছিল ইলিশ খেতে। ফেরার পথে এক্সপ্রেসওয়েতে পেছন থেকে একটা কাভার্ড ভ্যান। হাসপাতালের কাগজে মৃত্যুর সময় লেখা ছিল রাত তিনটা বারো।
চল্লিশা পার হওয়ার পর মা নিজে গিয়ে ওর সিমটা বন্ধ করিয়ে এসেছিলেন। বলেছিলেন, নম্বরটা চালু থাকলে মনে হয় ও কোথাও আছে, ফোন দিলেই ধরবে।
আমি কাঁপা আঙুলে কলব্যাক করলাম।
“আপনার ডায়ালকৃত নম্বরটি এই মুহূর্তে বন্ধ আছে।”
মেসেজ
এরপর প্রতি রাতে। ঠিক তিনটা বারোয়। একবার রিং, তারপর কেটে যায়।
আমি মাকে কিছু বলিনি। অপারেটরের কাস্টমার কেয়ারে ফোন দিয়েছিলাম। মেয়েটি অনেকক্ষণ খুঁজে বলল, “ম্যাম, নম্বরটি পাঁচ মাস ধরে নিষ্ক্রিয়। এখান থেকে কোনো কল যাওয়া সম্ভব না।” তারপর একটু থেমে, গলা নামিয়ে বলল, “আপনি কি ঠিক আছেন?”
আমি ফোনটা উল্টে রেখে শুয়ে থাকতাম। তবু তিনটা বারো বাজার ঠিক আগে ঘুম ভেঙে যেত, যেন ঘরের ভেতর কেউ আস্তে করে আমার নাম ধরে ডেকেছে। জানালার বাইরে মিরপুরের রাস্তা তখন একদম ফাঁকা, শুধু দূরে কোথাও একটা কুকুর একটানা কাঁদত।
দ্বিতীয় সপ্তাহে কলের বদলে এল একটা মেসেজ।
আপু, কাল বিকালে ছাদে কাপড় তুলতে যাস না। মা গেলেও যেতে দিস না।
বানানটা তন্ময়ের মতো। ও সবসময় “বিকেল” না লিখে “বিকাল” লিখত, আর আমাকে ডাকত “আপু”, কখনো “আপা” না।
পরদিন বিকেলে হঠাৎ কালবৈশাখী। আমি মাকে জোর করে ঘরে আটকে রাখলাম। মা বিরক্ত হলেন, কাপড়গুলো ভিজে যাচ্ছে। সন্ধ্যায় দারোয়ান এসে খবর দিল, ঝড়ে ছাদের পানির ট্যাংকের পাশের পুরোনো রেলিংটা ভেঙে পড়েছে, ঠিক যেখানে আমাদের কাপড় শুকাতে দেওয়ার দড়িটা বাঁধা।
সেরাতে তিনটা বারোয় ফোন বাজলে আমি কাঁদতে কাঁদতে ফিসফিস করে বললাম, “থ্যাংক ইউ, তনু।”
লাইন কেটে গেল।
পাহারা
এরপর আরও কয়েকটা মেসেজ এল।
একবার লিখল, মায়ের প্রেশারের ওষুধের পাতা বদলে গেছে, দেখে নিতে। আমি দেখলাম, ফার্মেসির ছেলেটা ভুল করে অন্য মিলিগ্রামের ওষুধ দিয়েছে। আরেকবার লিখল, অফিস থেকে ফেরার সময় যেন পল্লবীর গলিটা দিয়ে না আসি। পরদিন শুনলাম, ওই গলিতে সন্ধ্যায় এক মেয়ের ব্যাগ টেনে নিয়ে গেছে মোটরসাইকেলে দুজন।
আমি ধীরে ধীরে ভয় পাওয়া ছেড়ে দিলাম। বরং রাত তিনটা বাজলে জেগে বসে থাকতাম। ফোন বাজার অপেক্ষায়। মনে হতো, তন্ময় কোথাও যায়নি। দূরে কোথাও বসে আমাদের পাহারা দিচ্ছে, ঠিক যেমন ছোটবেলায় স্কুল থেকে ফেরার পথে আমার আগে আগে হাঁটত, রাস্তার কুকুর তাড়াত।
তারপর এল শেষ মেসেজটা।
দরজার ওপাশে
বৃহস্পতিবার রাতে আমি ঘুমাইনি। মায়ের ঘরের দরজা বাইরে থেকে আলতো করে টেনে দিয়ে ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে রইলাম। হাতে ফোন। বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি।
তিনটা দশ। তিনটা এগারো।
তিনটা বারো।
দরজায় তিনটা টোকা। আস্তে, থেমে থেমে। ঠিক যেভাবে তন্ময় রাত করে ফিরে টোকা দিত, যাতে মা জেগে না যান।
“আপু। আপু, দরজাটা খোল।”
আমার সারা শরীর জমে গেল। কণ্ঠটা তন্ময়ের। একটুও ভুল নেই। সেই সামান্য ভাঙা গলা, শেষ শব্দটা টেনে বলার অভ্যাস।
“আপু, আমি তনু। ঠান্ডা লাগতেছে রে। একটু খোল।”
দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকছিল একটা গন্ধ। ভেজা মাটির গন্ধ। আর আগরবাতির।
আমি দুই হাতে কান চেপে ধরলাম। মনে মনে আওড়াতে লাগলাম, ওটা তুমি না, ওটা তুমি না।
“আপু, মনে আছে, ক্লাস ফাইভে তোর জ্যামিতি বক্সটা আমি হারায়া ফেলছিলাম? তুই আব্বারে বলিস নাই। বলছিলি, আমি হারাইছি। মনে আছে?”
মনে আছে। এ কথা পৃথিবীতে আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ জানত না। আব্বাও না, মা-ও না।
পাশের ঘর থেকে মায়ের ঘুমজড়ানো গলা ভেসে এল, “নীলা, কে রে? তনু আইল নাকি?” আমি উত্তর দিলাম না। মায়ের ঘরের দরজার হাতলটা একবার নড়ে উঠল। আমি উঠে গিয়ে বাইরে থেকে হাতলটা চেপে ধরে রাখলাম। মা ভেতর থেকে টানলেন, আবার টানলেন, তারপর ঘুমের ঘোরে কী যেন বিড়বিড় করতে করতে থেমে গেলেন।
“আপু, তুই আমারে চিনস না? আমি কতদূর থেকে আসছি, জানস?” কণ্ঠটা এবার ভেঙে পড়ল, কান্নায়। “একবার দেখ আমারে। শুধু একবার।”
আমি খুলিনি।
কতক্ষণ এভাবে চলেছিল জানি না। একসময় টোকা থেমে গেল। সিঁড়িতে খুব ধীর, ভারী পায়ের শব্দ নামতে নামতে মিলিয়ে গেল।
শেষ মেসেজ
ভোরে দরজা খুলে দেখি, পাপোশের ওপর থেকে সিঁড়ি পর্যন্ত কাদামাখা খালি পায়ের ছাপ। ভেজা, লালচে মাটি। আমাদের বিল্ডিংয়ের আশেপাশে কোথাও ওরকম মাটি নেই।
এরকম মাটি আছে শুধু এক জায়গায়। মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের পেছনের দিকটায়, যেখানে সাত মাস আগে আমরা তন্ময়কে রেখে এসেছিলাম।
আমি পায়ের ছাপের পাশে বসে পড়লাম। তখনই হাতের ফোনটা কেঁপে উঠল। একটা নতুন মেসেজ। সেই নম্বর থেকে।
আমি মেসেজটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। তারপর আগের মেসেজটার দিকে। “ওটা আমি না।”
দুটোই এসেছে একই নম্বর থেকে। দুটোতেই লেখা “আপু”। দুটোতেই তন্ময়ের সেই চেনা ঢং, চেনা বানান।
কোনটা তন্ময় লিখেছিল, আর কোনটা অন্য কেউ, যে তন্ময়ের নম্বর, তন্ময়ের কণ্ঠ আর তন্ময়ের বানান সব শিখে ফেলেছে?
সেই রাতের পর আর কোনো মিসড কল আসেনি।
তবু আমি এখনো প্রতি রাতে তিনটা বারোয় জেগে উঠি। দরজার দিকে তাকিয়ে বসে থাকি। আর ভাবি, পরেরবার টোকা পড়লে আমি কী করব।