ছাপাখানার শেষ প্রুফ
বাইশ বছর বন্ধ থাকা বাংলাবাজারের পুরনো ছাপাখানায় প্রতি ভোরে কম্পোজিং স্টিকে সাজানো থাকে একটা শোক সংবাদ। যার নাম ছাপা হয়, সে তখনো বেঁচে।
- ৫ মিনিট
- ০ বার পড়া হয়েছে
নিউ ইস্টার্ন প্রেস
বাংলাবাজারের পেছনে প্যারীদাস রোডের একটা সরু গলি। দুপাশে বাঁধাইখানা, কাগজের গুদাম, আঠা আর পুরনো কালির গন্ধ। গলির শেষ মাথায় একটা জং ধরা শাটার, ওপরে টিনের সাইনবোর্ড — “নিউ ইস্টার্ন প্রেস। স্থাপিত ১৯৫৯।”
বাইশ বছর শাটারটা খোলেনি কেউ।
আরিফ রহমান প্রেসটা কিনলেন প্রায় পানির দরে। বয়স পঁয়ত্রিশ, চারুকলা থেকে পাস করা, ঢাকায় একটা ছোট ডিজাইন স্টুডিও চালান। তাঁর পরিকল্পনা সহজ — পুরনো লেটারপ্রেসে হাতে কম্পোজ করা বিয়ের কার্ড, কবিতার বই, শৌখিন মানুষের জন্য। আজকাল এসবের ভালো বাজার।
শাটার তুলতেই ধুলোর মেঘ। ভেতরে সারি সারি কাঠের কেস, খোপে খোপে সিসার অক্ষর। কোণে একটা লোহার ট্রেডল মেশিন, পায়ে চালানো। আর কম্পোজের টেবিলে, যেন কেউ এক মুহূর্তের জন্য উঠে গেছে, একটা পিতলের কম্পোজিং স্টিক পড়ে আছে। খালি।
পাশের বাঁধাইখানার বুড়ো হাশমত আলী লাঠি ঠুকঠুক করে এসে দাঁড়ালেন দরজায়।
“খুললেন তাইলে।” গলায় খুশি নেই। “নিতাইদা এই টেবিলেই মরছিল। স্টিক হাতে। শেষ যে কাজটা কম্পোজ করতেছিল, কেউ জানে না সেইটা কী। তারপর থেইকা মালিক আর খোলে নাই।”
“কিসের কাজ ছিল?”
“নিতাইদা শেষ বয়সে খালি শোক সংবাদ কম্পোজ করত। পত্রিকার বিজ্ঞাপন, কুলখানির কার্ড, শ্রাদ্ধের চিঠি। কইত, মরা মানুষের নামে ভুল বানান রাখতে নাই, বাবু, তারা শুধরাইতে আসতে পারে না।” হাশমত আলী একটু থামলেন। “মাঝে মাঝে মনে হইত, পত্রিকায় খবর আসার আগেই সে জানত কার কার্ড ছাপা লাগব।”
আরিফ হাসলেন। “ভয় নেই, চাচা। আমি পুরনো জিনিস ভালোবাসি।”
প্রথম প্রুফ
পরদিন সকালে শাটার খুলে আরিফ থমকে দাঁড়ালেন।
কম্পোজিং স্টিকটা আর খালি নেই। তাতে সারি সারি সিসার অক্ষর, নিখুঁতভাবে সাজানো, লাইনের মাঝে পাতলা সিসার পাত। হাতের কাজ — দক্ষ, অভ্যস্ত হাতের।
লেটারপ্রেসের অক্ষর উল্টো, আয়নার মতো। সরাসরি পড়া যায় না। আরিফ স্টিকটা গ্যালিতে নামিয়ে কালি লাগালেন, একটা কাগজ চেপে প্রুফ তুললেন।
আরিফ কাগজটা নিয়ে পাশের দোকানে গেলেন। হাশমত আলী বেঞ্চে বসে চা খাচ্ছিলেন, দিব্যি সুস্থ। প্রুফটা পড়ে তিনি অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর খুব নিচু গলায় বললেন, “এইটা নিতাইদার কম্পোজ। এই ‘স’-এর ভাঙা কোনা আমি চিনি।”
আরিফ ভাবলেন, গলির কোনো ছেলের বদমাশি। তালা বদলালেন সেদিনই।
পরদিন ভোরে হাশমত আলীকে পাওয়া গেল তাঁর বাঁধাইয়ের বেঞ্চে। মাথা সেলাই না করা বইয়ের স্তূপের ওপর রাখা। চোখ খোলা।
দ্বিতীয়, তৃতীয়
নতুন তালার চাবি ছিল শুধু আরিফের কাছে।
তবু পরের সকালে স্টিক আবার ভরা। এবার নাম গলির মোড়ের কাগজের পাইকার হাজি মকবুলের। আরিফ নিজে ছুটে গিয়ে বলেছিলেন, “আজ বাসা থেকে বের হবেন না।” মকবুল সাহেব হেসেছিলেন। সন্ধ্যায় সিঁড়ি থেকে পড়ে গেলেন, নিজের বাসার ভেতরেই।
সেদিন রাতে আরিফ প্রেসে বসে রইলেন। ঘুমাবেন না। দেখবেন কে আসে।
রাত তিনটার দিকে তন্দ্রা এসে গিয়েছিল। চোখ খুললেন একটা শব্দে।
টুক। টুক। টুক।
সিসার অক্ষর কেস থেকে তুলে স্টিকে বসানোর শব্দ। দ্রুত, নিখুঁত ছন্দে। অন্ধকারে কম্পোজের টেবিলের কাছে কিছুই দেখা যাচ্ছে না, অথচ শব্দটা হচ্ছে। একটা বিড়ির গন্ধ ভাসছে বাতাসে। আর কে যেন গুনগুন করছে পুরনো কোনো কীর্তনের সুর।
আরিফ মোবাইলের আলো জ্বাললেন। শব্দ থেমে গেল।
টেবিলে স্টিক ভরা।
এবার তিনি প্রুফ তুলতে হাত কাঁপালেন। কাগজটা গ্যালি থেকে তুলে আলোয় ধরলেন।
“করিবেন।” ভবিষ্যৎ কাল। এই প্রথম।
নিচে, মার্জিনে, প্রুফ রিডারের পুরনো অভ্যাসে লাল কালির ছোট্ট একটা টিক চিহ্ন। যেন কেউ আগেই দেখে নিয়েছে, ভুল নেই। আরিফের মনে পড়ল, গতকাল টেবিলের কোথাও কোনো লাল কালির কলম ছিল না।
আরিফ আর ভাবলেন না। হাতুড়ি দিয়ে স্টিকের অক্ষরগুলো পিটিয়ে চ্যাপ্টা করলেন। কেসগুলো উল্টে দিলেন মেঝেতে, হাজার হাজার সিসার অক্ষর ছড়িয়ে পড়ল ঝনঝন করে। তারপর একটা চটের বস্তায় ভরে, ভোর হওয়ার আগে, সদরঘাটে গিয়ে ছুঁড়ে দিলেন বুড়িগঙ্গার কালো পানিতে।
বাসায় ফিরে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়লেন। আর যাবেন না। কিছুতেই না।
শেষ প্রুফ
ঘুম ভাঙল ট্রেডল মেশিনের শব্দে।
খটাং। খটাং। খটাং।
আরিফ চোখ খুলে দেখলেন, তিনি দাঁড়িয়ে আছেন প্রেসের ভেতর। কম্পোজের টেবিলের সামনে। কখন এসেছেন, কীভাবে এসেছেন, মনে নেই। হাত দুটো কালো কালিতে মাখা, আঙুলের ডগায় সিসার ধূসর দাগ।
মেঝেতে কোনো অক্ষর পড়ে নেই। কেসগুলো সোজা করে রাখা, প্রতিটা খোপ ভরা। যেন কোনোদিন কিছু ঘটেনি।
ট্রেডল মেশিনটা নিজে নিজে চলছে। একেকটা চাপে বেরিয়ে আসছে একেকটা কাগজ। পাশে স্তূপ জমেছে শখানেক।
আরিফ একটা কাগজ তুলে নিলেন। কালি এখনো ভেজা।
সেই শোক সংবাদ। শুধু একটা শব্দ বদলেছে। “করিবেন” নয়।
“করিয়াছেন।”
গলির মাথা থেকে কান্নার শব্দ ভেসে আসছিল। খুব চেনা একটা গলা — তাঁর স্ত্রীর। আর লোকজনের ভিড়, খাটিয়া তোলার শব্দ, কে যেন উঁচু গলায় দোয়া পড়ছে।
আরিফ শাটারের দিকে এগোতে চাইলেন। পা নড়ল না।
তাঁর হাত দুটো উঠে গেল কেসের দিকে। নিজে নিজে। অভ্যস্ত, দক্ষ ভঙ্গিতে আঙুলগুলো খোপ থেকে অক্ষর তুলে স্টিকে বসাতে শুরু করল। টুক। টুক। টুক।
পেছনে, কাঁধের ঠিক ওপরে, বিড়ির গন্ধ মেশানো একটা বুড়ো গলা ফিসফিস করে বলল:
স্টিকে উল্টো অক্ষরে একটা নতুন লাইন জমে উঠছিল। আরিফ আয়নার মতো উল্টো পড়তে শিখে গেছেন ততক্ষণে।
শোক সংবাদ। নিউ ইস্টার্ন প্রেসের নতুন ক্রেতা জনাব—
নামটা তিনি এখনো জানেন না। কিন্তু তাঁর আঙুল জানে।