মূল লেখায় যান

কুয়ার ভেতরে কে

নানুবাড়ির পেছনের পরিত্যক্ত কুয়াটা টিন দিয়ে ঢাকা থাকত। দশ বছরের তিতলি একদিন টিন সরিয়ে নিচে তাকিয়েছিল—আর অন্ধকার পানির ভেতর থেকে কেউ তার দিকে তাকিয়ে হেসেছিল।

রূরূপসী নাহার@ruposhi
  • ৫ মিনিট
  • ৬.২ হাজার বার পড়া হয়েছে
  • ৩৩০ জন পছন্দ করেছেন
কুয়ার ভেতরে কে

নানুবাড়ির গ্রীষ্ম

প্রতি বছর গ্রীষ্মের ছুটিতে তিতলিকে ফরিদপুরের নানুবাড়িতে পাঠানো হতো। বিশাল উঠান, আম-কাঁঠালের বাগান, পুকুরে ঝাঁপ, মামাতো ভাইবোনদের সঙ্গে সারাদিন হইহল্লা। তিতলির কাছে সেই দুই মাস ছিল বছরের সবচেয়ে ভালো সময়।

নানুবাড়ির পেছনে, রান্নাঘর পেরিয়ে, একটা পুরোনো কুয়া ছিল। ইটের গোল পাড়, শ্যাওলায় সবুজ, মুখটা একটা মরচে-ধরা টিন দিয়ে ঢাকা, টিনের ওপর দুটো ভারী ইট। নানু কড়া নিষেধ করে দিয়েছিলেন: ওই কুয়ার ধারে কেউ যাবে না।

"কুয়ায় পানি আছে?" তিতলি একবার জিজ্ঞেস করেছিল।

নানু সেলাই থেকে চোখ না তুলে বলেছিলেন, "আছে। কিন্তু সে পানি খাওয়ার না।"

"তাহলে কীসের?"

নানু সেলাই থামালেন। অনেকক্ষণ তিতলির দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, "অপেক্ষার।"

দশ বছরের তিতলি কথাটার মানে বোঝেনি। কিন্তু সেদিন থেকে কুয়াটা তাকে টানতে শুরু করল।


টিনের নিচে

এক ভরদুপুরে, যখন সবাই ঘুমিয়ে, তিতলি চুপিচুপি কুয়ার কাছে গেল। ইট দুটো সরাতে বেশ কষ্ট হলো। টিনটা ধরে টান দিতেই কর্কশ শব্দে সরে এল।

নিচ থেকে ঠান্ডা বাতাস উঠে এল। আশ্চর্য ঠান্ডা, জ্যৈষ্ঠের দুপুরে যেমন হওয়ার কথা নয়। আর একটা গন্ধ—ভেজা মাটি, পুরোনো লোহা, আর কেমন একটা মিষ্টি গন্ধ, পাকা আমের মতো।

তিতলি পাড়ে ভর দিয়ে উঁকি দিল।

অনেক নিচে, হয়তো বিশ-পঁচিশ হাত, কালো পানি। স্থির। আয়নার মতো। সেই পানিতে সে নিজের মুখ দেখল—গোল আকাশের পটভূমিতে একটা ছোট কালো মাথা।

তারপর সে দেখল, পানিতে তার প্রতিবিম্বের পাশে আরেকটা মুখ।

একটা মেয়ের মুখ। তারই বয়সী। দুই বেণি। ফ্যাকাশে। আর সেই মুখটা হাসছে।

তিতলি চমকে পাশে তাকাল। কেউ নেই। সে আবার নিচে তাকাল। পানিতে এখন শুধু সেই মেয়েটার মুখ। তিতলির নিজের প্রতিবিম্ব নেই।

মেয়েটা ঠোঁট নাড়ল। শব্দটা উঠে এল কুয়ার দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে, বহুগুণ হয়ে:

তিতলি টিনটা টেনে কুয়ার মুখ ঢেকে দিল। ইট দুটো তুলে রাখল। তারপর দৌড়ে ঘরে ঢুকে নানুর পাশে শুয়ে পড়ল, কাঁপতে কাঁপতে।


হারানো খালা

তিতলি কাউকে কিছু বলেনি। কিন্তু সেদিন থেকে সে খেয়াল করতে লাগল কিছু জিনিস। রাতে ঘুমের মধ্যে কে যেন তার নাম ধরে ডাকে—"তিতলি... তিতলি..."—খুব দূর থেকে, যেন মাটির নিচ থেকে। সকালে উঠে দেখে, বালিশ ভেজা, অথচ সে কাঁদেনি। আর নানুবাড়ির কলের পানিতে কেমন একটা পাকা আমের মিষ্টি গন্ধ।

নানুর আলমারিতে একটা পুরোনো সাদা-কালো ছবি আছে, যেটা তিনি কাউকে দেখান না। ছবিতে দুটো মেয়ে—একজন তিতলির মা, ছোটবেলায়। আরেকজন, একই বয়সী, দুই বেণি।

তিতলি ছবিটা হাতে নিয়ে মাকে ফোন করল। "আম্মু, তোমার সাথে ছবিতে এটা কে?"

ফোনের ওপাশে অনেকক্ষণ নীরবতা। তারপর মা বললেন, খুব আস্তে, "তোর খালা। শিউলি। আমার জমজ বোন।"

"উনি কোথায়?"

"দশ বছর বয়সে হারিয়ে গিয়েছিল।" মায়ের গলা ভারী। "এক দুপুরে। সবাই ঘুমাচ্ছিল। কেউ খুঁজে পায়নি। পুকুর সেঁচা হয়েছিল, বাগান তন্নতন্ন করা হয়েছিল। কিছু পাওয়া যায়নি।"

"কুয়ায় খোঁজা হয়েছিল?"

আবার নীরবতা। তারপর মা বললেন, "তিতলি, তুই কুয়ার কাছে গিয়েছিলি?"

তিতলি উত্তর দিল না। মা আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। শুধু বললেন, "আমি কাল আসছি।"


যে দুপুরে কেউ ছিল না

মা এলেন পরদিন সন্ধ্যায়। নানু আর মা অনেক রাত পর্যন্ত বারান্দায় বসে ফিসফিস করে কথা বললেন। তিতলি ঘুমের ভান করে শুনল।

সেই দুপুরে, তিরিশ বছর আগে, দুই জমজ বোন কুয়ার পাড়ে খেলছিল। কুয়াটা তখন খোলা থাকত, বাড়ির পানি সেখান থেকেই তোলা হতো। শিউলি পাড়ের ওপর উঠে দাঁড়িয়েছিল—সাহস দেখাতে। তারপর পা পিছলে গেল।

তিতলির মা, দশ বছরের শাপলা, দেখেছিল। সে দৌড়ে বড়দের ডাকতে পারত। কিন্তু সে ভয় পেয়েছিল—বকা খাবে, মার খাবে, কারণ কুয়ার ধারে খেলা নিষেধ ছিল। সে চুপ করে ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়েছিল। ঘুমের ভান করে। কুয়া থেকে বোনের ডাক শুনতে শুনতে।

ডাক থেমে গিয়েছিল আধঘণ্টা পর।

সবাই যখন শিউলিকে খুঁজছিল, শাপলা কাউকে কুয়ার কথা বলেনি। আর আশ্চর্যের বিষয়, কেউ কুয়ায় খোঁজেনি। নানু পরে বলেছিলেন, মনে হয়েছিল কুয়াটা যেন চোখেই পড়ছিল না কারও।

মাসখানেক পর বাড়ির পানি তেতো হয়ে গেল। নানা কুয়াটা ঢেকে দিলেন। তারপর তিরিশ বছর।

নানু সব জানতেন। শাপলা বড় হয়ে একদিন কেঁদে কেঁদে সব বলেছিল। নানু মেয়েকে মাফ করেছিলেন। কিন্তু কুয়া খোলার সাহস কারও হয়নি।

কুয়ার কালো পানিতে প্রতিবিম্ব নয়, অন্য কেউ তাকিয়ে ছিল

পরদিন সকালে পুলিশ এল, এল ডুবুরি। কুয়া থেকে উঠে এল একটা ছোট কঙ্কাল, আর একটা লাল প্লাস্টিকের চুলের ক্লিপ। শিউলিকে দাফন করা হলো পারিবারিক কবরস্থানে, তিরিশ বছর পর।

জানাজার পর তিতলির মা কুয়ার পাড়ে গিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। তিতলি দূর থেকে দেখল, মা ঝুঁকে নিচের দিকে তাকিয়ে কী যেন বলছেন। ঠোঁট নড়ছে। চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।

তারপর মা হঠাৎ হাসলেন। একটা অদ্ভুত, শিশুসুলভ হাসি।

সেদিন বিকেলে ঢাকায় ফেরার পথে বাসে তিতলি মায়ের পাশে বসে ছিল। মা জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন, আর গুনগুন করে একটা গান গাইছিলেন—পুরোনো ছড়াগান, যেটা তিতলি কখনো মায়ের মুখে শোনেনি।

"আম্মু, এই গানটা কোথায় শিখলে?"

মা তার দিকে ফিরলেন। চোখে সেই শিশুসুলভ হাসি।

"শাপলা শিখাইছিল। কুয়ার পাড়ে বইসা।"

তিতলি স্থির হয়ে গেল। মা কখনো নিজেকে নাম ধরে বলেন না। মা কখনো গ্রামের টানে কথা বলেন না।

আর মায়ের চুলে, যেখানে আজ সকালেও কিছু ছিল না, একটা লাল প্লাস্টিকের ক্লিপ।

৬.২ হাজার বার পড়া হয়েছে · প্রকাশ ৬ জুলাই ২০২৬

এরপর কী পড়বেন

সব দেখুন
লোককাহিনি

গেছো ভূতের বাঁশবাগান

গ্রামের শেষ মাথার বাঁশবাগান পেরোলেই স্কুল। সন্ধ্যার পর ওই পথে হাসির শব্দ শোনা যায়, অথচ আশেপাশে কেউ থাকে না।

শ্যাশ্যামল দত্ত
  • ১১ মিনিট
  • ২০ হাজার বার পড়া হয়েছে

১১ জুলাই ২০২৬

পরিত্যক্ত বাড়ি

সিরিজ: রাতের বাড়ি · পর্ব ১

রাতের বাড়ি — পর্ব ১

সূত্রাপুরের গলির শেষে দোতলা পুরোনো বাড়ি, ভাড়া আশ্চর্য রকম কম। কেয়ারটেকার শুধু দুটো নিয়ম বলে দিয়েছিল—চিলেকোঠা খুলবেন না, আর রাত তিনটায় কলের পানি বন্ধ করতে যাবেন না।

ততমসী আফরোজ
  • ৫ মিনিট
  • ১৮ হাজার বার পড়া হয়েছে

১৯ জুলাই ২০২৬

ভূতের গল্প

মামদোর ডাক

কবরস্থান দিয়ে শর্টকাট নিলেই বিপদ। কেউ যেন পেছন থেকে নাম ধরে ডাকে, অথচ পেছনে ফিরলে কেউ নেই।

অঅধীর সেন
  • ৯ মিনিট
  • ১৫ হাজার বার পড়া হয়েছে

২৪ জুলাই ২০২৬