মূল লেখায় যান

মাঝনদীর মাঝি

পূর্ণিমার রাতে মেঘনার মাঝখানে একটা ছইওয়ালা নৌকা ভাসে, বৈঠা নেই, পাল নেই। জেলেরা বলে, ওই নৌকার মাঝিকে যে ডাক দেয়, সে পার হয়ে যায়—কিন্তু কোন পারে, সেটা কেউ জানে না।

শ্যাশ্যামল দত্ত@shyamal
  • ৫ মিনিট
  • ৭.৪ হাজার বার পড়া হয়েছে
  • ৪৫০ জন পছন্দ করেছেন
মাঝনদীর মাঝি

মেঘনার জেলে

চাঁদপুরের দক্ষিণে মেঘনা যেখানে সমুদ্রের মতো চওড়া, যেখানে এক পার থেকে অন্য পার দেখা যায় না, সেখানে ইলিশের মৌসুমে রাতভর জাল ফেলে জেলেরা। কুদ্দুস মাঝি সেই জেলেদের একজন। বাবা জেলে ছিলেন, দাদাও। নদী তার কাছে মায়ের মতো—খেতে দেয়, আবার রাগলে কেড়েও নেয়।

কুদ্দুসের বাবা নদীতে হারিয়েছিলেন, কুদ্দুসের বয়স যখন বারো। এক পূর্ণিমার রাতে জাল ফেলতে গিয়েছিলেন, আর ফেরেননি। নৌকাটা পাওয়া গিয়েছিল তিন দিন পর, ভাটির দিকে, অক্ষত। জাল গোছানো, বৈঠা জায়গামতো, হুঁকাটা পর্যন্ত উল্টায়নি। শুধু মানুষটা নেই।

সঙ্গী জেলেরা ফিসফিস করে বলেছিল, সেই রাতে তারা মাঝনদীতে একটা আলো দেখেছিল। একটা ছইওয়ালা নৌকা, তার গলুইয়ে একটা লণ্ঠন। আর কুদ্দুসের বাবা নাকি চিৎকার করে কাউকে ডেকেছিলেন।

গ্রামের বুড়োরা বলেছিল, "মাঝনদীর মাঝিরে ডাকছে। ডাকলে সে আসে। আর যে ডাকে, তারে পার কইরা দেয়।"

"কোন পারে?" বারো বছরের কুদ্দুস জিজ্ঞেস করেছিল।

কেউ উত্তর দেয়নি।


পূর্ণিমার জাল

ত্রিশ বছর পর, এক ভাদ্র মাসের পূর্ণিমায়, কুদ্দুস তার ছেলে সুমনকে নিয়ে জাল ফেলতে বেরোল। সুমনের বয়স চৌদ্দ, প্রথমবার বাবার সঙ্গে রাতের নদীতে। ছেলেটার চোখে উত্তেজনা, হাতে নতুন বৈঠা।

কুদ্দুস পূর্ণিমায় সাধারণত নদীতে যায় না। কিন্তু সেই বছর ধারদেনা মাথার ওপর, মহাজন তাগাদা দিচ্ছে, আর পূর্ণিমার জোয়ারে ইলিশ ওঠে ঝাঁকে ঝাঁকে।

রাত এগারোটার মধ্যে দুবার জাল তুলল তারা। দুবারই রুপালি মাছে ভরা। সুমন খুশিতে হাসছিল, কুদ্দুসও। নদী শান্ত, চাঁদ মাথার ওপর, পানির ওপর চাঁদের আলো গলানো রুপার মতো ছড়িয়ে আছে।

তৃতীয়বার জাল ফেলার পর কুয়াশা নামল।

হঠাৎ। কোনো সংকেত ছাড়া। এক মুহূর্ত আগে চাঁদ ছিল, তারপর চারদিক সাদা। এত ঘন যে নৌকার গলুই থেকে পাছা দেখা যায় না। শব্দও যেন কুয়াশায় শুষে নিল—ঢেউয়ের ছলাৎ, দূরের ট্রলারের ইঞ্জিন, সব থেমে গেল।

সুমন বাবার হাত ধরল। "আব্বা, কিছু দেখা যায় না।"

"বইসা থাক। নড়িস না।"


লণ্ঠনের আলো

কুয়াশার ভেতর দিয়ে একটা আলো দেখা দিল। হলুদ, কাঁপা কাঁপা, লণ্ঠনের আলো। ধীরে ধীরে কাছে আসছে। কোনো ইঞ্জিনের শব্দ নেই, বৈঠার শব্দ নেই। আলোটা শুধু ভেসে আসছে, যেন স্রোতের উল্টো দিকে।

তারপর নৌকাটা দেখা গেল। একটা পুরোনো ছইওয়ালা নৌকা, এমন ধরনের যা এখন আর মেঘনায় দেখা যায় না। কাঠ কালো হয়ে গেছে, ছইয়ের বাঁশ বাঁকা। গলুইয়ে ঝুলছে লণ্ঠন। আর ছইয়ের ভেতর অন্ধকারে কেউ একজন বসে আছে—মাথায় গামছা, মুখ দেখা যায় না।

কুয়াশার ভেতর দিয়ে স্রোতের উল্টো দিকে ভেসে আসছিল একটা লণ্ঠন

নৌকাটা তাদের নৌকার পাশে এসে থামল। একেবারে গায়ে গায়ে। কুদ্দুস গন্ধ পেল—ভেজা কাঠ, শ্যাওলা, আর তামাকের গন্ধ। খুব চেনা তামাকের গন্ধ। তার বাবার হুঁকার গন্ধ।

ছইয়ের ভেতর থেকে একটা গলা এল। বুড়ো, ভাঙা, কিন্তু কুদ্দুস চিনল। ত্রিশ বছর পরেও চিনল।

কুদ্দুসের বুকের ভেতর কী যেন ভেঙে গেল। তার মা মারা গেছেন পাঁচ বছর আগে। বাবা ত্রিশ বছর আগে। আর এখন, এই কুয়াশায়, তারা দুজনই তাকে ডাকছে।

সে উঠে দাঁড়াল। এক পা বাড়াল ওই নৌকার দিকে।

তখন সুমন তার লুঙ্গির খুঁট টেনে ধরল। "আব্বা!"


ডাক আর উত্তর

ছেলের গলা শুনে কুদ্দুস থমকে গেল। নিচে তাকাল। সুমনের মুখ সাদা, চোখে পানি। আর তার হাত—যে হাত বাবার লুঙ্গি আঁকড়ে আছে—থরথর করে কাঁপছে।

ঠিক ত্রিশ বছর আগে, কুদ্দুস ভাবল, সেও তো ঘাটে দাঁড়িয়ে এভাবেই কেঁদেছিল। বাবার জন্য। যে বাবা আর ফেরেনি।

ছইয়ের ভেতর থেকে আবার ডাক এল, এবার একটু অধৈর্য: "আয় কুদ্দুস। পোলারেও আন। জায়গা আছে।"

আর তখন কুদ্দুস বুঝল।

তার বাবা কখনো তাকে "পোলা" বলে ডাকতেন না। বলতেন "বাজান"। আর তার বাবা, যত কষ্টই হোক, কখনো কোনো শিশুকে নদীর মাঝখানে ডাকতেন না।

কুদ্দুস বসে পড়ল। ছেলেকে বুকের মধ্যে চেপে ধরল। আর গলা যতখানি চড়ানো যায়, চড়িয়ে বলল:

"আমি ডাকি নাই। আমি পার হমু না। যে ডাকে নাই, তারে নেওয়ার নিয়ম নাই।"

এটা ছিল তার দাদির শেখানো কথা। ছোটবেলায় শোনা, ভুলে যাওয়া, আজ হঠাৎ জিভে এসে গেল।

ছইয়ের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস—বাতাসের মতো, ঢেউয়ের মতো। লণ্ঠনের আলো দপদপ করে উঠল। তারপর নৌকাটা ধীরে ধীরে সরে যেতে লাগল, কুয়াশার ভেতর, স্রোতের উল্টো দিকে। আলোটা ছোট হতে হতে একটা বিন্দু হলো, তারপর মিলিয়ে গেল।

কুয়াশা কাটল পাঁচ মিনিটের মধ্যে। আবার চাঁদ। আবার রুপালি নদী। দূরে ট্রলারের ইঞ্জিন।


তারা ভোরে ঘাটে ফিরল। জাল ভরা মাছ নিয়ে। কুদ্দুস কাউকে কিছু বলল না।

কিন্তু নৌকা থেকে নামার সময় সুমন বাবার হাত ধরে একটা প্রশ্ন করল, যেটা কুদ্দুস সারা জীবন মনে রাখবে।

"আব্বা, দাদায় যখন ডাকছিল, তখন ছইয়ের ভিতরে আরও একজন বসা আছিল। তুমি দেখছ?"

কুদ্দুস দাঁড়িয়ে গেল। "না।"

সুমন নদীর দিকে তাকিয়ে বলল, খুব শান্ত গলায়, যেমন করে শিশুরা ভয়ংকর কথা বলে:

"একজন বুড়া মানুষ। দাদার পিছনে বসা। হাত-পা দড়ি দিয়া বান্ধা। মুখে কাপড়। আর আমার দিকে চাইয়া মাথা নাড়তেছিল। না, না, না—এইভাবে।"

কুদ্দুস অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বুঝল। ত্রিশ বছর আগে যে নৌকায় তার বাবা উঠেছিলেন, সেই নৌকার মাঝি আজও মেঘনায় ঘোরে—আর যাদের নিয়ে যায়, তাদের গলা দিয়েই পরের জনকে ডাকে।

৭.৪ হাজার বার পড়া হয়েছে · প্রকাশ ২৭ জুলাই ২০২৬

এরপর কী পড়বেন

সব দেখুন
ভূতের গল্প

স্কন্ধকাটার শেষ ট্রেন

রাত বারোটার লোকাল ট্রেনে একা এক যাত্রী। প্ল্যাটফর্মের লোকটা হাত নাড়ছে ঠিকই, কিন্তু তার কাঁধের ওপর মাথাটা নেই।

নিনিশাচর রায়হান
  • ১১ মিনিট
  • ২৫ হাজার বার পড়া হয়েছে

৩ জুলাই ২০২৬

সত্য ঘটনা অবলম্বনে

চারতলার ৪১৩ নম্বর রুম

হলের চারতলায় ৪১৩ নম্বর রুমটা বারো বছর ধরে তালাবদ্ধ। নতুন সিট বরাদ্দের তালিকায় হঠাৎ সেই রুমের নাম এল, আর প্রথম রাতেই দরজায় টোকা—ঠিক তিনটা বেজে তেরো মিনিটে।

নিনিশাচর রায়হান
  • ৫ মিনিট
  • ২২ হাজার বার পড়া হয়েছে

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

লোককাহিনি

গেছো ভূতের বাঁশবাগান

গ্রামের শেষ মাথার বাঁশবাগান পেরোলেই স্কুল। সন্ধ্যার পর ওই পথে হাসির শব্দ শোনা যায়, অথচ আশেপাশে কেউ থাকে না।

শ্যাশ্যামল দত্ত
  • ১১ মিনিট
  • ২০ হাজার বার পড়া হয়েছে

১১ জুলাই ২০২৬