মূল লেখায় যান

স্কন্ধকাটার শেষ ট্রেন

রাত বারোটার লোকাল ট্রেনে একা এক যাত্রী। প্ল্যাটফর্মের লোকটা হাত নাড়ছে ঠিকই, কিন্তু তার কাঁধের ওপর মাথাটা নেই।

নিনিশাচর রায়হান@nishachar
  • ১১ মিনিট
  • ২৫ হাজার বার পড়া হয়েছে
  • ১.৬ হাজার জন পছন্দ করেছেন
স্কন্ধকাটার শেষ ট্রেন

যে স্টেশনে ট্রেন থামে

রফিক প্রতি শুক্রবার শেষ ট্রেনেই বাড়ি ফেরে।

রাত বারোটা কুড়ির লোকাল। কামরা প্রায় খালি, শুধু ফ্যানের ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ আর রেললাইনের একটানা ঝমঝম।

ঢাকা থেকে জেলা শহরের দিকে যাওয়া এই ট্রেনটা রফিকের কাছে পরিচিত। একই কামরা, একই সিট, একই জানালা। এমনকি মাঝরাতে কোন স্টেশনে কতক্ষণ ট্রেন দাঁড়াবে, সেটাও তার মুখস্থ।

সেদিনও সবকিছু স্বাভাবিকই ছিল।

অন্তত প্রথমদিকে।

রাত তখন প্রায় একটা।

রফিক জানালার পাশে বসে মোবাইলে সময় দেখছিল। নেটওয়ার্ক অনেক আগেই চলে গেছে। বাইরের অন্ধকারে মাঝে মাঝে দূরের কোনো বাড়ির আলো দেখা যাচ্ছে, তারপর আবার অন্ধকার।

তার বিপরীত সিটে একজন বৃদ্ধ ঘুমাচ্ছিলেন।

আর দরজার পাশে বসেছিল এক তরুণ ছেলে। কানে ইয়ারফোন, চোখ বন্ধ।

আর কেউ ছিল না।

হঠাৎ ট্রেনের গতি কমতে শুরু করল।

রফিক ভেবেছিল সামনে কোনো স্টেশন আছে।

কিন্তু জানালা দিয়ে তাকিয়ে সে অস্বস্তি বোধ করল।

এটা কোনো পরিচিত স্টেশন নয়।

প্ল্যাটফর্মটা ছোট।

কোনো নামের সাইনবোর্ড নেই।

কোনো আলো নেই।

শুধু প্ল্যাটফর্মের একেবারে মাঝখানে একটা হলুদ বাতি জ্বলছে।

ট্রেন পুরোপুরি থেমে গেল।

রফিক ঘড়ির দিকে তাকাল।

১টা ১৭।

তার জানা মতে এই সময় ট্রেনের কোনো স্টেশনে থামার কথা নয়।

সে দরজার কাছে এগিয়ে গেল।

ঠিক তখনই প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটাকে দেখতে পেল।

লোকটা রেললাইনের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে ছিল।

তারপর ধীরে ধীরে ট্রেনের দিকে ফিরল।

রফিক প্রথমে ভাবল, লোকটা হয়তো ট্রেনে উঠবে।

লোকটা হাত তুলল।

নাড়তে শুরু করল।

একই ছন্দে।

ধীরে।

ডানদিকে।

বামদিকে।

আবার ডানদিকে।

তারপর রফিক বুঝতে পারল—লোকটার মাথা নেই।

জামার কলারের ওপরে কিছু নেই।

শুধু একটা অন্ধকার গর্তের মতো ঘাড়।

রফিক দরজার হাতল ধরে দাঁড়িয়ে রইল।

লোকটা হাত নাড়তেই থাকল।

একই ছন্দে।

একই গতিতে।

যেন সে জানে না যে তার মাথা নেই।

হঠাৎ পাশ থেকে বৃদ্ধের গলা এল।

'দরজা বন্ধ করেন।'

রফিক চমকে পিছনে তাকাল।

বৃদ্ধ জেগে উঠেছেন।

চোখ দুটো অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে আছে।

'কেন?'

বৃদ্ধ উত্তর দিলেন না।

শুধু ফিসফিস করে বললেন,'ওকে উঠতে দেবেন না।'

রফিক আবার প্ল্যাটফর্মের দিকে তাকাল।

লোকটা এবার দরজার আরও কাছে এসেছে।

কীভাবে এসেছে, রফিক বুঝতে পারেনি।

সে তো একবারও হাঁটতে দেখেনি।

শুধু হাত নাড়ছিল।

তারপর—লোকটা এক হাত দিয়ে দরজার রড ধরল।

রফিকের বুকের ভেতর যেন কিছু একটা থেমে গেল।

মাথাহীন লোকটা ট্রেনে উঠতে চাইছে।

রফিক পিছিয়ে এল।

কিন্তু লোকটা উঠল না।

সে শুধু দরজার নিচে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে মাথাবিহীন ঘাড়টা ট্রেনের ভেতরের দিকে তুলল।

যেন সে রফিককে দেখছে।

যদিও সেখানে কোনো চোখ নেই।

ঠিক তখনই ট্রেন ঝাঁকুনি দিয়ে চলতে শুরু করল।

লোকটা হাত ছাড়ল না।

কয়েক সেকেন্ড সে ট্রেনের সঙ্গে সঙ্গে চলল।

তারপর প্ল্যাটফর্ম শেষ হয়ে গেল।

অন্ধকার তাকে গিলে ফেলল।

রফিক দরজা বন্ধ করে দিল।

কেউ কথা বলল না।

প্রায় পাঁচ মিনিট পর তরুণ ছেলেটা ইয়ারফোন খুলে বলল,'ভাই, আমরা কোথায় থামছিলাম?'

বৃদ্ধ তার দিকে তাকালেন।

'কিছু দেখেননি?'

'কী?'

বৃদ্ধ কিছু বললেন না।

রফিকও চুপ করে রইল।

পরের স্টেশনে নামার পর সে জানতে পারল, ট্রেনটা নির্ধারিত সময়ের চেয়ে সাত মিনিট দেরিতে পৌঁছেছে।

কিন্তু তার মোবাইলের ঘড়িতে সেই সাত মিনিটের কোনো হিসাব নেই।


বাড়ি পৌঁছানোর পর রফিক ঘটনাটা কাউকে বলেনি।

কিন্তু পরের শুক্রবার থেকে সে আর শেষ ট্রেনে ওঠেনি।

প্রথমে সবাই কারণ জিজ্ঞেস করেছিল।

সে বলেছিল,'শেষ ট্রেনে ভালো লাগে না।'

তারপর ধীরে ধীরে বিষয়টা ভুলে গেল সবাই।

কিন্তু রফিক ভুলতে পারল না।

বিশেষ করে একটা ব্যাপার।

লোকটার হাত নাড়ার সেই ছন্দ।

ডানদিকে।

বামদিকে।

ডানদিকে।

বামদিকে।

ঠিক তিন সপ্তাহ পর রফিকের অফিসের সহকর্মী সোহেল তাকে বলল,'তুই শুক্রবার শেষ ট্রেনে বাড়ি যাস না কেন?'

রফিক বলল,'এমনি।'

সোহেল হাসল।

'তুই তো আগে প্রতি শুক্রবার যেতিস।'

রফিক উত্তর দিল না।

সোহেল বলল,'আমিও যাই।'

রফিক তাকাল।

'কী?'

'শেষ ট্রেনে।'

'কোন কামরায়?'

'সামনের দিকের।'

রফিকের বুকের ভেতর অস্বস্তি হলো।

'কখনো অদ্ভুত কোনো স্টেশনে থামতে দেখেছিস?'

সোহেল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর হাসল।

'তুইও দেখেছিস?'

রফিকের মুখ শুকিয়ে গেল।

'কী দেখেছিস?'

সোহেল আর হাসল না।

'একটা স্টেশন।'

'কী নাম?'

'নাম নেই।'

'কতক্ষণ থামে?'

'সাত মিনিট।'

রফিকের হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।

'আর?'

সোহেল নিচু গলায় বলল,'প্রতি শুক্রবার।'

তারপর একটা কথা বলল, যেটা রফিককে সেদিন রাতে ঘুমাতে দেয়নি।

'কিন্তু আমি মাথাহীন লোকটাকে দেখিনি।'

'তাহলে?'

'আমি দেখেছি একজন মহিলা।'

সোহেল বলল,'সে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল।'

'কীভাবে বুঝলি?'

'তার মুখ ছিল না।'

রফিক কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না।


এরপর দুজন মিলে ব্যাপারটা খোঁজার সিদ্ধান্ত নিল।

প্রথমে তারা রেলওয়ের পুরোনো টাইমটেবিল দেখল।

সেখানে এমন কোনো স্টেশন নেই।

তারপর অনলাইনে পুরোনো রেল ম্যাপ খুঁজল।

কিছুই পেল না।

শেষ পর্যন্ত সোহেল একজন অবসরপ্রাপ্ত রেলকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করল।

লোকটির নাম আজিজুল হক।

বয়স প্রায় সত্তর।

তারা ঘটনাটা বলতেই বৃদ্ধ চুপ করে গেলেন।

অনেকক্ষণ পর তিনি বললেন,'তোমরা ওই স্টেশনের কথা কোথা থেকে জানলে?'

রফিক বলল,'ট্রেনে দেখেছি।'

বৃদ্ধের মুখের রং বদলে গেল।

'তাহলে তোমরা দুজনই দেখেছ?'

সোহেল বলল,'আমি দেখেছি। রফিকও।'

আজিজুল হক ধীরে ধীরে চেয়ারে হেলান দিলেন।

'স্টেশনটা ছিল।'

রফিক সামনে ঝুঁকল।

'কোথায়?'

'এখন নেই।'

'কেন?'

বৃদ্ধ বললেন,'প্রায় ত্রিশ বছর আগে একটা দুর্ঘটনা হয়েছিল।'

তিনি জানালার বাইরে তাকালেন।

'শুক্রবার রাত। শেষ ট্রেন।'

রফিকের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

'ট্রেনটা তখন ওই স্টেশনে দাঁড়িয়েছিল।'

'তারপর?'

'একজন রেলকর্মী মাথা কাটা অবস্থায় লাইনের পাশে পাওয়া যায়।'

সোহেল বলল,'দুর্ঘটনা?'

বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।

'না।'

'তাহলে?'

'খুন।'

ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

বৃদ্ধ বললেন,'লোকটা ছিল সিগন্যালম্যান। নাম ছিল মতিউর।'

'তার সঙ্গে কী হয়েছিল?'

'কেউ জানে না।'

'কিন্তু স্টেশনটা বন্ধ হলো কেন?'

আজিজুল হক এবার তাদের দিকে তাকালেন।

'কারণ শুধু মতিউর মারা যায়নি।'

রফিকের গলা শুকিয়ে গেল।

'আর কে?'

'সেদিন শেষ ট্রেনে যারা ছিল, তাদের মধ্যে সাতজন নিখোঁজ হয়েছিল।'

সোহেল বলল,'নিখোঁজ?'

'হ্যাঁ।'

'তাদের কোনো লাশ পাওয়া যায়নি?'

'একজনেরও না।'

বৃদ্ধ একটু থামলেন।

'শুধু পরদিন সকালে প্ল্যাটফর্মে সাত জোড়া জুতা পাওয়া গিয়েছিল।'

রফিকের শরীর কেঁপে উঠল।

'তারপর স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়।'

'কিন্তু ট্রেন তো এখনও সেখানে থামে।'

আজিজুল হক বললেন,'সব ট্রেন না।'

'শুধু শেষ ট্রেন?'

বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।

'শুধু শুক্রবারের শেষ ট্রেন।'


সেদিন বাড়ি ফেরার পর রফিক পুরোনো একটা জিনিস খুঁজে বের করল।

তার বাবার আলমারিতে থাকা একটা রেলওয়ের পুরোনো ডায়েরি।

রফিকের বাবা একসময় রেলওয়েতে কাজ করতেন।

ডায়েরির অনেক পাতা নষ্ট হয়ে গেছে।

কিন্তু একটা পাতায় তারিখ লেখা—শুক্রবার, ১৭ আগস্ট ১৯৯৬।

তার নিচে কয়েকটা নাম।

সাতজন যাত্রীর নাম।

তারপর—মতিউর — সিগন্যাল।

আর সবশেষে একটা বাক্য।

'ট্রেন থামার কথা ছিল না। কিন্তু থেমেছিল।'

রফিকের হাত কাঁপতে লাগল।

তারপর আরও নিচে লেখা—'যারা নেমেছিল, তারা কেউ ফেরেনি।'

ঠিক সেই মুহূর্তে তার ফোন বেজে উঠল।

সোহেল।

'হ্যালো?'

ওপাশে সোহেলের কণ্ঠ কাঁপছিল।

'তুই এখন কোথায়?'

'বাড়িতে।'

'আমি স্টেশনে।'

'কোন স্টেশন?'

'যেটার নাম নেই।'

রফিক উঠে দাঁড়াল।

'তুই পাগল হয়েছিস? ওখানে গেলি কেন?'

সোহেল কোনো উত্তর দিল না।

শুধু বলল,'রফিক...''কী?'

'আমি এখন প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছি।'

'ফিরে আয়।'

'পারছি না।'

'কেন?'

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর—'কারণ ট্রেন এসে গেছে।'

ফোন কেটে গেল।

রফিক সঙ্গে সঙ্গে থানায় ফোন করল।

তারপর রেলওয়ের জরুরি নম্বরে।

কিন্তু কেউ সোহেলের অবস্থান নিশ্চিত করতে পারল না।

পরদিন সকালে খবর এল—সোহেল নিখোঁজ।

তার ফোন পাওয়া গেছে একটা ছোট স্টেশনের কাছে।

রেললাইন থেকে প্রায় পঞ্চাশ মিটার দূরে।

ফোনের শেষ ভিডিওটা পুলিশ রফিককে দেখিয়েছিল।

ভিডিওতে সোহেল প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে।

তার সামনে ট্রেন।

ক্যামেরা কাঁপছে।

সোহেল বলছে,'রফিক, দেখ।'

তারপর ক্যামেরা প্ল্যাটফর্মের দিকে ঘোরে।

সেখানে একজন লোক দাঁড়িয়ে।

মাথা নেই।

হাত নাড়ছে।

ডানদিকে।

বামদিকে।

ডানদিকে।

বামদিকে।

ভিডিও শেষ হওয়ার ঠিক আগে সোহেলের গলা শোনা যায়—'ও আমাকে ডাকছে।'

তারপর খুব আস্তে আরেকটা কণ্ঠ।

একেবারে রফিকের মায়ের কণ্ঠের মতো।

'সোহেল, ট্রেনে ওঠো।'

রফিক ভিডিও বন্ধ করে দিয়েছিল।

এরপর সে সিদ্ধান্ত নিল, এই ঘটনা সম্পর্কে আর কখনো কারও সঙ্গে কথা বলবে না।


বছর কেটে গেল।

সে শহর বদলাল।

চাকরি বদলাল।

বিয়ে করল।

শেষ ট্রেনের নাম শুনলেই সে অন্যদিকে তাকাত।

তারপর এক শুক্রবার রাতে, প্রায় দশ বছর পর, রফিককে জরুরি কাজে আবার সেই রুটে যেতে হলো।

শেষ ট্রেন ছাড়া আর কোনো ট্রেন ছিল না।

স্টেশনে দাঁড়িয়ে সে অনেকক্ষণ দ্বিধা করল।

শেষ পর্যন্ত উঠে পড়ল।

ট্রেন ছাড়ল রাত বারোটা কুড়িতে।

সবকিছু আগের মতো।

একই ঝমঝম শব্দ।

একই ফ্যানের ক্যাঁচক্যাঁচ।

একই অন্ধকার।

রফিক জানালার পাশে বসে রইল।

রাত ১টা ১৭।

ট্রেনের গতি কমে গেল।

রফিকের বুকের ভেতর বরফ জমে গেল।

তারপর ট্রেন থামল।

সেই স্টেশন।

সেই হলুদ বাতি।

সেই প্ল্যাটফর্ম।

কিন্তু এবার সেখানে একজন লোক দাঁড়িয়ে নেই।

দাঁড়িয়ে আছে দুজন।

একজন মাথাহীন।

আর তার পাশে—সোহেল।

দশ বছর আগের সেই জামা পরা।

সোহেল ধীরে ধীরে হাত তুলল।

রফিকের দিকে তাকিয়ে হাসল।

তারপর মাথাহীন লোকটার মতো একই ছন্দে হাত নাড়তে শুরু করল।

ডানদিকে।

বামদিকে।

ডানদিকে।

বামদিকে।

রফিক সিট থেকে উঠল না।

চোখ বন্ধ করে বসে রইল।

ট্রেন আবার চলতে শুরু করল।

কয়েক মিনিট পর সে চোখ খুলল।

প্ল্যাটফর্ম নেই।

স্টেশন নেই।

কিছুই নেই।

শুধু অন্ধকার।

পরদিন সকালে রফিক ট্রেন থেকে নামার পর টিকিট চেকারকে একটা প্রশ্ন করেছিল।

'ভাই, গতরাতে ট্রেন কোথায় থেমেছিল?'

চেকার অবাক হয়ে তাকিয়েছিল।

'কোথাও না তো।'

'কিন্তু একটা স্টেশনে...'চেকার মাথা নাড়ল।

'এই ট্রেন শুক্রবার রাতে কোথাও থামে না।'

রফিক আর কিছু বলেনি।

বাড়ি ফিরে সে পুরোনো ডায়েরিটা বের করল।

পাতাটা আবার পড়ল।

'যারা নেমেছিল, তারা কেউ ফেরেনি।'

তারপর হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল নিচের একটা লাইনে।

যেটা সে আগে কখনো দেখেনি।

কালি ফিকে হয়ে যাওয়ায় এতদিন বোঝা যায়নি।

সেখানে লেখা—'কিন্তু যারা তাদের দেখেছে, তারা একদিন নিজেরাই ট্রেন থেকে নামবে।'

রফিকের হাত থেকে ডায়েরি পড়ে গেল।

সেদিনের পর সে আর কোনোদিন ট্রেনে ওঠেনি।

কিন্তু প্রতি শুক্রবার রাত ১টা ১৭ মিনিটে তার বাড়ির সামনে দিয়ে একটা ট্রেনের শব্দ যায়।

যদিও তার বাড়ির কাছাকাছি কোনো রেললাইন নেই।

প্রথম প্রথম সে শব্দটা উপেক্ষা করত।

তারপর এক রাতে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে শুনল—ঝমঝম।

ঝমঝম।

তারপর ব্রেকের কর্কশ শব্দ।

ট্রেন থামল।

রফিক জানালার পর্দা সরাল না।

কিছুক্ষণ পর দরজায় শব্দ হলো।

টক।

টক।

টক।

সে নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল।

আবার—টক।

টক।

টক।

তারপর বাইরে থেকে সোহেলের গলা।

'রফিক...'রফিক চোখ বন্ধ করল।

'দরজা খোল।'

সে নড়ল না।

সোহেল আবার বলল,'আমরা সবাই অপেক্ষা করছি।'

রফিকের বুক কেঁপে উঠল।

তারপর আরেকটা কণ্ঠ শোনা গেল।

মাথাহীন লোকটার কণ্ঠ।

কিন্তু তার কোনো মুখ নেই।

তবু শব্দটা স্পষ্ট।

'শেষ ট্রেন ছেড়ে যাবে।'

রফিক তখন বুঝতে পারল—সেই রাতে ট্রেনটা তাকে নিতে আসেনি।

সেদিন থেকে এত বছর ধরে ট্রেনটা শুধু অপেক্ষা করছিল।

তার জন্য।


পরদিন সকালে প্রতিবেশীরা রফিকের দরজা খোলা অবস্থায় পেয়েছিল।

ঘরের ভেতরে কেউ ছিল না।

শুধু মেঝেতে পড়ে ছিল একটা পুরোনো ট্রেনের টিকিট।

টিকিটে কোনো স্টেশনের নাম ছিল না।

শুধু তারিখ।

শুক্রবার।

আর সময়—রাত ১টা ১৭।

এরপর থেকে এলাকার মানুষ একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করত।

প্রতি শুক্রবার রাত ১টা ১৭ মিনিটে, রেললাইন থেকে বহু দূরে রফিকের বাড়ির সামনে দিয়ে একটা ট্রেনের শব্দ শোনা যেত।

কখনো কেউ ট্রেন দেখতে পায়নি।

শুধু শব্দ।

ঝমঝম।

তারপর ব্রেকের শব্দ।

তারপর কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা।

আর তারপর—কেউ একজন প্ল্যাটফর্ম থেকে হাত নাড়ার মতো করে জানালায় টোকা দিত।

ডানদিকে।

বামদিকে।

ডানদিকে।

বামদিকে।

যারা সেই শব্দ শুনেছে, তাদের কেউ কেউ পরে দাবি করেছে—জানালার ওপাশে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে।

মাথা নেই।

কিন্তু তার হাত নড়ে।

একই ছন্দে।

একইভাবে।

আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার—আজও প্রতি শুক্রবার শেষ ট্রেনটা সেই রুট দিয়ে যায়।

রেলওয়ের বর্তমান মানচিত্রে স্টেশনটির কোনো অস্তিত্ব নেই।

কোনো টিকিটে তার নাম নেই।

কোনো সরকারি নথিতে প্ল্যাটফর্মটির উল্লেখ নেই।

তবু চালকেরা একটা জিনিস জানে।

শুক্রবার রাত ১টা ১৭ মিনিটে, ট্রেনের ব্রেক কখনো কখনো নিজে থেকেই কষে আসে।

ট্রেন থেমে যায়।

ঠিক সাত মিনিটের জন্য।

আর সেই সাত মিনিটে—কেউ একজন প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ে।

যেন ট্রেনে উঠতে চায়।

যদি দরজা খোলা থাকে—সে উঠে আসে।

আর যদি দরজা বন্ধ থাকে—সে অপেক্ষা করে।

পরের শুক্রবার পর্যন্ত।

২৫ হাজার বার পড়া হয়েছে · প্রকাশ ৩ জুলাই ২০২৬

এরপর কী পড়বেন

সব দেখুন
সত্য ঘটনা অবলম্বনে

চারতলার ৪১৩ নম্বর রুম

হলের চারতলায় ৪১৩ নম্বর রুমটা বারো বছর ধরে তালাবদ্ধ। নতুন সিট বরাদ্দের তালিকায় হঠাৎ সেই রুমের নাম এল, আর প্রথম রাতেই দরজায় টোকা—ঠিক তিনটা বেজে তেরো মিনিটে।

নিনিশাচর রায়হান
  • ৫ মিনিট
  • ২২ হাজার বার পড়া হয়েছে

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

লোককাহিনি

গেছো ভূতের বাঁশবাগান

গ্রামের শেষ মাথার বাঁশবাগান পেরোলেই স্কুল। সন্ধ্যার পর ওই পথে হাসির শব্দ শোনা যায়, অথচ আশেপাশে কেউ থাকে না।

শ্যাশ্যামল দত্ত
  • ১১ মিনিট
  • ২০ হাজার বার পড়া হয়েছে

১১ জুলাই ২০২৬

পরিত্যক্ত বাড়ি

সিরিজ: রাতের বাড়ি · পর্ব ১

রাতের বাড়ি — পর্ব ১

সূত্রাপুরের গলির শেষে দোতলা পুরোনো বাড়ি, ভাড়া আশ্চর্য রকম কম। কেয়ারটেকার শুধু দুটো নিয়ম বলে দিয়েছিল—চিলেকোঠা খুলবেন না, আর রাত তিনটায় কলের পানি বন্ধ করতে যাবেন না।

ততমসী আফরোজ
  • ৫ মিনিট
  • ১৮ হাজার বার পড়া হয়েছে

১৯ জুলাই ২০২৬