মূল লেখায় যান

চারতলার ৪১৩ নম্বর রুম

হলের চারতলায় ৪১৩ নম্বর রুমটা বারো বছর ধরে তালাবদ্ধ। নতুন সিট বরাদ্দের তালিকায় হঠাৎ সেই রুমের নাম এল, আর প্রথম রাতেই দরজায় টোকা—ঠিক তিনটা বেজে তেরো মিনিটে।

নিনিশাচর রায়হান@nishachar
  • ৫ মিনিট
  • ২২ হাজার বার পড়া হয়েছে
  • ১.৫ হাজার জন পছন্দ করেছেন
চারতলার ৪১৩ নম্বর রুম

বরাদ্দ

দ্বিতীয় বর্ষের শুরুতে সাকিব যখন হলের সিট পেল, তখন খুশিতে সে রীতিমতো লাফিয়েছিল। এক বছর গণরুমের মেঝেতে ঘুমিয়েছে, চল্লিশজনের সঙ্গে এক ঘরে। এখন নিজের একটা খাট, নিজের একটা টেবিল।

নোটিশবোর্ডে নামের পাশে লেখা রুম নম্বর দেখে তার খুশি একটু দমে গেল। ৪১৩।

পাশে দাঁড়ানো তার রুমমেট-হতে-যাওয়া ইমন বলল, "এই রুম তো বন্ধ ছিল না? শুনছি বারো বছর কেউ থাকে নাই।"

হলের পুরোনো কর্মচারী মোতালেব চাচা চাবি দেওয়ার সময় অনেকক্ষণ তাদের দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, "প্রোভোস্ট স্যার নতুন আইছেন। উনি পুরান কথা জানেন না। সিটের অভাব, তাই খুইলা দিছেন।"

"পুরান কথা কী, চাচা?"

মোতালেব চাচা শুধু বললেন, "রাত তিনটার পর দরজায় টোকা দিলে খুলবেন না। কেউ যদি নাম ধইরা ডাকে, তাও না।"


প্রথম রাত

রুমটা ছোট, দুটো খাট, দুটো টেবিল, একটা জানালা—জানালা দিয়ে দেখা যায় হলের পেছনের পুকুর আর তার ওপারে পুরোনো কৃষ্ণচূড়া। দেয়ালে বারো বছরের ধুলো। কোনায় একটা ভাঙা বুকশেলফ। আর দরজার পেছনে, প্রায় মুছে যাওয়া মার্কারের দাগে, কেউ একটা লাইন লিখে গিয়েছিল:

"ও ভেতরে আসতে চায় না। ও শুধু চায় কেউ দরজা খুলুক।"

ইমন লেখাটা দেখে হাসল, তারপর ভেজা কাপড় দিয়ে ঘষে মুছে দিল।

রাত একটা পর্যন্ত দুজন গল্প করল, সিনেমা দেখল ল্যাপটপে। তারপর আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ল। করিডোরে টিউবলাইটের ঝিঁঝি শব্দ, কোথাও দূরে কারও গিটার।

সাকিবের ঘুম ভাঙল টোকার শব্দে।

ঠক। ঠক। ঠক।

তিনবার। ধীরে। ভদ্রভাবে, যেন কেউ অনুমতি চাইছে।

সে মোবাইল দেখল। ৩:১৩।

পাশের খাটে ইমনও উঠে বসেছে। অন্ধকারে তার চোখ দুটো সাদা দেখাচ্ছে। দুজনের কেউ কথা বলল না।

আবার—ঠক। ঠক। ঠক।

তারপর দরজার ওপাশ থেকে একটা গলা। তরুণ গলা, ক্লান্ত, একটু হাঁপানো, যেন অনেক দূর থেকে দৌড়ে এসেছে:

ইমন খাট থেকে নামতে যাচ্ছিল। সাকিব তার হাত চেপে ধরল। মোতালেব চাচার কথা।

গলাটা আবার বলল, এবার একটু অধৈর্য: "ভাই, প্লিজ। বাইরে অনেক ঠান্ডা। আমি খালি বইগুলা নিয়া চইলা যাব।"

এটা ছিল আষাঢ় মাস। বাইরে ভ্যাপসা গরম।

দুজন নিঃশব্দে বসে রইল। প্রায় পাঁচ মিনিট পর পায়ের শব্দ করিডোর ধরে দূরে চলে গেল। সিঁড়ির দিকে। তারপর—নিচে নয়, ওপরে। ছাদের দিকে।


বারো বছর আগে

পরদিন সকালে দুজন মোতালেব চাচাকে ধরল। বুড়ো মানুষটা অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে ক্যান্টিনের এক কোনায় নিয়ে গেলেন।

বারো বছর আগে ৪১৩ নম্বর রুমে থাকত রাশেদ নামের এক ছাত্র। ফিজিক্সের, মেধাবী, চুপচাপ। গ্রামের বাড়ি কুড়িগ্রাম, বাবা দিনমজুর। রাশেদ টিউশনি করে নিজের খরচ চালাত, বাড়িতেও টাকা পাঠাত।

এক রাতে টিউশনি থেকে ফিরতে দেরি হয়েছিল। হলের গেট তখন বন্ধ হয়ে যায় রাত এগারোটায়। রাশেদ দারোয়ানকে অনুরোধ করে ঢুকেছিল। চারতলায় উঠে দেখে, রুমের চাবি নেই—কোথাও পড়ে গেছে। তার রুমমেট ভেতরে ছিল। রাশেদ দরজায় টোকা দিয়েছিল। অনেকক্ষণ।

রুমমেট দরজা খোলেনি। কানে হেডফোন ছিল, নাকি ঘুমিয়ে ছিল, নাকি ইচ্ছা করেই খোলেনি—সেটা কেউ কোনোদিন জানতে পারেনি। দুজনের মধ্যে কয়েকদিন ধরে ঝগড়া চলছিল।

রাশেদ তখন ছাদে গিয়েছিল। বর্ষার রাত, ঝড়ো হাওয়া। ছাদে একটা পানির ট্যাংকের পাশে বসে রাত কাটানোর চেষ্টা করেছিল হয়তো। ভোরে তাকে পাওয়া যায় হলের পেছনের পুকুরপাড়ে। ছাদের রেলিং ছিল ভাঙা, নিচু।

পুলিশ বলেছিল দুর্ঘটনা। ময়নাতদন্তে সময় লেখা হয়েছিল—রাত আনুমানিক তিনটা পনেরো।

"তার পরের দুই বছর ওই রুমে যারা আছিল, তারা সবাই টোকা শুনছে," মোতালেব চাচা বললেন। "একজন একবার দরজা খুলছিল।"

"তারপর?"

"বাইরে কেউ আছিল না। কিন্তু পরদিন রাতে সেই ছেলে ঘুমের মধ্যে হাঁইটা ছাদে গেছিল। দারোয়ান রেলিংয়ের কাছ থিকা ধইরা আনছিল। ছেলেটা কইছিল, কে জানি তারে ছাদে ডাকছিল—বলতেছিল, 'চলেন, একসাথে বসি, রাতটা তো কাটাইতে হইব।'"


শেষ টোকা

ইমন সেই সপ্তাহেই রুম বদলে ফেলল। সাকিব থেকে গেল। কেন, সেটা সে নিজেও ভালো করে ব্যাখ্যা করতে পারে না। হয়তো জেদ। হয়তো অন্য কিছু।

প্রতি রাতে টোকা আসত। প্রতি রাতে সাকিব জেগে শুনত। কিছুদিন পর সে লক্ষ করল, গলাটার মধ্যে কোনো রাগ নেই। শুধু ক্লান্তি। আর একটা অসীম একাকিত্ব।

এক রাতে, টোকার পর, সাকিব দরজার কাছে গিয়ে মেঝেতে বসল। দরজা না খুলে। কাঠের ওপর পিঠ দিয়ে।

"রাশেদ ভাই," সে বলল। "আমি দরজা খুলব না। কিন্তু আমি এখানে আছি। আপনি একা না।"

ওপাশে অনেকক্ষণ নীরবতা। তারপর কাঠের ওপাশে একটা ভার পড়ার শব্দ—যেন কেউ দরজায় হেলান দিয়ে বসল। সাকিব স্পষ্ট টের পেল, দরজার কাঠ ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে তার পিঠের কাছে।

সে কথা বলতে থাকল। নিজের গ্রামের কথা, মায়ের কথা, টিউশনির কথা। ভোরের আজান পর্যন্ত।

আজানের সঙ্গে সঙ্গে দরজার ওপাশের ভারটা হালকা হয়ে গেল। আর খুব আস্তে, প্রায় বাতাসের মতো, একটা শব্দ:

তারপর আর কোনোদিন টোকা আসেনি।


সাকিব অনেক খুঁজে সেই রুমমেটের খোঁজ পেয়েছিল। ভদ্রলোক এখন কানাডায় থাকেন, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। সাকিব তাঁকে একটা ইমেইল লিখেছিল, পুরো ঘটনা জানিয়ে।

উত্তর এসেছিল তিন দিন পর। মাত্র এক লাইন:

"বারো বছর ধরে প্রতি রাত তিনটা তেরোয় আমার ঘুম ভাঙে। কারণ আমি জানি, সেদিন রাতে আমি জেগে ছিলাম।"

২২ হাজার বার পড়া হয়েছে · প্রকাশ ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এরপর কী পড়বেন

সব দেখুন
ভূতের গল্প

স্কন্ধকাটার শেষ ট্রেন

রাত বারোটার লোকাল ট্রেনে একা এক যাত্রী। প্ল্যাটফর্মের লোকটা হাত নাড়ছে ঠিকই, কিন্তু তার কাঁধের ওপর মাথাটা নেই।

নিনিশাচর রায়হান
  • ১১ মিনিট
  • ২৫ হাজার বার পড়া হয়েছে

৩ জুলাই ২০২৬

লোককাহিনি

গেছো ভূতের বাঁশবাগান

গ্রামের শেষ মাথার বাঁশবাগান পেরোলেই স্কুল। সন্ধ্যার পর ওই পথে হাসির শব্দ শোনা যায়, অথচ আশেপাশে কেউ থাকে না।

শ্যাশ্যামল দত্ত
  • ১১ মিনিট
  • ২০ হাজার বার পড়া হয়েছে

১১ জুলাই ২০২৬

পরিত্যক্ত বাড়ি

সিরিজ: রাতের বাড়ি · পর্ব ১

রাতের বাড়ি — পর্ব ১

সূত্রাপুরের গলির শেষে দোতলা পুরোনো বাড়ি, ভাড়া আশ্চর্য রকম কম। কেয়ারটেকার শুধু দুটো নিয়ম বলে দিয়েছিল—চিলেকোঠা খুলবেন না, আর রাত তিনটায় কলের পানি বন্ধ করতে যাবেন না।

ততমসী আফরোজ
  • ৫ মিনিট
  • ১৮ হাজার বার পড়া হয়েছে

১৯ জুলাই ২০২৬