বোবায় ধরা
প্রতি রাতে ঠিক তিনটা সাতে রিয়াদের বুকের ওপর কেউ এসে বসে। প্রতি রাতে সে একটু ভারী হয়, তার মুখটা একটু স্পষ্ট হয়। আর একদিন রুমমেট তুহিন বলল, সে-ও দেখেছে।
- ৫ মিনিট
- ০ বার পড়া হয়েছে
প্রথম রাত
প্রথমবার হয়েছিল অক্টোবরের শুরুতে, মিডটার্মের আগের রাতে। আজিমপুরের এক পুরোনো চারতলা মেস, চিলেকোঠার পাশের ঘর। দুটো চৌকি, একটা টেবিল, আর জানালার বাইরে একটা ল্যাম্পপোস্ট।
ঘুম ভাঙল, কিন্তু শরীর ভাঙল না।
চোখ খোলা, ঘরের সবকিছু দেখতে পাচ্ছি—ছাদের ফ্যান ধীরে ঘুরছে, জানালার গ্রিলে রাস্তার হলুদ আলো, পাশের চৌকিতে তুহিনের মশারি। কিন্তু একটা আঙুলও নাড়াতে পারছি না। চিৎকার দিতে চাইলাম, গলা দিয়ে শুধু একটা ঘড়ঘড়ে বাতাস বেরোল।
আর বুকের ওপর কিছু একটা বসে ছিল।
তখনো খুব ভারী না। একটা ভেজা কম্বলের মতো। আকার নেই, মুখ নেই—শুধু অন্ধকারের চেয়ে একটু বেশি গাঢ় একটা পিণ্ড।
মিনিটখানেক পর ছেড়ে দিল। হাঁপাতে হাঁপাতে উঠে বসলাম। মোবাইলে সময় তিনটা সাত।
সকালে তুহিন হেসে উড়িয়ে দিল। “বোবায় ধরছে। আমার নানি কইত, চিত হইয়া ঘুমাইলে ধরে। দোয়া-দরুদ পইড়া কাত হইয়া ঘুমাইস।”
ইন্টারনেট ঘেঁটে জানলাম, এর নাম স্লিপ প্যারালাইসিস। ঘুম আর জাগরণের মাঝখানে মস্তিষ্ক শরীরকে আটকে রাখে, আর চোখ এমন জিনিস দেখে যা আসলে নেই। দুশ্চিন্তা, রাতজাগা, পরীক্ষার চাপ। সব মিলে যায়।
নিশ্চিন্ত হলাম। ব্যাখ্যা থাকলে ভয় কমে যায়।
প্রতি রাতে একটু বেশি
কিন্তু ব্যাখ্যাটা বলেনি, এটা প্রতি রাতে ফিরে আসবে।
আর বলেনি, প্রতি রাতে এর ওজন বাড়বে।
দ্বিতীয় সপ্তাহে বুকের ওপর চাপটা একটা মানুষের মতো হয়ে গেল। হাঁটু দুটো পাঁজরের দুপাশে টের পেতাম। তৃতীয় সপ্তাহে পুরো শ্বাস নিতে পারতাম না, শুধু ছোট ছোট চুমুক। সঙ্গে একটা গন্ধ—পুরোনো তোশকের ভেতরের গন্ধ, ঘাম আর স্যাঁতসেঁতে তুলো।
আর মুখটা।
প্রথমে কিছুই ছিল না। তারপর একদিন চুলের রেখা। তারপর চোয়াল। তারপর এক রাতে দুটো চোখ, ঝুঁকে আছে আমার মুখের ঠিক ওপরে, এক বিঘত দূরে, পলকহীন।
চোখ দুটো চেনা লাগছিল। কোথায় দেখেছি, কিছুতেই মনে করতে পারছিলাম না। সারাদিন অস্বস্তিটা আঠার মতো লেগে থাকত। ক্লাসে মন বসত না, খাবারে স্বাদ পেতাম না।
শেষে এক বড় ভাইয়ের পরামর্শে ঢাকা মেডিকেলের আউটডোরে গেলাম। ডাক্তার মন দিয়ে শুনলেন, প্রেশার মাপলেন, তারপর হেসে বললেন, “ঘুমের রুটিন ঠিক করো, চা-কফি কমাও, মোবাইল দূরে রাখো। এটা খুব কমন।”
“মুখটা যে প্রতি রাতে স্পষ্ট হচ্ছে, সেটাও কমন?”
ডাক্তার একটু থামলেন। “মস্তিষ্ক ফাঁকা জায়গা ভরাট করতে ভালোবাসে। তুমি যত ভাববে, তত স্পষ্ট হবে।”
কথাটা যুক্তিসঙ্গত। তবু ফেরার পথে রিকশায় বসে মনে হচ্ছিল, ডাক্তার ভুল শব্দ বেছেছেন। কেউ ফাঁকা জায়গা ভরাট করছে না। কেউ একটা জায়গা খালি করছে।
আর সেটা সবসময় তিনটা সাতে।
তুহিন যা দেখেছে
এক সকালে তুহিন নাশতার টেবিলে চুপচাপ। পরোটা ছিঁড়ছে, মুখে দিচ্ছে না।
“রাতে পানি খাইতে উঠছিলাম,” শেষে বলল। “তোর চৌকির দিকে চোখ গেল। তোর তোশকটা... বুকের জায়গায় দাবা। যেন কেউ বইসা আছে। কিন্তু কেউ নাই।”
আমি কিছু বললাম না।
“আর নিঃশ্বাসের শব্দ পাইলাম দুইটা। একটা তোর। আরেকটা আরও ধীরে, আরও ভারী।”
দুদিন পর তুহিন বলল, রাতে ও আমাকে চৌকিতে উঠে বসে থাকতে দেখেছে। অন্ধকারে, সোজা হয়ে, ওর দিকে তাকিয়ে। “ডাক দিলাম, তুই কথা কইলি না। খালি চাইয়া থাকলি। হাসতেছিলি মনে হইল।”
আমি কোনোদিন রাতে উঠে বসিনি। বসতে পারি না। ওই সময়টায় আমার শরীর পাথর।
তুহিন সেদিন থেকে বাতি জ্বালিয়ে ঘুমাতে শুরু করল। আমি আপত্তি করিনি। কিন্তু আলোতেও কিছু বদলাল না। বোবায় ধরলে এখন আমি ছাদের চুনকামের দিকে তাকিয়ে থাকি। সেখানে বুকের ওপর বসা ওটার কোনো ছায়া পড়ে না। শুধু আমার নিজের ছায়া—একটু বেশি লম্বা, একটু বেশি ঝুঁকে থাকা।
তুহিন ঠিক করল, ফোনে ভিডিও করবে। সারারাত।
ভিডিও
ভিডিওটা আমরা দেখলাম পরদিন দুপুরে, দরজা বন্ধ করে।
রাত দুটো পর্যন্ত কিছু না। আমি ঘুমাচ্ছি, পাশ ফিরছি। তিনটা পাঁচে চিত হলাম। তিনটা সাতে চোখ খুললাম—স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, চোখ খোলা, শরীর স্থির, বুক দ্রুত ওঠানামা করছে।
বুকের ওপর কিছু নেই।
তারপর আমার শরীরটা উঠে বসল।
না। পুরো শরীর না।
শোয়া আমি শুয়েই আছি, চোখ খোলা, ঠোঁট কাঁপছে। কিন্তু সেই শরীরের ভেতর থেকে আরেকটা আমি ধীরে ধীরে উঠে আসছে—ধোঁয়ার মতো আবছা, যেন একটা ছবির ওপর আরেকটা ছবি। উঠে এসে সে আমার বুকের ওপর হাঁটু গেড়ে বসল। ঝুঁকে পড়ল আমার মুখের ওপর।
তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে সোজা ক্যামেরার দিকে তাকাল।
মুখটা আমার।
এতদিন যে চোখ দুটো চেনা লাগছিল, সেগুলো রোজ সকালে আমি আয়নায় দেখি।
ভিডিওতে কোনো শব্দ ছিল না। কিন্তু ঠোঁট নড়ছিল। তুহিন আর আমি দুজনেই পড়তে পেরেছিলাম।
তুহিন সেদিন বিকেলেই অন্য মেসে চলে যেতে চাইল। পারল না। মাসের মাঝখানে কোথাও সিট খালি নেই।
আজ রাত
আজ রাতে আমার বুকের ওপর কেউ বসেনি।
তিনটা সাতে ঘুম ভাঙল, আর শরীরটা সহজেই উঠে বসল। কোনো চাপ নেই, কোনো ভার নেই। এত হালকা লাগছে, যেন অনেকদিনের বোঝা নামিয়ে রেখেছি।
পানি খেতে উঠলাম। মেঝেটা পায়ের নিচে ঠান্ডা লাগল না। আশ্চর্য, কিছুই লাগল না।
ফেরার পথে চৌকির দিকে চোখ গেল।
চৌকিতে কেউ একজন শুয়ে আছে। চিত হয়ে। চোখ খোলা, বুক হাপরের মতো ওঠানামা করছে, গলা দিয়ে ঘড়ঘড়ে শব্দ বেরোচ্ছে। চোখ দুটো ভয়ে ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। আমার দিকে তাকিয়ে।
ওর মুখটাও আমার।
তুহিন ওপাশের চৌকিতে উঠে বসেছে। ফোনের আলো ফেলেছে আমার মুখে। ওর ঠোঁট কাঁপছে।
“রিয়াদ?” ফিসফিস করে বলল। তারপর চৌকির দিকে তাকাল। তারপর আবার আমার দিকে। “কোনটা... কোনটা তুই?”
আমি হাসলাম।
চৌকির ওপরের ওটার এখন খুব ভারী লাগছে, আমি জানি। বুকের ওপর, হাতে-পায়ে, চোখের পাতায়। প্রতি রাতে একটু বেশি লাগবে।
আমার আর লাগবে না।