বাড়িওয়ালার তালাবন্ধ ঘর
মিরপুরে নয় হাজার টাকায় তিন রুমের ফ্ল্যাট, শর্ত একটাই: তালাবন্ধ ঘরটা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নয়। কিন্তু রোজ রাত আড়াইটায় ওই ঘরে কে হাঁটে?
- ৫ মিনিট
- ০ বার পড়া হয়েছে
সস্তা ভাড়ার শর্ত
মিরপুর এগারোর এক গলির ভেতর পাঁচতলা বাড়ি। চারতলার ফ্ল্যাটে তিনটা ঘর, ভাড়া মাত্র নয় হাজার। বগুড়া থেকে ঢাকায় এসে বায়িং হাউসে চাকরি পাওয়া এক ব্যাচেলরের কাছে এটা লটারি জেতার মতো।
আমার নাম রিয়াদুল ইসলাম। আগের তিন মাস কাটিয়েছি শেওড়াপাড়ার এক মেসে, ছয়জনের সঙ্গে এক ঘরে, এক বাথরুমের সামনে রোজ সকালে লাইন দিয়ে। তাই দালাল যখন এই ফ্ল্যাটের ভাড়া বলল, আমি প্রথমে ভেবেছিলাম সে ভুল শুনেছে।
বাড়িওয়ালা আজিজুর রহমান থাকেন দোতলায়, একা। সত্তরের কাছাকাছি বয়স, সাদা দাড়ি, চোখে মোটা কাচের চশমা। চুক্তিপত্রে সই করার আগে তিনি আমাকে চারতলায় নিয়ে গেলেন, বারান্দার পাশের তৃতীয় ঘরটার সামনে দাঁড় করালেন। দরজায় একটা বিশাল পিতলের তালা, তার ওপর লাল সুতো পেঁচানো।
“দুইটা ঘর তোমার। এইটা আমার। জিনিসপত্র রাখা আছে।” তিনি থামলেন। “এই ঘর নিয়া কোনো প্রশ্ন করবা না। তালায় হাত দিবা না। রাজি থাকলে সই করো।”
আমি হাসিমুখে সই করলাম। নয় হাজার টাকায় তিন রুমের ফ্ল্যাট, একটা তালাবন্ধ ঘর নিয়ে মাথা ঘামানোর কী আছে।
দরজার ওপাশে
প্রথম শব্দটা শুনলাম দ্বিতীয় সপ্তাহে। রাত তখন আড়াইটা। পাশের ঘর থেকে পায়ের শব্দ। খালি পা, ধীর, ভারী। দেয়ালের এক মাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত গিয়ে থামে, তারপর ফিরে আসে।
আমি ভেবেছিলাম ইঁদুর, কিংবা পাশের বিল্ডিংয়ের কেউ। কিন্তু শব্দটা প্রতি রাতে আসতে লাগল, একই সময়ে। আর কিছুদিন পর খেয়াল করলাম, হাঁটতে হাঁটতে শব্দটা মাঝে মাঝে দরজার ঠিক ওপাশে এসে থামে। অনেকক্ষণ থেমে থাকে। যেন কেউ দরজায় কান পেতে আমার নিঃশ্বাস শুনছে।
এক রাতে আর পারলাম না। মোবাইলের টর্চ জ্বেলে তালার নিচের পুরনো চাবির ফুটোয় চোখ রাখলাম।
ভেতরে অন্ধকার। শুধু টর্চের আলো এক চিলতে গিয়ে পড়েছে উল্টো দিকের দেয়ালে। সেখানে একটা ওষুধ কোম্পানির পুরনো বাংলা ক্যালেন্ডার ঝুলছে। কয়েকটা তারিখ লাল কালিতে কাটা।
ঘরে কেউ নেই। অথচ নাকে এসে লাগল কর্পূর আর পুরনো ঘামে ভেজা কাপড়ের মিশ্র গন্ধ।
ফিরে এসে বিছানায় বসতেই খেয়াল করলাম, আমার ঘাড়ের কাছটা ভেজা আর ঠান্ডা, যেন কেউ খুব কাছ থেকে নিঃশ্বাস ফেলেছে। অথচ ফুটোর ওপাশে কিছুই ছিল না। নাকি ছিল, আমি দেখতে পাইনি?
পরদিন সকালে আবার ফুটোয় চোখ রাখলাম। আজকের তারিখটাও লাল কালিতে কাটা।
আগের ভাড়াটেরা
গলির মুখে মোতালেবের চায়ের দোকান। এক সন্ধ্যায় কথায় কথায় জিজ্ঞেস করলাম, আমার আগে চারতলায় কে থাকত।
মোতালেব কেতলি নামিয়ে আমার দিকে তাকাল। “আপনার আগে? কোনজনের কথা কন? আট বছরে ছয়জন আইছে। সবই আপনার মতো, একলা পোলা।”
“সবাই চলে গেছে?”
“গেছে তো। কেউ যাইতে দেখে নাই, এইটাই কথা। বাড়িওয়ালা কয়, দেশের বাড়ি গেছে গা। মালসামানও নিয়া যায় নাই কেউ।”
সেই রাতে আজিজুর সাহেব নিজেই চারতলায় উঠে এলেন। দরজায় দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় বললেন, “মোতালেবের দোকানে আমার ঘর নিয়া কথা কইছ শুনলাম।” তাঁর চশমার কাচে বাল্বের আলো জ্বলছিল, চোখ দেখা যাচ্ছিল না। “প্রশ্ন করতে মানা করছিলাম, বাবা।”
তিনি চলে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তালাবন্ধ ঘরের ভেতর পায়ের শব্দটা সেই রাতে থামেনি। একবারও না।
পরদিন ভোরে দরজা খুলে দেখি, আমার ঘরের চৌকাঠের সামনে এক জোড়া পুরনো রবারের স্যান্ডেল রাখা। আমার নয়। ধুলোমাখা, গোড়ালির কাছে ক্ষয়ে যাওয়া, যেন কেউ বহু বছর ধরে একই জায়গায় হাঁটাহাঁটি করেছে। আমি সেগুলো সিঁড়ির নিচে ফেলে দিয়ে এলাম। পরের সকালে স্যান্ডেল জোড়া আবার চৌকাঠে।
ক্যালেন্ডার
মাসের শেষে আজিজুর সাহেব চট্টগ্রামে মেয়ের বাসায় গেলেন, তিন দিনের জন্য। দ্বিতীয় দিন দুপুরে আমি মিরপুর দশের ফুটপাত থেকে একজন চাবিওয়ালাকে ডেকে আনলাম। পিতলের তালা খুলতে তার লাগল চার মিনিট। লাল সুতোটা ছিঁড়তে গিয়ে সে একবার আমার দিকে তাকাল, তারপর টাকা না নিয়েই চলে গেল।
দরজা খুলতেই ঠান্ডা বাতাস এসে মুখে লাগল, যেন বহুদিন বন্ধ থাকা কোনো কুয়া।
ঘরটা খালি নয়। এক কোণে স্তূপ করে রাখা ছয়টা ব্যাগ। একটা স্যুটকেস, দুটো ট্রলি, তিনটা পুরনো কাপড়ের ব্যাগ। প্রতিটার হাতলে কাগজের ট্যাগ, তাতে একেকটা নাম। পাশে ছয় জোড়া স্যান্ডেল, পাশাপাশি সাজানো। আর মেঝের ধুলোয় খালি পায়ের ছাপ, গোল হয়ে ঘুরে ঘুরে, অগণিত।
ভরদুপুর, অথচ ঘরটায় আলো ঢুকছিল না ঠিকমতো। জানালার কাচে কেউ পুরু করে খবরের কাগজ সেঁটে দিয়েছে। বাইরে গলিতে রিকশার বেল, ফেরিওয়ালার ডাক, সব শোনা যাচ্ছিল, কিন্তু অনেক দূর থেকে, যেন অন্য কোনো শহরের শব্দ।
আমি ক্যালেন্ডারটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। কাছ থেকে দেখে বুঝলাম, ওটা এক বছরের ক্যালেন্ডার নয়। আট বছরের পাতা একসঙ্গে গাঁথা। আর পাতার কিনারায়, লাল কালিতে, পরপর নাম লেখা।
আজ উনত্রিশে আষাঢ়।
পকেটে মোবাইল বেজে উঠল। আজিজুর সাহেব। তাঁর গলা আশ্চর্য রকম ক্লান্ত।
“খুলছ, না? জানতাম খুলবা। সবাই খোলে।”
“এটা কার ঘর?” আমার গলা দিয়ে শব্দ বেরোচ্ছিল না ঠিকমতো।
অনেকক্ষণ চুপ থেকে তিনি বললেন, “ঘরটা আমার না, বাবা। কোনোদিন আমার আছিল না। আমি শুধু ভাড়া তুলি। ঘরটা যারা থাকে, তাদের।” একটু থেমে বললেন, “আজকা থেইকা তোমার।”
পেছনে, ঘরের দরজাটা আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে গেল।
নতুন ভাড়াটে
নতুন ছেলেটা এসেছে গত সপ্তাহে। নাম তানভীর, সিরাজগঞ্জের ছেলে। আজিজুর সাহেব তাকে ঠিক সেই কথাগুলোই বলেছেন। প্রশ্ন করবা না। তালায় হাত দিবা না।
ছেলেটা রাতে ঘুমাতে পারে না। আমি জানি, কারণ দরজার এপাশে দাঁড়ালে তার নিঃশ্বাস শুনতে পাই।
আমরা সাতজন এখন পালা করে হাঁটি। দেয়ালের এক মাথা থেকে আরেক মাথা। মাঝে মাঝে আমি দরজার কাছে এসে থামি, কান পেতে থাকি।
ক্যালেন্ডারে তার নামটা লেখা হয়ে গেছে। যাওয়ার তারিখটাও।
লাল কালিটা এখন আমার হাতে।