মামদোর ডাক
কবরস্থান দিয়ে শর্টকাট নিলেই বিপদ। কেউ যেন পেছন থেকে নাম ধরে ডাকে, অথচ পেছনে ফিরলে কেউ নেই।
- ৯ মিনিট
- ১৫ হাজার বার পড়া হয়েছে
- ৯৮০ জন পছন্দ করেছেন
যে নাম ধরে ডাকে
কবরস্থানের পাশ দিয়ে শর্টকাটটা জসিমের চেনা, কতবার গেছে হিসেব নেই। সেদিন কাজ থেকে ফিরতে রাত হয়ে গিয়েছিল, বাজারের পথ ঘুরে যাওয়ার সময় ছিল না।
দেয়াল ঘেঁষে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ শুনল, কেউ যেন পেছন থেকে নাম ধরে ডাকছে—— 'জসিম!'
গলার স্বরটা চেনা, যেন পাড়ার কারো, কিন্তু ঠিক কার তা মনে করতে পারল না।
ফিরে তাকাল, কেউ নেই।
শুধু কবরস্থানের গেটের কাছে একটা লম্বা ছায়া কাঁপছিল, যদিও চাঁদের আলো ছাড়া আর কোনো আলো ছিল না সেখানে।
ডাকটা আবার এল, এবার আরও কাছ থেকে—— 'জসিম, দাঁড়া!'
জসিম দাঁড়ায়নি।
বুড়িরা বলে, মামদো ভূত নাম ধরে ডাকে, আর যে ফিরে তাকিয়ে সাড়া দেয়, তাকেই সঙ্গে নিয়ে যায়।
জসিম দৌড়ে বাজারের মোড় পর্যন্ত এসে তবে থামল, দম আটকে আসছিল।
সেই রাতের পর জসিম আর কখনো সন্ধ্যার পর ওই দেয়ালের পাশ দিয়ে যায়নি।
বলে, এখনও কেউ কেউ নাকি নিজের নাম শুনতে পায় ওই পথে—শুধু ফিরে তাকানোটাই বারণ।
কিন্তু গল্পটা সেখানেই শেষ হয়নি।
বরং আসল ঘটনাটা শুরু হয়েছিল তার তিন দিন পর।
সেদিন সকালে জসিমের ছোট ভাই রাকিব ঘুম থেকে উঠে বলল,— 'ভাইয়া, কাল রাতে তুমি আমাকে ডাকছিলে?'
জসিম অবাক হয়ে বলল,— 'আমি?'
— 'হ্যাঁ।'
— 'কখন?'
রাকিব কিছুক্ষণ ভেবে বলল,— 'রাত দুইটার দিকে। তুমি দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে বলছিলে, ‘রাকিব, দরজা খোল।’'
জসিমের বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।
— 'আমি তো রাতে ঘর থেকেই বের হইনি।'
রাকিব হেসে বলল,— 'আমিও তাই ভেবেছিলাম। কিন্তু তুমি তিনবার ডাকছিলে।'
জসিম আর কিছু বলল না।
তার মনে পড়ল সেই রাতের কথা।
কবরস্থানের গেটের কাছে সেই ছায়া।
'জসিম!'
'জসিম, দাঁড়া!'
সে সেদিন ফিরে তাকায়নি।
কিন্তু যদি...সে শুধু নাম ধরে ডাকা শুনেই থাকত?
তারপর থেকে কি সেই জিনিসটা তার নামটা মনে রেখেছে?
জসিম নিজেকে বোঝাল, এসব কুসংস্কার।
কেউ হয়তো মজা করেছে।
কিন্তু সেদিন রাতেই আবার শব্দ হলো।
রাত প্রায় আড়াইটা।
জসিমের ঘুম ভেঙে গেল।
বাইরে কেউ হাঁটছে।
ধীরে ধীরে।
চুপচাপ।
তারপর দরজার ঠিক বাইরে এসে থামল।
জসিম নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুয়ে রইল।
কয়েক সেকেন্ড কোনো শব্দ নেই।
তারপর—— 'জসিম...'সে চোখ খুলল।
ঘরের অন্ধকারে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল।
আবার ডাক।
— 'জসিম...'এবার গলাটা খুব পরিচিত।
তার মায়ের।
কিন্তু তার মা মারা গেছেন পাঁচ বছর আগে।
জসিমের শরীরের প্রতিটি লোম দাঁড়িয়ে গেল।
দরজার বাইরে থেকে আবার গলা এল।
— 'বাবা, দরজা খোল।'
জসিম মুখে হাত চাপা দিল।
তার মা তাকে ছোটবেলায় 'বাবা' বলেই ডাকতেন।
একই স্বর।
একই টান।
একই মায়া।
শুধু একটা ব্যাপার আলাদা।
মা কখনো তার নাম এভাবে টেনে বলতেন না।
— 'জসি...ম...'দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে একটা ছায়া দেখা গেল।
মানুষের পায়ের মতো নয়।
দুটো পা যেন মাটিতে না রেখে দাঁড়িয়ে আছে।
জসিম চোখ বন্ধ করে ফেলল।
কিছুক্ষণ পর ছায়াটা সরে গেল।
পায়ের শব্দও নেই।
পরদিন সকালে দরজার বাইরে কোনো পায়ের ছাপ পাওয়া গেল না।
কিন্তু দরজার কাঠে তিনটা লম্বা আঁচড় ছিল।
একটার নিচে আরেকটা।
যেন কেউ ধারালো নখ দিয়ে টেনেছে।
জসিম কাউকে কিছু বলল না।
কিন্তু সেই দিন থেকে সে সন্ধ্যার পর একা কোথাও যেত না।
তারপরও ঘটনা থামল না।
এক সপ্তাহ পর পাশের বাড়ির করিম চাচা এসে বললেন,— 'তোমার ভাই রাকিব রাতে কোথায় যায়?'
জসিম অবাক।
— 'কোথাও যায় না তো।'
— 'আমি কাল দেখেছি।'
— 'কোথায়?'
করিম চাচা কবরস্থানের দিক দেখালেন।
— 'রাত তিনটার সময়।'
জসিমের বুক কেঁপে উঠল।
— 'রাকিব?'
— 'হ্যাঁ।'
— 'আপনি নিশ্চিত?'
করিম চাচা বললেন,— 'আমি জানালা দিয়ে দেখেছি। তোমার ভাই কবরস্থানের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।'
জসিম সঙ্গে সঙ্গে রাকিবকে ডাকল।
— 'তুই কাল রাতে কোথায় গিয়েছিলি?'
রাকিব অবাক হয়ে তাকাল।
— 'আমি?'
— 'হ্যাঁ।'
— 'আমি তো ঘরেই ছিলাম।'
— 'করিম চাচা তোকে দেখেছে।'
রাকিব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,— 'ভাইয়া, আমি ঘুমের মধ্যে হাঁটি।'
জসিমের মুখ শুকিয়ে গেল।
সেই রাতে সে রাকিবের ঘরের দরজায় বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দিল।
রাকিব হাসতে হাসতে বলল,— 'তুমি এত ভয় পাচ্ছ কেন?'
জসিম উত্তর দিল না।
রাত বাড়ল।
দেড়টা।
দুইটা।
আড়াইটা।
তারপর—ঠক।
ঠক।
ঠক।
রাকিবের ঘরের দরজায় শব্দ হলো।
জসিম নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
রাকিব ঘুমাচ্ছে।
দরজা বাইরে থেকে তালাবদ্ধ।
তবু ভেতর থেকে কেউ দরজায় টোকা দিচ্ছে।
ঠক।
ঠক।
ঠক।
জসিম ফিসফিস করে বলল,— 'রাকিব?'
ভেতর থেকে রাকিবের গলা।
— 'ভাইয়া?'
— 'তুই জেগে আছিস?'
— 'হ্যাঁ।'
— 'দরজা থেকে দূরে থাক।'
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর রাকিব বলল,— 'ভাইয়া...'— 'কী?'
— 'দরজার ওপাশে কে দাঁড়িয়ে আছে?'
জসিমের বুক ধড়াস করে উঠল।
— 'কেউ নেই।'
রাকিব কাঁপা গলায় বলল,— 'আছে।'
— 'কে?'
— 'তুমি।'
জসিম পিছিয়ে গেল।
তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল।
ভেতর থেকে রাকিব বলল,— 'তুমি দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছ।'
জসিম দরজার দিকে তাকাল।
সে তো সত্যিই দাঁড়িয়ে আছে।
তারপর রাকিব ফিসফিস করে বলল,— 'কিন্তু তুমি যদি বাইরে থাকো...'একটু বিরতি।
— 'তাহলে জানালার পাশে যে জিনিসটা দাঁড়িয়ে আছে, সেটা কে?'
জসিম ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে জানালার দিকে তাকাল।
জানালার কাঁচের ওপারে একটা মুখ।
ফ্যাকাশে।
অস্বাভাবিক লম্বা।
চোখ দুটো সম্পূর্ণ কালো।
মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই।
শুধু ঠোঁট নড়ছে।
কিন্তু কোনো শব্দ নেই।
জসিম পিছিয়ে গেল।
তারপর হঠাৎ বাইরে থেকে একটা গলা শোনা গেল—— 'জসিম...'সে চোখ বন্ধ করল।
— 'জসিম...'গলাটা এবার তার নিজের।
— 'জসিম, ফিরে তাকাও।'
জসিম জানত—এটাই সেই মুহূর্ত।
কবরস্থানের রাতের কথা মনে পড়ল।
ফিরে তাকানো যাবে না।
সে চোখ বন্ধ করেই দাঁড়িয়ে রইল।
কিন্তু তখন রাকিব চিৎকার করে উঠল।
— 'ভাইয়া!'
জসিম বাধ্য হয়ে ঘুরে তাকাল।
জানালার পাশে কেউ নেই।
দরজার সামনে কেউ নেই।
কিন্তু রাকিবের ঘরের দরজা খোলা।
তালা মেঝেতে পড়ে আছে।
রাকিব নেই।
জসিম পাগলের মতো বাড়ির প্রতিটি ঘর খুঁজল।
ছাদ।
বাথরুম।
রান্নাঘর।
উঠান।
কোথাও নেই।
শেষ পর্যন্ত সে কবরস্থানের দিকে দৌড়াল।
রাত তখন তিনটা পঁচিশ।
গেট খোলা।
চাঁদের আলোয় কবরগুলোর ছায়া লম্বা হয়ে পড়েছে।
জসিম গেটের সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করল,— 'রাকিব!'
কোনো উত্তর নেই।
তারপর কবরস্থানের ভেতর থেকে রাকিবের গলা এল।
— 'ভাইয়া...'জসিম দৌড়ে ভেতরে ঢুকতে যাচ্ছিল।
হঠাৎ থেমে গেল।
গলার স্বরটা খুব কাছ থেকে আসছে।
কিন্তু শব্দটা যেন চারদিক থেকে একসঙ্গে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
— 'ভাইয়া...'তারপর আরেকটা গলা।
— 'জসিম...'তারপর আরেকটা।
— 'জসিম...'তারপর অনেকগুলো গলা।
একসঙ্গে।
সবাই তাকে ডাকছে।
কেউ তার মা।
কেউ তার বাবা।
কেউ তার ভাই।
কেউ তার বন্ধু।
কেউ তার নিজের কণ্ঠে।
জসিম পিছিয়ে এল।
সে বুঝল—ওটা তাকে ভেতরে ডাকছে।
রাকিবকে নয়।
হঠাৎ কবরস্থানের গেটের পাশে একটা লম্বা ছায়া দেখা গেল।
আগের রাতের মতো।
কিন্তু এবার ছায়াটা মাটিতে পড়ছে না।
মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
মানুষের মতো।
তারপর ছায়াটা ধীরে ধীরে জসিমের দিকে এগিয়ে এল।
জসিম দৌড় দিল।
পেছন থেকে অসংখ্য গলা চিৎকার করতে লাগল—— 'জসিম!'
— 'জসিম, দাঁড়া!'
— 'ফিরে তাকাস!'
— 'একবার শুধু তাকাস!'
জসিম দৌড়াতেই থাকল।
বাড়ির কাছে এসে সে শুনল—রাকিব কাঁদছে।
— 'ভাইয়া!'
জসিম থেমে গেল।
পেছন থেকে আবার গলা এল—— 'ভাইয়া, আমাকে নিয়ে যাও!'
এবার জসিম আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
সে ফিরে তাকাল।
কবরস্থানের গেটের কাছে রাকিব দাঁড়িয়ে।
একদম স্থির।
তার মুখ দেখা যাচ্ছে না।
শুধু অন্ধকার।
জসিম চিৎকার করল,— 'রাকিব!'
রাকিব হাত তুলল।
তারপর ধীরে ধীরে হাত নাড়ল।
ঠিক সেই মুহূর্তে জসিম বুঝতে পারল—ওটা রাকিব নয়।
কারণ রাকিবের ডান হাতে ছোটবেলা থেকেই একটা কাটা দাগ ছিল।
এই মানুষটার হাতে কোনো দাগ নেই।
আর তার পায়ের নিচে—কোনো ছায়া নেই।
জসিম পিছিয়ে যেতে চাইল।
কিন্তু তখনই তার কানের পাশে একটা গলা ফিসফিস করে বলল,— 'এবার তুই ফিরে তাকিয়েছিস।'
পরদিন ভোরে গ্রামের লোকেরা কবরস্থানের গেটের কাছে জসিমকে অচেতন অবস্থায় পেয়েছিল।
রাকিবকে পাওয়া যায়নি।
তিন দিন পর কবরস্থানের পেছনের একটা পুরোনো কবরের পাশে তার জুতো পাওয়া গেল।
তারপর অনেক খোঁজাখুঁজি হয়।
কিন্তু রাকিব আর ফিরে আসেনি।
জসিম অবশ্য বেঁচে ছিল।
কিন্তু সেই ঘটনার পর তার একটা অদ্ভুত অভ্যাস হয়ে গেল।
কেউ তার নাম ধরে ডাকলে সে কখনো সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিত না।
প্রথমে চারপাশে তাকাত।
তারপর নিশ্চিত হয়ে নিত—ডাকটা মানুষের কিনা।
বছর দুয়েক পর এক রাতে জসিম শহরের একটা হাসপাতালে বসে ছিল।
তার পাশে কেউ ছিল না।
হঠাৎ করিডোর থেকে নার্সের গলা এল—— 'জসিম সাহেব?'
জসিম মাথা তুলল।
তারপর থেমে গেল।
কারণ নার্স তাকে দূর থেকে ডাকেনি।
তার গলা ঠিক তার কানের পাশে শোনা গেল।
— 'জসিম...'সে ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল।
তারপর মনে পড়ল সেই রাতের কথা।
কবরস্থানের গেট।
লম্বা ছায়া।
আর সেই কণ্ঠ—'ফিরে তাকাস।'
জসিম আর তাকাল না।
কিছুক্ষণ পর পাশের বেডের রোগী তাকে জিজ্ঞেস করল,— 'ভাই, আপনাকে কে ডাকছিল?'
জসিম কোনো উত্তর দিল না।
রোগী আবার বলল,— 'আমি তো কাউকে দেখলাম না।'
জসিম তখন খুব আস্তে বলল,— 'ভালোই হয়েছে।'
— 'কেন?'
জসিম জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,— 'কারণ যে আমাকে ডাকছিল, সে মানুষ হলে আমি তাকে দেখতে পেতাম।'
তারপর থেকে জসিম একটা নিয়ম মেনে চলত।
কেউ তার নাম ধরে ডাকলে—সে ফিরে তাকাত না।
কেউ পেছন থেকে বললে—'জসিম, দাঁড়া।'
সে দাঁড়াত না।
কেউ পরিচিত গলায় ডাকলেও—সে উত্তর দিত না।
কারণ সে জানত—মামদো ভূতকে ভয় পাওয়ার আসল কারণ তার চেহারা নয়।
আসল ভয় হলো—সে আপনার পরিচিত সবার কণ্ঠ নকল করতে পারে।
আর গ্রামের মানুষ আজও বলে,কবরস্থানের পাশের সেই শর্টকাটে মাঝরাতে গেলে কখনো কখনো নিজের নাম শুনতে পাওয়া যায়।
প্রথমবার—দূর থেকে।
দ্বিতীয়বার—একটু কাছে।
তৃতীয়বার—একেবারে কানের পাশে।
তখন শুধু একটা কাজ করতে হয়।
কোনোভাবেই ফিরে তাকানো যাবে না।
কারণ কেউ যদি ফিরে তাকায়,সে হয়তো কিছু একটা দেখতে পাবে।
কিন্তু তার থেকেও ভয়ংকর হলো—কিছু একটা তাকে দেখে ফেলবে।