ইটভাটার আগুন
শীতের রাতে ইটভাটার চুল্লির ওপর বসে মোজাম্মেল দেখল, কাঁচা ইটের সারির ফাঁকে হেঁটে বেড়াচ্ছে আগুনের তৈরি লম্বা মানুষেরা। আর তাদের একজন মুখ ফিরিয়ে তাকাল ঠিক তার দিকে।
- ৫ মিনিট
- ০ বার পড়া হয়েছে
দক্ষিণের ভাটা
অগ্রহায়ণ পড়তেই কুড়িগ্রামের চরে কাজ ফুরিয়ে যায়। ধান ওঠা শেষ, মাঠ ফাঁকা, ঘরে চাল বাড়ন্ত। তখন মোজাম্মেলের মতো জোয়ান ছেলেরা দল বেঁধে ট্রেনে চড়ে দক্ষিণে নামে — ইটভাটায়। ছয় মাসের চুক্তি, আগাম কিছু টাকা সর্দারের হাত দিয়ে বাড়িতে রেখে যাওয়া।
মোজাম্মেলের এবারের ভাটা মানিকগঞ্জে, ধলেশ্বরীর পাড়ে। বিশাল মাঠ, মাঝখানে লম্বা ডিম্বাকার চুল্লি, তার মাথায় আকাশছোঁয়া চিমনি। চারপাশে সারি সারি কাঁচা ইট শুকাচ্ছে, দেখলে মনে হয় মাটির তৈরি এক শহর, যার রাস্তাগুলো সরু আর গলিগুলো অন্ধকার।
প্রথম মাসে সে মাটি ছেনেছে, ছাঁচে ইট কেটেছে। পৌষের শীত নামতেই সর্দার তাকে তুলে দিল রাতের শিফটে — চুল্লির মাথায়, আগুন মিস্ত্রির কাজে।
কাজটা সহজ শোনায়। চুল্লির ছাদে সারি সারি ছোট গর্ত, লোহার ঢাকনা দেওয়া। ঢাকনা সরিয়ে লম্বা হাতায় কয়লা ঢালতে হয় নিচের আগুনে। সারা রাত। পায়ে কাঠের খড়ম, কারণ ছাদের মাটি এত গরম যে খালি পায়ে দাঁড়ালে চামড়া উঠে আসে।
আর ঢাকনা সরালেই নিচে দেখা যায় আগুন। সাদা-হলুদ, গনগনে, জীবন্ত।
এই ভাটার আগুন, সবাই বলে, তিরিশ বছরে একবারও নেভেনি।
অন্য ভাটার শ্রমিকেরা এই ভাটার ইট দেখে ঈর্ষা করে। এমন টকটকে লাল ইট আশেপাশের দশ গ্রামে হয় না, ঠিকাদারেরা আগাম টাকা দিয়ে লাইন ধরে থাকে। তবে মোজাম্মেল একটা জিনিস খেয়াল করেছিল। পুরোনো শ্রমিকেরা রাতে কখনো ইটের সারির দিকে তাকায় না। কাজ শেষ হলে মাথা নিচু করে ঝুপড়িতে ঢুকে যায়, আর দরজার মুখে এক বালতি পানি রেখে দেয়।
ইটের গলিতে
পৌষের এক রাতে, আড়াইটা হবে তখন, কুয়াশা এত ঘন যে চিমনির মাথা দেখা যায় না। মোজাম্মেল চুল্লির ছাদে বসে বিড়ি ধরাচ্ছিল। নিচে, কাঁচা ইটের সারির ফাঁকে, সে একটা আলো দেখল।
প্রথমে ভেবেছিল কেউ হারিকেন নিয়ে হাঁটছে। কিন্তু আলোটা খুব লম্বা। মানুষের চেয়ে লম্বা — দেড় মানুষ, দুই মানুষ সমান। আর আলোটা হাঁটছে।
মোজাম্মেল উঠে দাঁড়াল।
আগুনের তৈরি একটা অবয়ব। মাথা আছে, কাঁধ আছে, লম্বা লম্বা হাত ঝুলছে দুই পাশে। শরীরটা জ্বলছে, কাঁপছে, অথচ ধোঁয়া নেই, শব্দ নেই। সে ধীরে ধীরে ইটের গলি দিয়ে হাঁটছে, আর যে কাঁচা ইটের পাশ দিয়ে যাচ্ছে, সেটা মুহূর্তে লাল হয়ে উঠছে, যেন পোড়ানো হয়ে গেছে।
তারপর পাশের সারি থেকে আরেকটা বেরিয়ে এল। তারপর আরেকটা।
মোজাম্মেল গুনতে চেষ্টা করল। বিশ পর্যন্ত গিয়ে থেমে গেল।
কুয়াশার ভেতর আগুনের মানুষগুলো নিঃশব্দে হাঁটছে, সারি বেঁধে, যেন কাউকে খুঁজছে।
সবচেয়ে সামনেরটা হঠাৎ থামল। মাথাটা ধীরে ধীরে ঘুরল চুল্লির দিকে। ওপরের দিকে।
মোজাম্মেলের দিকে।
মুখ বলতে কিছু নেই, শুধু শিখা। তবু মোজাম্মেল নিশ্চিত জানত — ওটা তাকে দেখছে।
তার হাত থেকে লোহার হাতাটা খসে পড়ল গর্তের ভেতর। নিচ থেকে আগুনের একটা দমকা উঠে এল, আর সেই গর্জনের ভেতর সে শুনল, কিংবা শুনেছে বলে মনে হলো, তার নিজের নাম। পুরো নাম। মোজাম্মেল হক।
যে নাম এই ভাটায় সর্দার ছাড়া কেউ জানে না।
কেরামত সর্দারের খাতা
ভোরে কেরামত সর্দারের ঝুপড়িতে গিয়ে মোজাম্মেল সব বলল। বুড়ো মানুষ, সত্তরের কাছাকাছি বয়স, এই ভাটায় আছেন প্রথম দিন থেকে। সব শুনে তিনি অনেকক্ষণ কথা বললেন না। তারপর টিনের ট্রাঙ্ক খুলে বের করলেন একটা পুরোনো, কালিঝুলি মাখা খাতা।
পাতায় পাতায় নাম। প্রতি মৌসুমে একটা। নামের পাশে লাল কালিতে একই শব্দ: পলাতক।
“এইগুলারে কেউ পালাইতে দেখে নাই,” কেরামত বললেন। “আমি জানি, কারণ আমিই লিখছি।”
তারপর তিনি গল্পটা বললেন।
তিরিশ বছর আগে, যখন বর্তমান মালিকের বাপ এই ভাটা বানান, তখন প্রথম তিন মৌসুম আগুন টিকত না। ইট ফেটে যেত, চুল্লি বসে যেত, দেনায় ডুবে যাচ্ছিলেন তিনি। এক অমাবস্যার রাতে তিনি একা চুল্লির মুখে বসে কার সঙ্গে যেন কথা বলেছিলেন। কেরামত তখন জোয়ান, দূর থেকে দেখেছিলেন — আগুনের ভেতর থেকে কেউ উত্তর দিচ্ছিল।
“ওই যে হাঁটে,” কেরামত বললেন, “ওরা আগের সবাই। খাতার মানুষেরা। নতুন জনরে নিতে আসে।”
মোজাম্মেলের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। “আমারে কী করতে কন, চাচা?”
বুড়ো অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর ট্রাঙ্ক থেকে কয়েকটা দলামোচড়া নোট বের করে তার হাতে গুঁজে দিলেন।
“আইজ রাইতে ভাটার ট্রাক ঢাকা যাইব। উইঠা যা। পিছনে ফিরা চাইস না।” একটু থেমে তিনি যোগ করলেন, “বাঁচবি কিনা জানি না, বাপ। আগুন তো খালি ভাটায় জ্বলে না।”
উঠানের আগুন
মোজাম্মেল পালিয়েছিল। ট্রাকে, তারপর বাসে, তারপর ট্রেনে। তিন দিন পর সে কুড়িগ্রামে নিজের গ্রামে পৌঁছাল — খালি হাতে, চুক্তি ভেঙে, কিন্তু জীবিত।
মা কিছু জিজ্ঞেস করেননি। ছেলে ফিরেছে, এতেই খুশি।
মাঘ মাস। উত্তরের শীত হাড় কাঁপিয়ে দেয়। সন্ধ্যায় মা উঠানে খড়-নাড়া জড়ো করে আগুন জ্বাললেন, যেমন প্রতি শীতে জ্বালান। পাড়ার বাচ্চারা এসে গোল হয়ে বসল আগুন পোহাতে।
মোজাম্মেল একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল।
আগুনটা প্রথমে স্বাভাবিকভাবেই জ্বলছিল। তারপর, কোনো বাতাস ছাড়াই, শিখাটা লম্বা হতে লাগল। খড়ের আগুন এত উঁচু হয় না। এক হাত, দুই হাত, একটা মানুষ সমান।
বাচ্চারা হাততালি দিল।
শিখাটার মাথার কাছটা ধীরে ধীরে গোল হলো। দুই পাশে দুটো লম্বা শিখা ঝুলে পড়ল, হাতের মতো।
তারপর সেটা ঘুরল। মোজাম্মেলের দিকে।
খড় পোড়ার চটচট শব্দের ভেতর থেকে, খুব স্পষ্ট, সে শুনল: মোজাম্মেল হক।
সেই রাতে, অনেক দূরে, ধলেশ্বরীর পাড়ের এক ইটভাটায়, বুড়ো কেরামত সর্দার ঘুম ভেঙে উঠে বসলেন। কেউ তাঁকে ডাকেনি, তবু তিনি জানতেন। হারিকেনের আলোয় তিনি খাতাটা খুললেন, আর মোজাম্মেলের নামের পাশে লাল কালিতে, একটু কাঁপা হাতে, লিখলেন সেই একই শব্দ।
পলাতক।