মূল লেখায় যান

শেষ ট্রেন

রাত তখন ১টা ৪৭। স্টেশনটা অনেক আগেই ফাঁকা হয়ে গেছে। শেষ ট্রেন চলে যাওয়ার পর ছোট্ট স্টেশনগুলো কেমন যেন অন্যরকম হয়ে যায়।

রূরূপসী নাহার@ruposhi
  • ৭ মিনিট
  • ১০ হাজার বার পড়া হয়েছে
  • ৫৬০ জন পছন্দ করেছেন
শেষ ট্রেন

শেষ ট্রেনের পর

রাত তখন ১টা ৪৭।

স্টেশনটা অনেক আগেই ফাঁকা হয়ে গেছে।

শেষ ট্রেন চলে যাওয়ার পর ছোট্ট স্টেশনগুলো কেমন যেন অন্যরকম হয়ে যায়। দিনের কোলাহল, চায়ের দোকানের ভিড়, রিকশাওয়ালাদের ডাক—সবকিছু হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায়। শুধু দূরে কোথাও কুকুরের ডাক আর মাঝে মাঝে রেললাইনের ধাতব শব্দ।

রায়হান প্ল্যাটফর্মের শেষ বেঞ্চটায় বসে ঘড়ির দিকে তাকাল।

আর মাত্র দশ মিনিট।

তারপরই সে হাঁটা শুরু করবে।

স্টেশন থেকে তার বাড়ি প্রায় তিন কিলোমিটার। দিনের বেলা এই রাস্তা নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু রাতে রাস্তার একটা অংশ সবাই এড়িয়ে চলে।

পুরোনো রেল কোয়ার্টারের পাশের রাস্তা।

কেন এড়িয়ে চলে, রায়হান জানত না। ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছে, রাতের পর ওই রাস্তা দিয়ে না যেতে।

কিন্তু সেদিন তার আর কোনো উপায় ছিল না।

বাবার ফোন এসেছিল সন্ধ্যায়।

'যেভাবেই হোক আজ রাতে বাড়ি আয়।'

রায়হান জিজ্ঞেস করেছিল, 'কেন?'

কিছুক্ষণ চুপ থেকে বাবা বলেছিলেন,'তোর মায়ের ঘরে আজ আবার শব্দ হয়েছে।'

রায়হান কিছু বলেনি।

মা মারা গেছেন তিন বছর আগে।

মৃত্যুর পর প্রথম কয়েক মাস বাড়িতে অদ্ভুত কিছু শব্দ শোনা যেত। রান্নাঘরে থালা নড়ার শব্দ, মায়ের ঘরের দরজা খোলার শব্দ, মাঝরাতে আলমারির পাল্লা খোলার আওয়াজ।

সবকিছুরই কোনো না কোনো যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা পাওয়া গিয়েছিল।

কিন্তু গত দুই সপ্তাহ ধরে একটা শব্দ নিয়মিত শোনা যাচ্ছিল।

রাত ২টার দিকে মায়ের ঘরের ভেতর থেকে তিনবার দরজায় টোকা।

টক।

টক।

টক।

তারপর নীরবতা।

বাবা প্রথমে ব্যাপারটা গুরুত্ব দেননি।

কিন্তু এক রাতে তিনি দরজা খুলে দেখেছিলেন—ঘরটা ভেতর থেকে তালাবদ্ধ।

তালা খুলে ভেতরে ঢোকার পর কিছুই পাওয়া যায়নি।

সেদিনই রায়হানকে ফোন করেছিলেন।

'তুই একবার এসে দেখে যা।'

তাই অফিসের কাজ শেষ করে সে শেষ ট্রেন ধরেছিল।


ঘড়িতে ১টা ৫৪।

রায়হান উঠে দাঁড়াল।

ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে প্ল্যাটফর্ম থেকে নামল।

স্টেশনের বাইরে বেরোতেই তার মনে হলো কেউ তাকে দেখছে।

সে পিছনে তাকাল।

কেউ নেই।

স্টেশনের গেটের কাছে শুধু একজন বৃদ্ধ চা-ওয়ালা বসে ছিলেন। দোকান বন্ধ। তিনি একটা পুরোনো কম্বলের ওপর বসে বিড়ি খাচ্ছিলেন।

রায়হান এগিয়ে যেতে যেতে বৃদ্ধ বললেন,'বাবা।'

রায়হান থামল।

'জি?'

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,'ওই রাস্তা দিয়ে যেও না।'

রায়হান মৃদু হেসে বলল,'কোন রাস্তা?'

বৃদ্ধ রেল কোয়ার্টারের দিকে আঙুল তুললেন।

'ওইটা।'

'কেন?'

বৃদ্ধ কোনো উত্তর দিলেন না।

শুধু বললেন,'আজ রাতটা অন্য রাস্তা দিয়ে যেও।'

রায়হান এবার একটু বিরক্ত হলো।

'চাচা, অন্য রাস্তা দিয়ে গেলে এক ঘণ্টা বেশি লাগবে।'

বৃদ্ধ ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।

'এক ঘণ্টা বেশি লাগলেও যাও।'

রায়হান আর কথা না বাড়িয়ে হাঁটা শুরু করল।

পাঁচ মিনিট পর সে বুঝল—রাস্তা আসলে অস্বাভাবিকভাবে নীরব।

কোথাও কোনো মানুষ নেই।

একটা বাড়ির সামনের বাতিটা জ্বলছে। তারপর আর কোনো আলো নেই।

সে ফোন বের করে সময় দেখল।

২টা ০২।

ঠিক তখনই তার ফোনে একটা নোটিফিকেশন এল।

Motion detected.রায়হান থেমে গেল।

তার বাড়িতে লাগানো সস্তা CCTV ক্যামেরার অ্যাপ থেকে নোটিফিকেশন এসেছে।

সে ক্যামেরা খুলল।

বাড়ির করিডোর দেখা যাচ্ছে।

তার মায়ের ঘরের দরজা।

দরজাটা বন্ধ।

রায়হান কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর—দরজার নিচ দিয়ে একটা ছায়া নড়ল।

রায়হানের বুকের ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে গেল।

সে দ্রুত বাবাকে ফোন করল।

একবার।

দুবার।

তিনবার।

কেউ ধরল না।

আবার CCTV খুলল।

এবার দরজাটা একটু খোলা।

রায়হান হাঁটা থামিয়ে দিল।

তার মনে হলো কেউ ইচ্ছা করেই তাকে দেখাচ্ছে।

সে আবার বাবাকে ফোন করল।

এইবার ফোন ধরলেন বাবা।

'হ্যালো?'

বাবার কণ্ঠ খুব নিচু।

'বাবা, তুমি কোথায়?'

'আমি ঘরে।'

'মায়ের ঘরের দরজা খোলা কেন?'

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর বাবা বললেন,'তুই CCTV দেখছিস?'

'হ্যাঁ।'

'তুই এখন কোথায়?'

রায়হান রাস্তার দিকে তাকাল।

'রেল কোয়ার্টারের কাছে।'

বাবা হঠাৎ বললেন,'তুই এখনই থেমে যা।'

'কেন?'

'তুই কি একা?'

'হ্যাঁ।'

'নিশ্চিত?'

রায়হান ধীরে ধীরে পিছনে তাকাল।

ফাঁকা রাস্তা।

'হ্যাঁ।'

বাবার গলা কাঁপছিল।

'তাহলে তোর পেছনে যে মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে, সে কে?'

রায়হানের হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

সে ঘুরে তাকাল।

কেউ নেই।

কিন্তু ঠিক তখনই তার ডান কানের কাছে খুব আস্তে একটা শব্দ হলো।

'রায়হান...'সে দৌড় দিল।

পেছনে তাকাল না।

রাস্তার বাঁকে এসে সে একটা পরিত্যক্ত রেল কোয়ার্টারের সামনে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে লাগল।

ঠিক তখনই—টক।

টক।

টক।

শব্দটা ভেতর থেকে এল।

রায়হান জমে গেল।

দরজায় তিনবার টোকা।

তারপর ভেতর থেকে একজন মহিলার কণ্ঠ—'রায়হান?'

কণ্ঠটা তার মায়ের।

তার শরীরের প্রতিটি লোম দাঁড়িয়ে গেল।

মা তাকে ছোটবেলায় যেভাবে ডাকতেন, ঠিক সেই স্বর।

'বাবা... দরজা খোল।'

রায়হান পিছিয়ে গেল।

তার ফোন আবার বেজে উঠল।

বাবা।

'হ্যালো?'

'তুই কোথায়?'

'রেল কোয়ার্টারের সামনে।'

বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,'তুই এখনই রাস্তার মাঝখানে চলে যা। কোনো বাড়ির সামনে দাঁড়াবি না।'

'কেন?'

'কারণ ওই কোয়ার্টারটা পনেরো বছর ধরে তালাবন্ধ।'

রায়হান দরজার দিকে তাকাল।

'কিন্তু ভেতর থেকে...''শোন।'

বাবার গলা এবার কঠিন।

'তুই যা-ই শুনিস, কোনো দরজা খুলবি না।'

রায়হান কিছু বলতে যাচ্ছিল।

ঠিক তখন ভেতর থেকে আবার মায়ের কণ্ঠ।

'বাবা... আমি একা।'

তারপর খুব ধীরে—'তুই আমাকে দেখতে আসবি না?'

রায়হানের চোখে পানি চলে এল।

মায়ের শেষ দিনটা মনে পড়ে গেল।

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে মা তার হাত ধরে বলেছিলেন,'তুই ভয় পাস না।'

রায়হান চোখ বন্ধ করল।

একটা দীর্ঘ শ্বাস নিল।

তারপর রাস্তার দিকে পা বাড়াল।

পেছন থেকে আবার শব্দ হলো।

এবার মায়ের কণ্ঠ নয়।

একজন পুরুষের কণ্ঠ।

'ভাই, একটু দাঁড়ান।'

রায়হান থামল না।

'ভাই!'

কণ্ঠটা এবার খুব কাছে।

'আপনার ফোনটা পড়ে গেছে।'

রায়হান নিজের ফোনের দিকে তাকাল।

ফোন তার হাতেই।

সে দৌড়াতে শুরু করল।


প্রায় দশ মিনিট পর সে স্টেশনের কাছে ফিরে এল।

চা-ওয়ালার দোকানের সামনে এসে থামল।

বৃদ্ধ তখনও সেখানে বসে।

রায়হান হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,'চাচা...'বৃদ্ধ তার দিকে তাকিয়ে বললেন,'বলেছিলাম না?'

রায়হান বসে পড়ল।

'ওখানে কী আছে?'

বৃদ্ধ উত্তর দিলেন না।

কিছুক্ষণ পর বললেন,'পনেরো বছর আগে ওই কোয়ার্টারে এক লোক থাকত। রেলওয়ের কর্মচারী।'

'তারপর?'

'এক রাতে তার স্ত্রী আর ছেলে মারা যায়।'

'কীভাবে?'

'লোকটা বলেছিল, ডাকাত ঢুকেছিল।'

বৃদ্ধ বিড়িতে টান দিলেন।

'কিন্তু পুলিশ অন্য কথা বলেছিল।'

রায়হান তাকিয়ে রইল।

'কী কথা?'

'লোকটাই নাকি মেরেছিল।'

রায়হানের গলা শুকিয়ে গেল।

'তারপর?'

'লোকটা কয়েকদিন পর নিখোঁজ হয়ে যায়।'

বৃদ্ধ বললেন,'তারপর থেকে মাঝরাতে ওই ঘর থেকে তিনবার দরজায় টোকা শোনা যায়।'

রায়হান কিছু বলল না।

হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল।

বাবা।

সে ধরল।

'বাবা?'

ওপাশে কোনো উত্তর নেই।

শুধু খুব ক্ষীণ একটা শব্দ।

টক।

টক।

টক।

রায়হানের বুক কেঁপে উঠল।

'বাবা?'

আবার তিনবার টোকা।

তারপর ফোন কেটে গেল।


রায়হান সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির দিকে দৌড়াল।

দশ মিনিট পর বাড়িতে পৌঁছে দরজা ধাক্কা দিল।

'বাবা!'

কোনো উত্তর নেই।

দরজা ভেতর থেকে বন্ধ।

প্রতিবেশীদের ডেকে দরজা ভাঙা হলো।

ঘরের ভেতর কেউ নেই।

শুধু মায়ের পুরোনো ঘরের দরজা খোলা।

মেঝেতে বাবার ফোন পড়ে আছে।

আর টেবিলের ওপর একটা কাগজ।

রায়হান কাগজটা তুলে নিল।

কাঁপা হাতে লেখা—'রায়হান, যদি তুই এটা পড়িস, তাহলে মনে রাখিস—রাতে যে কণ্ঠটা তুই শুনবি, সেটা তোর মায়ের নয়। কিন্তু সে তোর মায়ের সব কথা জানে।'

নিচে আরেকটা লাইন।

'আমি ভুল করেছিলাম। পনেরো বছর আগে কোয়ার্টারে যে মানুষটা মারা গিয়েছিল, সে একা ছিল না।'

রায়হান কাগজটা পড়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

ঠিক তখনই মায়ের ঘরের ভেতর থেকে শব্দ এল।

টক।

টক।

টক।

রায়হান দরজার দিকে তাকাল।

তারপর ভেতর থেকে খুব পরিচিত একটা কণ্ঠ শোনা গেল—'বাবা...'একটু বিরতি।

'এবার তো আমাকে দেখতে আসবি?'

রায়হান দরজা খুলল না।

কিন্তু সে জানত—যে-ই ভেতরে থাকুক,সে তার বাড়ির ভেতরে ছিল না।

সে তার জন্য অপেক্ষা করছিল।

আর সবচেয়ে ভয়ের বিষয় ছিল—ঘড়িতে তখনও রাত ২টা ০২ মিনিট।

অর্থাৎ রায়হান যে দশ মিনিট বাইরে দৌড়েছিল,সেই দশ মিনিটে ঘড়ির কাঁটা এক মিনিটও এগোয়নি।

১০ হাজার বার পড়া হয়েছে · প্রকাশ ২০ আগস্ট ২০২৬

এরপর কী পড়বেন

সব দেখুন
ভূতের গল্প

স্কন্ধকাটার শেষ ট্রেন

রাত বারোটার লোকাল ট্রেনে একা এক যাত্রী। প্ল্যাটফর্মের লোকটা হাত নাড়ছে ঠিকই, কিন্তু তার কাঁধের ওপর মাথাটা নেই।

নিনিশাচর রায়হান
  • ১১ মিনিট
  • ২৫ হাজার বার পড়া হয়েছে

৩ জুলাই ২০২৬

সত্য ঘটনা অবলম্বনে

চারতলার ৪১৩ নম্বর রুম

হলের চারতলায় ৪১৩ নম্বর রুমটা বারো বছর ধরে তালাবদ্ধ। নতুন সিট বরাদ্দের তালিকায় হঠাৎ সেই রুমের নাম এল, আর প্রথম রাতেই দরজায় টোকা—ঠিক তিনটা বেজে তেরো মিনিটে।

নিনিশাচর রায়হান
  • ৫ মিনিট
  • ২২ হাজার বার পড়া হয়েছে

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

লোককাহিনি

গেছো ভূতের বাঁশবাগান

গ্রামের শেষ মাথার বাঁশবাগান পেরোলেই স্কুল। সন্ধ্যার পর ওই পথে হাসির শব্দ শোনা যায়, অথচ আশেপাশে কেউ থাকে না।

শ্যাশ্যামল দত্ত
  • ১১ মিনিট
  • ২০ হাজার বার পড়া হয়েছে

১১ জুলাই ২০২৬