মূল লেখায় যান

বটতলার পেতনি

শ্রাবণের এক ঝড়ের রাতে হাটফেরত রিকশাচালক মতিন আশ্রয় নিয়েছিল বটতলার পুরোনো ছাউনিতে। সেখানে আগে থেকেই বসে ছিল এক ভেজা শাড়ির বউ—যার পায়ের পাতা উল্টো দিকে ফেরানো।

অঅধীর সেন@adhir
  • ৫ মিনিট
  • ২.৩ হাজার বার পড়া হয়েছে
  • ১৪০ জন পছন্দ করেছেন
বটতলার পেতনি

ঝড়ের রাত

শ্রাবণ মাসের শেষ হাটবার। দিনভর আকাশ গুমোট ছিল, বিকেল থেকে ঝিরঝির বৃষ্টি। মতিন ভেবেছিল সন্ধ্যার আগেই বাড়ি ফিরবে, কিন্তু শেষ মুহূর্তে এক মহাজনের মাল টানার ভাড়া পেয়ে গেল। চারশো টাকা। ঘরে ছেলেটার জ্বর, ওষুধ কিনতে হবে। না করা যায় না।

মাল পৌঁছে দিয়ে যখন সে ফিরছে, তখন রাত দশটা। আর ঠিক তখনই আকাশ ভেঙে পড়ল।

এমন বৃষ্টি মতিন বহুদিন দেখেনি। ঝমঝম নয়, যেন আকাশ থেকে কেউ বালতি উল্টে দিচ্ছে। সঙ্গে দমকা বাতাস, আর থেকে থেকে বিদ্যুতের চমক—এক মুহূর্তের জন্য গোটা পৃথিবী সাদা, তারপর আবার ঘুটঘুটে অন্ধকার। রিকশার হুড উড়ে যাওয়ার জোগাড়।

সামনে কালীতলার মোড়। মোড়ের পাশে বিশাল বটগাছ, আর বটের নিচে একটা টিনের ছাউনি—আগে সেখানে একটা চায়ের দোকান ছিল, এখন পরিত্যক্ত। মতিন রিকশা টেনে সেই ছাউনির নিচে ঢুকল।

গ্রামের কেউ রাতে বটতলায় দাঁড়ায় না। মতিনও জানত। কিন্তু সেই মুহূর্তে বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচা ছাড়া আর কিছু মাথায় ছিল না।


ছাউনির বউ

ছাউনির ভেতর অন্ধকার। মতিন গামছা দিয়ে মুখ মুছছিল, তখন বিদ্যুৎ চমকাল। আর সেই আলোয় সে দেখল, ছাউনির এক কোনায় একজন বসে আছে।

একটা বউ। লাল পাড়ের শাড়ি, পুরো ভেজা। ঘোমটা টানা। হাঁটু মুড়ে বসে, দুই হাতে হাঁটু জড়িয়ে।

মতিন চমকে উঠল, তারপর নিজেকে সামলাল। নিশ্চয়ই কোনো গ্রামের বউ, বৃষ্টিতে আটকা পড়েছে।

"আপা, কোন গ্রামের?"

বউটা উত্তর দিল না। শুধু মাথাটা একটু নাড়ল—পশ্চিম দিকে। শ্মশানঘাটের দিকে।

"এত রাতে একা? বাড়ি পৌঁছাইয়া দিমু? বৃষ্টি কমলে।"

এবার বউটা কথা বলল। গলাটা নাকি সুরে, ভেজা, যেন গলার ভেতর পানি জমে আছে:

মতিনের ঘাড়ের পেছনের লোম দাঁড়িয়ে গেল। পঞ্চাশ বছর? সে ভাবল, হয়তো ভুল শুনেছে। বৃষ্টির শব্দে কত কিছুই তো ভুল শোনা যায়।

আবার বিদ্যুৎ চমকাল।

এবার মতিন বউটার পায়ের দিকে তাকাল। শাড়ির নিচ থেকে দুটো পা বেরিয়ে আছে—খালি পা, ধবধবে সাদা, কাদামাখা।

আর পায়ের পাতা দুটো উল্টো দিকে ফেরানো। গোড়ালি সামনে, আঙুল পেছনে।

কালীতলার মোড়ের বটগাছ—রাতে যার তলায় কেউ দাঁড়ায় না

দাদির কথা

মতিনের দাদি বলতেন, পেতনিদের পা উল্টো থাকে। তারা নাকি সুরে কথা বলে। তারা বেশিরভাগই অল্পবয়সী বউ, যারা অপঘাতে মরেছে, যাদের সাধ-আহ্লাদ অপূর্ণ রয়ে গেছে। তারা মানুষকে ভয় দেখায়, কখনো ঘাড় মটকায়।

কিন্তু দাদি আরেকটা কথাও বলতেন, যেটা বাকিরা বলত না: "সব পেতনি খারাপ না, বাজান। কেউ কেউ খালি দুঃখী। দুঃখী মানুষ যেমন রাগ করে, দুঃখী পেতনিও করে। তাদের ডরাইবি, কিন্তু অসম্মান করবি না।"

মতিন কাঁপা গলায় বলল, "আপনে... কেমনে এইখানে?"

বউটা ঘোমটার ফাঁক দিয়ে তার দিকে তাকাল। মুখটা দেখা গেল না, শুধু দুটো চোখ—লাল, ভেজা, অশ্রুতে টলমল।

"বিয়ার সাত দিন পর বাপের বাড়ি যাইতেছিলাম। নাইওর। পালকিতে। এই বটতলায় ডাকাত পড়ল। বেহারারা পালাইল। আমার গয়না নিল, তারপর..." গলাটা থেমে গেল। "আমারে এই গাছে ঝুলাইয়া রাখল। কেউ নামাইল না তিন দিন। তারপর থিকা আমি এইখানে। বাপের বাড়ি যাওয়া হয় নাই।"

বৃষ্টির শব্দ হঠাৎ দূরে সরে গেল। মতিন শুধু শুনতে পাচ্ছিল নিজের বুকের ধুকপুক।

"তোমার মায়ের বাড়ি কোথায় আছিল?"

"শ্মশানঘাট পার হইয়া, নদীর ওপারে। হরিপুর।"


নাইওর

মতিন জানে না কীসের জোরে সে কথাটা বলল। হয়তো দাদির কথা। হয়তো জ্বরে পুড়তে থাকা নিজের ছেলের মুখ। হয়তো শুধু একটা দুঃখী মানুষের প্রতি আরেক দুঃখী মানুষের টান।

"উঠেন। আমি নিয়া যাই।"

বউটা অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর উঠে দাঁড়াল। রিকশায় উঠে বসল। মতিন লক্ষ করল, রিকশাটা একটুও দেবে গেল না—যেন কেউ ওঠেনি।

বৃষ্টির মধ্যেই সে প্যাডেল মারল। শ্মশানঘাট পার হলো। নদীর ওপর বাঁশের সাঁকো—রিকশা নিয়ে পার হওয়া অসম্ভব, কিন্তু সেই রাতে সাঁকোটা যেন চওড়া হয়ে গিয়েছিল। মতিন পার হয়ে গেল, একবারও পা না নামিয়ে। পরে ভেবে সে নিজেই বুঝতে পারেনি কীভাবে।

হরিপুর গ্রামের শুরুতে একটা ভাঙা ভিটা। দেয়াল ধসে গেছে, উঠানে জঙ্গল। মতিন রিকশা থামাল।

পেছন থেকে বউটার গলা এল, এবার আর নাকি সুর নেই, একেবারে সাধারণ এক তরুণীর গলা, কান্নায় ভাঙা:

"মা, আমি আইছি। নাইওর আইছি।"

মতিন পেছনে তাকাল। রিকশার সিট ফাঁকা। ভেজা। আর সিটের ওপর পড়ে আছে একটা পুরোনো রুপার নূপুর, কালো হয়ে যাওয়া।


মতিন যখন বাড়ি পৌঁছাল, তখন ভোর। বৃষ্টি থেমে গেছে। ঘরে ঢুকে দেখল, ছেলের জ্বর ছেড়েছে। ছেলেটা বসে বসে মুড়ি খাচ্ছে।

মতিনের বউ বলল, "রাইতে একটা আশ্চর্য ব্যাপার হইছে। পোলার জ্বর একশো চারে উঠছিল, আমি ডরে কানতেছিলাম। মাঝরাতে জানালার বাইরে কে জানি আইসা খাড়াইল। একটা বউ, লাল শাড়ি। জানালার শিক দিয়া হাত ঢুকাইয়া পোলার কপালে হাত রাখল। ঠান্ডা হাত। কইল, 'তোমার সোয়ামি আমারে বাড়ি পৌঁছাইয়া দিছে।' তারপর চইলা গেল। আর পোলার জ্বর নামতে শুরু করল।"

মতিন পকেট থেকে নূপুরটা বের করে বউয়ের হাতে দিল। কিছু বলল না।

২.৩ হাজার বার পড়া হয়েছে · প্রকাশ ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এরপর কী পড়বেন

সব দেখুন
ভূতের গল্প

স্কন্ধকাটার শেষ ট্রেন

রাত বারোটার লোকাল ট্রেনে একা এক যাত্রী। প্ল্যাটফর্মের লোকটা হাত নাড়ছে ঠিকই, কিন্তু তার কাঁধের ওপর মাথাটা নেই।

নিনিশাচর রায়হান
  • ১১ মিনিট
  • ২৫ হাজার বার পড়া হয়েছে

৩ জুলাই ২০২৬

সত্য ঘটনা অবলম্বনে

চারতলার ৪১৩ নম্বর রুম

হলের চারতলায় ৪১৩ নম্বর রুমটা বারো বছর ধরে তালাবদ্ধ। নতুন সিট বরাদ্দের তালিকায় হঠাৎ সেই রুমের নাম এল, আর প্রথম রাতেই দরজায় টোকা—ঠিক তিনটা বেজে তেরো মিনিটে।

নিনিশাচর রায়হান
  • ৫ মিনিট
  • ২২ হাজার বার পড়া হয়েছে

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

লোককাহিনি

গেছো ভূতের বাঁশবাগান

গ্রামের শেষ মাথার বাঁশবাগান পেরোলেই স্কুল। সন্ধ্যার পর ওই পথে হাসির শব্দ শোনা যায়, অথচ আশেপাশে কেউ থাকে না।

শ্যাশ্যামল দত্ত
  • ১১ মিনিট
  • ২০ হাজার বার পড়া হয়েছে

১১ জুলাই ২০২৬