ডাইনি বুড়ির উঠান
গ্রামের সবাই বলত, নদীর ধারের কুঁড়েঘরের বুড়ি ডাইনি—পূর্ণিমার রাতে সে উঠানে বসে কারও নাম ধরে সুতো পাকায়। যেদিন বুড়ি মারা গেল, সেদিন জানা গেল নামগুলো কাদের।
- ৫ মিনিট
- ১১ হাজার বার পড়া হয়েছে
- ৭৯০ জন পছন্দ করেছেন
নদীর ধারের কুঁড়ে
আমাদের গ্রাম বাঘাবাড়ির দক্ষিণে যেখানে করতোয়া একটা বাঁক নিয়েছে, সেখানে বাঁশঝাড়ের আড়ালে একটা কুঁড়েঘর ছিল। খড়ের চাল, মাটির দেয়াল, আর সামনে লেপা-পোঁছা এক চিলতে উঠান। সেখানে থাকত হাজেরা বুড়ি।
তার বয়স কত, কেউ জানত না। আমার দাদি বলতেন, তিনি যখন বউ হয়ে এই গ্রামে আসেন, তখনও হাজেরা বুড়ি বুড়িই ছিল। সাদা থান, পিঠ বাঁকা, চোখ দুটো আশ্চর্য রকম উজ্জ্বল—যেন বয়স তার শরীর নিয়েছে, চোখ নিতে পারেনি।
গ্রামের সবাই তাকে বলত ডাইনি। বাচ্চারা তার উঠানের পাশ দিয়ে দৌড়ে যেত। গর্ভবতী মেয়েরা তার ছায়া মাড়াত না। কারও গরু মরলে, কারও ধানে পোকা লাগলে, কারও ছেলের জ্বর না ছাড়লে—সবাই আড়চোখে বাঁশঝাড়ের দিকে তাকাত।
কিন্তু সবচেয়ে বেশি যে কথাটা বলা হতো, সেটা পূর্ণিমার রাত নিয়ে।
পূর্ণিমায় হাজেরা বুড়ি উঠানে বসে সুতো পাকাত। একটা পুরোনো চরকা, পাশে প্রদীপ। আর সুতো পাকানোর সময় সে বিড়বিড় করে নাম বলত। গ্রামের মানুষের নাম। একেকটা নাম বলে, একটা সুতোয় গিঁট দেয়। তারপর সেই সুতো গুটিয়ে রাখে একটা মাটির হাঁড়িতে।
কেউ জানত না, কোন নামগুলো সে বলে। কেউ জানতে চাইতও না।
আমার নাম
আমার বয়স যখন এগারো, তখন এক পূর্ণিমার রাতে বাজি ধরে আমি বাঁশঝাড়ের পেছনে লুকিয়েছিলাম। সঙ্গে ছিল চাচাতো ভাই মুন্না। আমাদের উদ্দেশ্য একটাই—শুনব, বুড়ি কার নাম বলে।
চাঁদ তখন মাথার ওপর। উঠান রুপালি। প্রদীপের শিখা নিশ্চল, কারণ বাতাস নেই। চরকা ঘুরছে—ঘর্র্... ঘর্র্... আর বুড়ির ঠোঁট নড়ছে।
প্রথমে কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। তারপর আমরা একটু এগোলাম। আর শুনলাম:
মুন্না আমার হাত খামচে ধরল। রাবেয়া চাচির মেয়ে সুমি আমাদের সঙ্গে পড়ে।
তারপর বুড়ি থামল। চরকা থেমে গেল। সে মাথা ঘুরিয়ে সোজা বাঁশঝাড়ের দিকে তাকাল—যেখানে আমরা লুকিয়ে ছিলাম। চাঁদের আলোয় তার চোখ দুটো জ্বলছিল বিড়ালের মতো।
"রূপু," সে বলল। আমার ডাকনাম। "বাড়ি যা। আর কাল সুমিরে নদীর ঘাটে যাইতে দিস না।"
আমরা দৌড়ে পালিয়েছিলাম। পেছনে একবারও তাকাইনি।
ঘাটের সকাল
পরদিন সকালে আমি কাউকে কিছু বলিনি। ভয়ে, লজ্জায়—বাজি ধরে লুকিয়ে থাকার কথা জানলে মা পিঠের চামড়া তুলে নিত। কিন্তু দুপুরে যখন সুমি কলসি নিয়ে ঘাটের দিকে যাচ্ছিল, আমি তার পথ আটকে দাঁড়ালাম।
"আজ যাইস না।"
সুমি হাসল। "পাগল নাকি?"
আমি ওর কলসি কেড়ে নিয়ে নিজেই ঘাটে গেলাম। ঘাটের শেষ সিঁড়িটা শ্যাওলায় সবুজ, পিচ্ছিল। আমি সাবধানে পা রাখলাম। সিঁড়ির নিচে স্রোত ঘুরপাক খাচ্ছে, সেদিন অস্বাভাবিক জোরে—উজানে কোথাও বৃষ্টি হয়েছিল।
কলসি ভরে উঠে আসার সময় আমার পা পিছলাল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো পানি আমাকে টেনে নিচ্ছে। তারপর কে যেন আমার কবজি ধরে টেনে তুলল। শক্ত, শুকনো, খসখসে আঙুল।
আমি তাকিয়ে দেখলাম, কেউ নেই। ঘাট ফাঁকা। শুধু বাঁশঝাড়ের ফাঁক দিয়ে দূরে একটা সাদা থানের আঁচল মিলিয়ে গেল।
আমার কবজিতে তিনটা লালচে দাগ। আঙুলের দাগ। আর তার ওপর জড়ানো একটা সুতো—সাদা, একটা গিঁট দেওয়া।
হাঁড়ির ভেতর
হাজেরা বুড়ি মারা গেল সেই বছর কার্তিকে। কেউ টের পায়নি। তিন দিন পর গন্ধে মানুষ জড়ো হলো। গ্রামের মুরুব্বিরা ঠিক করলেন, দাফনের পর কুঁড়েঘর পুড়িয়ে দেওয়া হবে। ডাইনির ঘর রাখা যায় না।
ঘর পোড়ানোর আগে আমার বাবা আর আরও দুজন ভেতরে ঢুকেছিলেন, দেখতে যে কিছু দামি জিনিস আছে কিনা। পেলেন শুধু একটা চরকা, কয়েকটা মাটির বাসন, আর খাটের নিচে সেই হাঁড়ি। সুতোয় ঠাসা।
আর হাঁড়ির মুখে বাঁধা একটা ভাঁজ করা কাগজ। গ্রামের একমাত্র ডাকপিয়ন রইস চাচা পড়তে পারতেন। তিনি পড়লেন, সবার সামনে, উঠানে দাঁড়িয়ে।
উঠানে কেউ কথা বলল না। বাবা হাঁড়ি থেকে একমুঠো সুতো তুলে ধরলেন। প্রতিটি সুতোয় একটা গিঁট। কয়েকশো। হয়তো হাজার।
গ্রামের মুরুব্বিরা কুঁড়েঘর পোড়ালেন না। মাওলানা সাহেব হাজেরা বুড়ির জানাজা পড়ালেন, আর সেই জানাজায় গোটা গ্রাম এসেছিল—যে গ্রাম ষাট বছর তাকে ডাইনি বলে ডেকেছে।
এটুকু পর্যন্ত গল্পটা আমি অনেকবার অনেককে বলেছি। মানুষ শুনে চোখ মোছে, বলে—আহা, বেচারি।
কিন্তু শেষটুকু আমি কাউকে বলি না।
হাজেরা বুড়ি মারা যাওয়ার পর থেকে আমি প্রতি পূর্ণিমায় একটা স্বপ্ন দেখি। একটা উঠান, একটা চরকা, একটা প্রদীপ। চরকার সামনে বসে আছি আমি নিজে। আর আমার ঠোঁট নড়ছে। নাম বলছি। গিঁট দিচ্ছি।
ঘুম ভাঙলে আমার আঙুলে সুতোর দাগ থাকে।
গত পূর্ণিমায় স্বপ্নে যে নামটা বলেছি, সেটা আমার মেয়ের।
আমি সারা রাত জেগে বসে আছি, হাতে একটা সাদা সুতো। শুধু জানি না, গিঁটটা ঠিকমতো দিতে পেরেছি কিনা। কারণ হাজেরা বুড়ি তার চিঠিতে একটা কথা লেখেনি, যেটা আমি এখন জানি—
বিদ্যাটা শেখানো যায় না। বিদ্যাটা নিজেই মানুষ খুঁজে নেয়। আর যাকে একবার খুঁজে পায়, তার কবজিতে তিনটা আঙুলের দাগ রেখে যায়। আমার কবজিতে দাগগুলো আজও আছে, এগারো বছর বয়সের সেই দুপুরের মতোই লালচে।