জিনের বাজার
পূর্ণিমার রাতে পথ হারিয়ে রহমত পৌঁছায় এক নির্জন মাঠে, যেখানে মাঝরাতে নিঃশব্দে হাট বসেছে। দোকানিরা কেউ মুখ তোলে না। মেয়ের জন্য সে একটা জিনিস কেনে — আর সকালে টের পায়, দাম এখনও মেটানো হয়নি।
- ৫ মিনিট
- ০ বার পড়া হয়েছে
পূর্ণিমার মাঠ
রহমত আলী শ্বশুরবাড়ি থেকে রওনা দিয়েছিল আসরের পর। শাশুড়ি বারবার বলেছিলেন, “আইজ পূন্নিমা, বাবা, রাইতটা থাইকা যাও।” রহমত শোনেনি। বাড়িতে সাত বছরের মেয়ে ময়না জ্বর নিয়ে শুয়ে আছে। আসার সময় সে বাপের গলা জড়িয়ে বলেছিল, “আব্বা, আমার লাইগা নূপুর আনবা।”
কিন্তু নেত্রকোনার ওই দিকের রাস্তা বর্ষার পরে আর রাস্তা থাকে না। খাল পার হতে নৌকা পাওয়া গেল না, ঘুরপথে যেতে হলো। তারপর সূর্য ডুবল, আর রহমত টের পেল সে এমন এক বিলের ধারে এসে দাঁড়িয়েছে, যেটা সে জীবনে দেখেনি।
চাঁদ উঠেছিল মস্ত বড়, তামার থালার মতো। চারদিকে ধানকাটা ন্যাড়া মাঠ, নাড়ার গোড়াগুলো চাঁদের আলোয় সাদা হাড়ের মতো চকচক করছে। কোথাও কোনো গ্রাম নেই, কুকুরের ডাক নেই, ঝিঁঝিঁও যেন থেমে গেছে।
হারিকেনটা নিভে গেল হঠাৎ, বাতাস ছাড়াই।
রহমত দোয়া-দরুদ পড়তে পড়তে হাঁটতে থাকল। কতক্ষণ হাঁটল জানে না। তারপর দূরে, মাঠের ঠিক মাঝখানে, সে দেখল আলো। অনেকগুলো ছোট ছোট আলো, কুপির মতো, সারি সারি জ্বলছে।
হাট।
এত রাতে, এই জনমানবহীন মাঠে, হাট বসেছে।
যারা মুখ তোলে না
কাছে গিয়ে রহমতের প্রথম যেটা অদ্ভুত লাগল, সেটা নীরবতা। হাটে শব্দ থাকে — দরদাম, হাঁকডাক, গরুর ডাক, বাচ্চার কান্না। এখানে কিছুই নেই। শুধু কুপির শিখা কাঁপছে, আর বাতাসে ভেজা মাটি আর আগরবাতির মতো একটা ঘন, মিষ্টি গন্ধ।
দোকানিরা বসে আছে চট বিছিয়ে, মাথা নিচু করে। প্রত্যেকের গায়ে মোটা চাদর, মুখ ঢাকা। কেউ রহমতের দিকে তাকাল না। কেউ মুখ তুলল না।
পসরাগুলো সাধারণ। মাটির হাঁড়ি, পিতলের কলসি, শুকনো মাছ, পান-সুপারি, রঙিন কাচের চুড়ি। ক্রেতাও আছে কয়েকজন, তারাও চাদরমোড়া, তারাও নিঃশব্দে আঙুল দেখিয়ে জিনিস নিচ্ছে, আঙুল তুলে দাম বোঝাচ্ছে।
রহমতের ঘাড়ের রোম খাড়া হয়ে গেল। পালানো উচিত, সে জানে। কিন্তু পা চলল না, কারণ ঠিক তখনই সে দেখল একটা চটের ওপর রাখা এক জোড়া রুপার নূপুর।
ছোট্ট নূপুর। বাচ্চার পায়ের মাপের। কুপির আলোয় ঝিকমিক করছে।
ময়নার মুখটা মনে পড়ল।
সে দোকানির সামনে উবু হয়ে বসল। গলা শুকিয়ে কাঠ। “কত?”
দোকানি মাথা তুলল না। চাদরের ভেতর থেকে একটা হাত বেরিয়ে এল — অস্বাভাবিক লম্বা, শুকনো, আঙুলের গাঁটগুলো যেন বাঁশের গিঁট। হাতটা প্রথমে নূপুরের দিকে দেখাল। তারপর ধীরে ধীরে উঠে রহমতের বুকের দিকে ইশারা করল, যেন জিজ্ঞেস করছে — কার জন্য?
রহমত কাঁপা হাতে সাতটা আঙুল দেখাল। “আমার মাইয়া। সাত বছর।”
হাতটা এক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল। তারপর মাটিতে আঙুল দিয়ে একটা দাগ কাটল। রহমত পকেট থেকে একশো টাকার নোট বের করে দিল। দোকানি নোটটা নিল, তারপর মুঠো ভরে কয়েকটা খুচরো পয়সা ফেরত দিল। পয়সাগুলো বরফের মতো ঠান্ডা।
নূপুর জোড়া হাতে নিয়ে রহমত উঠে দাঁড়াল। আর তখনই, পুরো হাটে, প্রত্যেকটা মাথা একসঙ্গে একটুখানি ঘুরে গেল তার দিকে।
কেউ মুখ তুলল না। শুধু ঘুরল।
রহমত দৌড় দিল।
সকালের পকেট
কীভাবে বাড়ি পৌঁছেছিল, রহমত মনে করতে পারে না। ফজরের আজানের সময় তার বউ সালেহা তাকে উঠানে পড়ে থাকতে দেখে চিৎকার করে ওঠে। গায়ে কাদা, লুঙ্গিতে চোরকাঁটা, আর ডান হাতের মুঠো এমন শক্ত করে বন্ধ যে আঙুল ছাড়াতে সালেহার অনেকক্ষণ লাগল।
মুঠোর ভেতরে এক জোড়া রুপার নূপুর।
দুপুরে জ্ঞান ফিরলে রহমত প্রথমে পকেটে হাত দিল। খুচরো পয়সাগুলো নেই। তার জায়গায় কয়েকটা শুকনো পাতা, মচমচে, বাদামি — চাপ দিতেই গুঁড়ো হয়ে ঝরে গেল। তার নিজের পকেটে থাকা বাকি টাকাগুলোও পাতা হয়ে গেছে।
কিন্তু নূপুর জোড়া পাতা হয়নি।
সালেহা সেগুলো বাজারের স্যাকরার কাছে নিয়ে গিয়েছিল। স্যাকরা ঘষে, আগুনে ধরে, অবাক হয়ে বলেছিল, “খাঁটি রুপা, ভাবি। এমন কাজ আইজকাল কেউ করে না। এইটা পুরান জিনিস, অনেক পুরান।”
ময়না নূপুর পেয়ে খুশিতে সারা উঠান নেচে বেড়াল। ঝুমঝুম শব্দে বাড়ি ভরে গেল। জ্বরও যেন পালাল। আর রহমত বসে রইল দাওয়ায়, গায়ে কাঁথা জড়িয়ে, কারণ একটা ঠান্ডা তার হাড়ের ভেতর থেকে কিছুতেই যাচ্ছিল না।
বায়না
তিন দিন পর রহমত গেল গ্রামের সবচেয়ে বুড়ো মানুষ, হাফেজ দাদার কাছে। সব শুনে বুড়ো অনেকক্ষণ তসবি টিপলেন। তারপর বললেন এমন একটা কথা, যেটা রহমত বাকি জীবন ভুলতে পারবে না।
“কোন মাল, দাদা?”
বুড়ো উত্তর দিলেন না। শুধু জিজ্ঞেস করলেন, দোকানি কিছু জানতে চেয়েছিল কি না।
রহমতের মনে পড়ল সেই লম্বা আঙুল। বুকের দিকে ইশারা। কার জন্য? আর সে নিজে সাতটা আঙুল তুলে দেখিয়েছিল।
সেই রাতেই রহমত নূপুর জোড়া ময়নার পা থেকে খুলে নিল। মেয়ে কাঁদল, সে শুনল না। ভোর হওয়ার আগে নূপুর দুটো একটা গামছায় পেঁচিয়ে, ভেতরে একটা ইট বেঁধে, কংস নদীর মাঝখানে ছুড়ে ফেলে দিল। কালো পানি গিলে নিল নিঃশব্দে।
বাড়ি ফিরে সে অনেক দিন পর নিশ্চিন্তে ঘুমাল।
ঘুম ভাঙল সালেহার গলার শব্দে। চিৎকার না — একটা চাপা, ভাঙা শব্দ, যেন কেউ তার গলা টিপে ধরেছে।
ময়না ঘুমিয়ে আছে চৌকিতে, শান্ত, নিশ্বাস পড়ছে ধীরে। তার দুই পায়ে নূপুর জোড়া। ভেজা। নদীর শ্যাওলা লেগে আছে রুপার গায়ে।
আর চৌকির পায়া থেকে দরজা পর্যন্ত, মাটির মেঝেজুড়ে, সারি দিয়ে সাজানো শুকনো পাতা। দরজা পেরিয়ে উঠানে, উঠান পেরিয়ে সোজা মাঠের দিকে। যেন কেউ খুব যত্ন করে পথ চিনিয়ে রেখে গেছে।
রহমত দেয়ালের ক্যালেন্ডারের দিকে তাকাল।
পরের পূর্ণিমা আর ঊনত্রিশ দিন পর।