মূল লেখায় যান

লিফটের তেরো তলা

মতিঝিলের বারোতলা অফিস ভবনের লিফটে তেরো নম্বর কোনো বোতাম নেই। তবু এক রাতে ডিসপ্লেতে জ্বলে উঠল “১৩”, আর দরজা খুলে গেল এমন এক করিডরে, যেখানে কেউ আগে থেকেই রাশেদের জন্য অপেক্ষা করছিল।

নিনিশাচর রায়হান@nishachar
  • ৫ মিনিট
  • ০ বার পড়া হয়েছে
লিফটের তেরো তলা

বছর শেষের হিসাব

জুন মাসের শেষ সপ্তাহ। মতিঝিলের নূর ম্যানশনের নয়তলায় আমাদের অফিসে তখন বছর শেষের হিসাব মেলানোর ধুম। আমি রাশেদ, অ্যাকাউন্টস সেকশনের সিনিয়র অফিসার। সেই সপ্তাহে রোজ রাত এগারোটা-বারোটা পর্যন্ত থাকতে হতো।

নূর ম্যানশন পুরোনো বিল্ডিং। নব্বইয়ের দশকে তৈরি, বারোতলা। দেয়ালের রং ফ্যাকাশে হলুদ, সিঁড়ির রেলিংয়ে জং। লিফট একটাই, স্টিলের দরজা, ভেতরে একটা আয়না যেটার পারদ কোণা থেকে খসে পড়েছে।

লিফটের প্যানেলে বোতাম আছে জি থেকে বারো পর্যন্ত। এর বেশি কিছু নেই।

অন্তত আমি তাই জানতাম।

রাতের গার্ড হাশেম চাচা। বয়স ষাটের কাছাকাছি, বিল্ডিংয়ের শুরু থেকেই এখানে আছেন। নিচতলার টুলে বসে রেডিও শোনেন, পান চিবান। আমি বের হওয়ার সময় রোজ বলতেন, “স্যার, লিফটে একলা উঠবেন না রাতে। সিঁড়ি দিয়া নামেন, শরীরও ভালো থাকে।”

আমি হাসতাম। নয়তলা থেকে সিঁড়ি ভেঙে নামা কোনো রসিকতা নয়।


উপরের দিকে

বৃহস্পতিবার রাত এগারোটা চল্লিশ। পুরো ফ্লোরে আমি একা। এসির শব্দ বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগে, শুধু টিউবলাইটের মৃদু গুঞ্জন। ফাইল গুছিয়ে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে লিফটের সামনে দাঁড়ালাম। বোতাম চাপলাম।

লিফট এল। ভেতরে ঢুকে “জি” চাপলাম। দরজা বন্ধ হলো।

লিফট নড়ে উঠল। কিন্তু নিচের দিকে নয়।

পেটের ভেতর সেই চেনা হালকা টান, যেটা লিফট উপরে উঠলে লাগে। ডিসপ্লের লাল সংখ্যা বদলাতে লাগল: ১০, ১১, ১২।

আমি ভাবলাম, কেউ হয়তো ছাদে যাওয়ার জন্য বারোতলায় বোতাম চেপেছে। কিন্তু বারোতেও থামল না।

ডিসপ্লেতে জ্বলে উঠল: ১৩।

লিফট থামল। একটা ভোঁতা ঘণ্টির শব্দ। দরজা ধীরে ধীরে সরে গেল।

বাইরে একটা করিডর। হুবহু আমাদের নয়তলার মতো। একই রকম ধূসর মেঝে, একই রকম কাচের পার্টিশন, একই কোণে রাখা পানির ফিল্টার। শুধু আলো নেই। কোথাও একটা টিউবলাইট থেমে থেমে জ্বলছে, নিভছে।

আর গন্ধ। ভেজা সিমেন্টের গন্ধ, যেন ঢালাই এখনো শুকায়নি। তার সঙ্গে মিশে আছে পুরোনো কাগজ পচার একটা ভারী গন্ধ।

পার্টিশনের ওপাশে ডেস্ক। প্রতিটা ডেস্কে কেউ না কেউ বসে আছে। সবাই দেয়ালের দিকে মুখ করে। কেউ নড়ছে না। কারও মাথা সামান্য নিচু, যেন খুব মন দিয়ে কিছু পড়ছে।

করিডরের শেষ মাথায় একটা ডেস্ক খালি। চেয়ারটা টেনে রাখা, যেন কেউ এইমাত্র উঠে গেছে, কিংবা কারও বসার অপেক্ষায়।

ডেস্কের ওপর একটা নেমপ্লেট। অন্ধকারেও আমি পড়তে পারলাম।

মো. রাশেদুল ইসলাম, সিনিয়র অফিসার (অ্যাকাউন্টস)

কণ্ঠটা কোথা থেকে এল বুঝলাম না। মনে হলো একসঙ্গে সবগুলো ডেস্ক থেকে, খুব নিচু স্বরে।

তারপর সবচেয়ে কাছের চেয়ারটা ক্যাঁচ করে ঘুরতে শুরু করল।

আমি আর দেখিনি। “ডোর ক্লোজ” বোতামটা পাগলের মতো চাপতে থাকলাম। দরজা বন্ধ হতে যেন অনন্তকাল লাগল। শেষ মুহূর্তে ফাঁক দিয়ে দেখলাম, চেয়ারটা প্রায় আমার দিকে ঘুরে গেছে। তার ওপর যে বসে আছে, তার কাঁধ, তার শার্ট, শার্টের পকেটে গোঁজা কলম, সব আমার খুব চেনা।


হাশেম চাচার কথা

লিফট নামল। ১২, ১১, ১০, ৯... জি। দরজা খুলতেই আমি প্রায় হুমড়ি খেয়ে বেরিয়ে এলাম।

হাশেম চাচা টুল থেকে উঠে দাঁড়ালেন। আমার মুখ দেখে তাঁর মুখের পান চিবানো থেমে গেল।

“তেরোয় থামছিল?” তিনি নিচু গলায় জিজ্ঞেস করলেন।

আমি কিছু বলতে পারলাম না। শুধু মাথা নাড়লাম।

তিনি আমাকে টুলে বসালেন, ফ্লাস্ক থেকে চা ঢেলে দিলেন। তারপর বললেন, এই বিল্ডিংয়ের নকশা প্রথমে তেরোতলার ছিল। তেরোতলার ছাদ ঢালাইয়ের রাতে শাটারিং ভেঙে পড়ে। ওপরে সাতজন মিস্ত্রি ছিল। মালিক পরে ওই তলা আর তোলেনি, কাগজে-কলমে বিল্ডিং বারোতলাই রয়ে গেল।

“কিন্তু ওরা তো কাজ শেষ করে নাই, স্যার,” চাচা বললেন। “ওরা অহনো তলাটা বানাইতাছে। আর তলা বানাইলে মানুষ লাগে। অফিস লাগে।”


দেয়ালের নম্বর

এরপর কয়েক সপ্তাহ আমি সিঁড়ি ব্যবহার করলাম। সহকর্মীরা হাসাহাসি করল, আমি গায়ে মাখলাম না।

কিন্তু মানুষ ক্লান্ত হয়, অভ্যাসে ফেরে। জুলাইয়ের এক বৃষ্টির সন্ধ্যায়, ব্যাংক থেকে ফিরে, ভিজে চুপচুপে হয়ে আমি আবার লিফটে উঠলাম। “৯” চাপলাম। মনে মনে হাশেম চাচার কথাটা আওড়ালাম।

লিফট থামল। ডিসপ্লেতে ৯। দরজা খুলল।

আমি পা না ফেলে দেয়ালের দিকে তাকালাম। লিফটের ঠিক উল্টো দিকে, ধূসর দেয়ালে বড় করে কালো রঙে লেখা: ৯।

স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বেরিয়ে এলাম। পেছনে লিফটের দরজা বন্ধ হলো, শুনলাম সেটা নিচে নেমে যাচ্ছে।

করিডরে আলো কম। সন্ধ্যায় লোডশেডিং হলে জেনারেটরে অর্ধেক বাতি জ্বলে, তাই কিছু মনে করলাম না। হাঁটতে হাঁটতে নিজের ডেস্কের দিকে এগোলাম।

আমার চেয়ারে কেউ বসে আছে। দেয়ালের দিকে মুখ করে। কি-বোর্ডে খুব আস্তে আঙুল চলছে।

নাকে এসে লাগল ভেজা সিমেন্টের গন্ধ।

আমি ঘুরে লিফটের দিকে দৌড়ালাম। বোতাম চাপলাম, আবার চাপলাম। লিফট আসছে না। আর তখনই চোখ পড়ল দেয়ালের সেই নম্বরটার দিকে।

কালো রঙের ৯। কাছ থেকে দেখলাম, রংটা এখনো ভেজা। নয়ের লেজ বেয়ে একটা সরু কালো ধারা গড়িয়ে নামছে মেঝের দিকে।

কেউ নম্বরটা এইমাত্র লিখেছে।

পেছনে চেয়ার ঘোরার ক্যাঁচ শব্দ হলো।


পাঠকের জন্য

এই লেখাটা আমি কোথা থেকে লিখছি, সেটা জিজ্ঞেস করবেন না। এখানে কাজ অনেক, তলাটা এখনো শেষ হয়নি।

শুধু একটা কথা বলে রাখি। আজ রাতে অফিস থেকে ফেরার সময় লিফটে উঠলে ডিসপ্লে দেখবেন না, বোতামও গুনবেন না। দরজা খুললে দেয়ালের নম্বরটা দেখবেন, ঠিক আছে।

কিন্তু তার আগে একবার আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখবেন, রংটা শুকনো কিনা।

০ বার পড়া হয়েছে · প্রকাশ ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এরপর কী পড়বেন

সব দেখুন
অলৌকিক

ঝড়ের রাতের অতিথি

দশ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের রাতে চরফ্যাশনের এক ঘরের দরজায় কড়া নাড়ল ভেজা এক কিশোর। সবাই দ্বিধায়, শুধু দাদি ছুটে গিয়ে খিল খুললেন—কারণ এই মুখ তিনি চেনেন, বহু বছর আগের এক ঝড়ের রাত থেকে।

অঅধীর সেন
  • ৫ মিনিট
  • ১ বার পড়া হয়েছে

৩ অক্টোবর ২০২৬

পরিত্যক্ত বাড়ি

রূপমহল হলের শেষ শো

তেত্রিশ বছর ধরে তালাবন্ধ মফস্বলের সিনেমা হল। মাঝরাতে নিজে নিজে চালু হয় পোড়া প্রজেক্টর, আর পর্দায় ভেসে ওঠা পুরনো দিনের দর্শকদের ভিড়ে একটা চেনা মুখ।

নিনিশাচর রায়হান
  • ৫ মিনিট
  • ০ বার পড়া হয়েছে

২ অক্টোবর ২০২৬

লোককাহিনি

বেলতলার ব্রহ্মদৈত্য

পোড়ো ভিটার বেলগাছে থাকেন এক জ্ঞানী ব্রহ্মদৈত্য, যিনি পথিককে শুধু ধাঁধা জিজ্ঞেস করেন। কুয়াশার রাতে তেইশ বছরের অভিজ্ঞ এক মাস্টার দুটোর ঠিক উত্তর দিলেন। তৃতীয়টার দিলেন না।

শ্যাশ্যামল দত্ত
  • ৬ মিনিট
  • ০ বার পড়া হয়েছে

৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬