বাটি চালান
মাতব্বরের বাড়ি থেকে সোনার হার উধাও। গ্রামের সবাই যাকে ডাইনি বলে ভয় পায়, সেই কুসুম বুড়ি মাটিতে পিতলের বাটি রেখে বিড়বিড় করে কিছু পড়ল। বাটি চলতে শুরু করল — কিন্তু কারও ঘরের দিকে নয়।
- ৫ মিনিট
- ০ বার পড়া হয়েছে
হারানো হার
বড় চাচা সিরাজ মাতব্বরের বাড়ি থেকে সোনার হারটা চুরি গেল দাদির চল্লিশার ঠিক দুই দিন পর।
পাঁচ ভরির পুরোনো হার, মোটা বিছের মতো গাঁথুনি, মাঝখানে একটা লাল পাথর। দাদি জোবেদা খাতুন সেটা পরে ছিলেন পঞ্চাশ বছর। মারা যাওয়ার আগের রাতে তিনি চাচাকে কাছে ডেকে কাঁপা গলায় বলেছিলেন, “হারটা বেচবি না, সিরাজ। পারুলের বিয়াতে দিবি। কথা দে।”
চাচা কথা দিয়েছিলেন। আমি নিজের কানে শুনেছি।
আমি নাঈম, রাজশাহী কলেজে পড়ি, দাদির মৃত্যুর খবরে নওগাঁর এই গ্রামে এসেছিলাম। চল্লিশা পর্যন্ত থেকে গিয়েছিলাম। তাই চুরির সকালটা নিজের চোখে দেখেছি।
চাচির চিৎকারে ঘুম ভাঙল। কাঠের সিন্দুক খোলা, তালা অক্ষত, ভেতরে লাল কাপড়ের পুঁটুলি খালি।
সন্দেহ গিয়ে পড়ল প্রথমেই রতনের ওপর। বারো বছরের ছেলে, বাড়ির কাজের মহিলা আছিয়া খালার একমাত্র ছেলে। সে-ই আগের দিন সিন্দুকের ঘর ঝাঁট দিয়েছিল। চাচা উঠানে দাঁড়িয়ে গর্জন করলেন, “আইজ সন্ধ্যার মধ্যে হার না পাইলে থানায় দিমু।”
রতন কাঁদছিল। আছিয়া খালা চাচার পা জড়িয়ে ধরে বলছিলেন, তাঁর ছেলে চোর না।
তখন গ্রামের কয়েকজন মুরুব্বি একটা প্রস্তাব দিলেন। থানা-পুলিশের আগে একবার বাটি চালান দেওয়া হোক।
আর বাটি চালান দিতে পারে এই তল্লাটে একজনই।
কুসুম বুড়ি
কুসুম বুড়ি থাকে গ্রামের একেবারে শেষে, বাঁশঝাড়ের ওপারে, একা একটা খড়ের ঘরে। কত বয়স কেউ জানে না। ছোটবেলায় আমরা তার ঘরের দিক দিয়ে যেতাম না। লোকে বলে, তার দৃষ্টি পড়লে গাইয়ের দুধ শুকিয়ে যায়, তার ছায়া মাড়ালে জ্বর আসে। সামনে কেউ কিছু বলে না, পেছনে সবাই বলে — ডাইনি।
সে এল বিকেলে। কুঁজো শরীর, সাদা থান, হাতে একটা কালচে পিতলের বাটি। উঠানে পা দিয়েই সে থমকে দাঁড়াল, নাক কুঁচকে বাতাস শুঁকল, যেন কোনো গন্ধ পেয়েছে।
তারপর চাচার দিকে একবার তাকাল। লম্বা, স্থির দৃষ্টি। চাচা চোখ সরিয়ে নিলেন।
উঠানের মাঝখানে কাঠি দিয়ে সে একটা গোল দাগ কাটল। ভেতরে ছিটিয়ে দিল সরিষা আর আতপ চাল। বাটিটা উপুড় করে রাখল দাগের মাঝখানে। তারপর রতনকে ডাকল।
“তুই হাত রাখ।”
ভিড়ের মধ্যে গুঞ্জন উঠল। চোরের হাতেই চালান?
কুসুম বুড়ি দাঁতহীন মুখে হাসল। “বাটি কারো কথা শোনে না, বাপ। যার হাতেই থাকুক, যাইব যেখানে যাওয়ার।”
রতন কাঁপা হাতে বাটির পিঠে দুই তালু রাখল। বুড়ি চোখ বুজে বিড়বিড় করতে লাগল। কোনো ভাষা চিনতে পারলাম না। উঠানে হঠাৎ একটা ঠান্ডা বাতাস ঢুকল, শুকনো পাতা উড়ল, আর আমি স্পষ্ট পেলাম একটা গন্ধ — জর্দা দেওয়া পানের গন্ধ।
দাদির গন্ধ।
বাটিটা নড়ে উঠল।
বাটি যেখানে যায়
প্রথমে একটু কাঁপল, তারপর মাটিতে ঘষা খেতে খেতে এগোতে শুরু করল। রতন তার পেছনে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে ছুটছে, হাত সরাতে পারছে না। পেছনে পুরো গ্রাম।
বাটি উঠান পেরোল। আছিয়া খালার ছোট্ট ঝুপড়ির সামনে দিয়ে গেল।
ভিড় দম বন্ধ করে দাঁড়াল।
বাটি থামল না।
সে চলল পুকুরপাড় দিয়ে, মসজিদের পেছনের রাস্তা দিয়ে, তারপর ধানখেতের আল ধরে। সূর্য ডুবছে। আকাশ তামাটে। বাটির ঘষার শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।
তারপর আমি বুঝতে পারলাম আমরা কোথায় যাচ্ছি। ভিড়ের অনেকেই বুঝল। কয়েকজন পিছিয়ে পড়ল।
গ্রামের কবরস্থান।
বাটি ঢুকল বাঁশের বেড়ার ফাঁক দিয়ে। পুরোনো কবরগুলোর পাশ দিয়ে গেল। তারপর গিয়ে থামল একটা নতুন কবরের পায়ের কাছে। মাটি এখনো আলগা, ওপরে শুকিয়ে যাওয়া খেজুরের ডাল।
দাদির কবর।
কেউ কোনো কথা বলল না। রতন হাত সরিয়ে বসে পড়ল, ফুঁপিয়ে কাঁদছে। চাচির মুখে আঁচল।
কুসুম বুড়ি ধীরে ধীরে কবরের পাশে এসে দাঁড়াল। মাথা নিচু করল, ঠোঁট নড়ল, যেন সালাম দিল। তারপর সবার দিকে ফিরে বলল এমন একটা কথা যা আমি আজও ভুলতে পারি না।
সবার চোখ একসঙ্গে ঘুরে গেল একজনের দিকে।
চাচা দাঁড়িয়ে ছিলেন সবার পেছনে। মুখ ছাইয়ের মতো সাদা।
পানের গন্ধ
সেই রাতে চাচা সব স্বীকার করেছিলেন, শুধু আমার আর চাচির সামনে।
সামনে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন। টাকা লাগবে। চল্লিশার রাতেই তিনি চুপিচুপি সিন্দুক খুলে হারটা বের করেছিলেন, লুকিয়ে রেখেছিলেন ঘরের চালের বাতার ফাঁকে। পরদিন শহরে গিয়ে বেচে দেবেন। রতনের ঘাড়ে দোষ চাপানো সহজ ছিল।
কিন্তু পরদিন সকালে বাতার ফাঁকে হাত দিয়ে দেখেন — কিছু নেই। শুধু হাতে লেগে এসেছিল একটু ভেজা মাটি।
“কবরের মাটির মতো,” চাচা ফিসফিস করে বললেন। তাঁর হাত কাঁপছিল। “ঠান্ডা।”
রতনের কাছে, আছিয়া খালার কাছে চাচা পরদিন মাফ চেয়েছিলেন, পুরো গ্রামের সামনে। মাতব্বরের পক্ষে সেটা সহজ ছিল না।
হারটা পাওয়া গিয়েছিল তার পরের ভোরে।
চাচি চিৎকার করে আমাকে ডেকেছিলেন। চাচা বিছানায় শুয়ে আছেন, চোখ খোলা, সিলিংয়ের দিকে স্থির তাকিয়ে। হারটা তাঁর গলায় পরানো, খুব যত্ন করে, ঠিক যেভাবে দাদি পরতেন। গাঁথুনির ফাঁকে ফাঁকে ঝুরঝুরে মাটি।
আর পুরো ঘরে জর্দা দেওয়া পানের গন্ধ।
চাচা বেঁচে ছিলেন। কিন্তু সেদিনের পর থেকে আর কখনো জোরে কথা বলেননি। নির্বাচনেও দাঁড়াননি। পরের বছর পারুল আপার বিয়েতে হারটা তিনি নিজের হাতে তার গলায় পরিয়ে দিয়েছিলেন। হাত কাঁপছিল।
শুধু একটা কথা আমাকে আজও রাতে জাগিয়ে রাখে।
কুসুম বুড়ির পিতলের বাটিটা সেদিন সন্ধ্যায় কবরস্থানেই পড়ে ছিল। বুড়ি নিয়ে যায়নি। বলেছিল, “ওইটা এখন আর আমার না।”
পরদিন সকালে বাটিটা পাওয়া গিয়েছিল চাচার খাটের নিচে। উপুড় করা।
কে এনেছিল, কেউ জানে না। আর চাচা আজও প্রতি রাতে ঘুমানোর আগে নিচু হয়ে দেখে নেন, বাটিটা ঠিক কোন দিকে মুখ করে আছে।