পুতুলের বিয়ে
গরমের ছুটিতে নানুবাড়ির মাচার ট্রাংকে পাওয়া গেল জরির টুপি পরা এক বর-পুতুল। খেলার বিয়েতে কবুল বলেছিল তিনজন মেয়ে, কিন্তু শোনা গিয়েছিল চারটে গলা।
- ৬ মিনিট
- ০ বার পড়া হয়েছে
মাচার ওপরের ট্রাংক
সেবার গরমের ছুটিতে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে নানুবাড়ি গিয়েছিল তুলি। বয়স দশ, ঢাকার ফ্ল্যাটে বড় হওয়া মেয়ে। গ্রামের সবকিছুই তার কাছে নতুন — পুকুরঘাটের সবুজ শ্যাওলা, উঠানের কাঁঠালতলা, দুপুরবেলার একটানা ঘুঘুর ডাক।
মামাতো বোন মিতু আর পাশের বাড়ির রুমা মিলে প্রথম দিনেই ঠিক করল, এবার পুতুলের বিয়ে হবে। সত্যিকারের বিয়ের মতো। গায়েহলুদ, বরযাত্রী, কাজি, কবুল — সব।
কনে তুলির। নানু নিজের হাতে বানিয়ে দিয়েছিলেন — পুরনো শাড়ির পাড় কেটে লাল জামা, কাজল দিয়ে আঁকা টানা চোখ, মাথায় কালো সুতোর বেণি। তুলি তার নাম রেখেছিল লালবানু।
সমস্যা হলো বর নিয়ে। মিতুর পুতুলগুলো সব মেয়ে। রুমার একটা প্লাস্টিকের ছেলে পুতুল ছিল, কিন্তু তার একটা হাত নেই, মাথাটাও ঢিলা।
“চল, মাচায় উঠি,” মিতু ফিসফিস করে বলল। “দাদির পুরান ট্রাংকে কত কী আছে।”
দুপুরে বড়রা যখন ঘুমায়, তিনজনে মই বেয়ে উঠল রান্নাঘরের মাচায়। গুমোট গরম, ধুলো, ইঁদুরের গন্ধ। কোণে একটা জং ধরা টিনের ট্রাংক, গায়ে সাদা রঙে লেখা — “মোছাঃ আমেনা খাতুন, ১৯৬২”।
ঢাকনা খুলতেই ন্যাপথলিন আর পুরনো কাপড়ের ভারী গন্ধ। ভাঁজ করা নকশিকাঁথা, পিতলের পানদান, হলদে হয়ে যাওয়া কয়েকটা চিঠি। আর একদম নিচে, একটা সাদা রুমালে যত্ন করে মোড়ানো ছোট্ট একটা পুতুল।
ছেলে পুতুল। কাঠের মাথা, গায়ে খুদে সাদা পাঞ্জাবি, মাথায় জরির টুপি। চোখ দুটো কালো কালিতে আঁকা — এত গাঢ় যে মনে হয় এখনো ভেজা।
রুমালের কোণে লাল সুতোয় সেলাই করা একটা নাম — বাবলু।
“এইটাই বর,” তুলি বলল।
কেন যেন তার মনে হলো, পুতুলটা অনেকক্ষণ ধরে তার দিকেই তাকিয়ে আছে।
কবুল
বিয়ে হলো পরদিন বিকেলে, কাঁঠালতলায়। কলাপাতার প্যান্ডেল, জবাফুলের মালা, এক বাটি মুড়ি আর খেজুর গুড়ের বাতাসা। রুমা হলো কাজি, মিতু বরপক্ষ, তুলি কনের মা।
হলুদ মাখানোর সময় একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল। সারা দুপুর যে বাতাস বাঁশঝাড় দুলিয়ে যাচ্ছিল, হঠাৎ থেমে গেল। কাঁঠাল গাছের কাকগুলো চুপ। চারপাশে একটা ভারী নীরবতা, আর তার ভেতর থেকে ভেসে এল আগরবাতির মতো মিষ্টি, পুরনো একটা গন্ধ।
রুমা কাজির গলা নকল করে বলল, “বলো মা, কবুল।”
তুলি লালবানুর হয়ে মিহি গলায় বলল, “কবুল।”
তারপর বরের পালা। মিতু মুখ খোলার আগেই — তিনজনেই শুনল — খুব সরু, খুব কাছে, একটা ছোট ছেলের গলা:
মিতু পুতুলটা ফেলে দিয়ে পিছিয়ে গেল। রুমা হাসার চেষ্টা করল, “তুই-ই তো কইলি।”
মিতু মাথা নাড়ল। তার ঠোঁট সাদা।
ঠিক তখন উঠানে এলেন নানু। বরের দিকে চোখ পড়তেই তাঁর হাত থেকে পানের বাটা পড়ে গেল মাটিতে।
“এইটা কই পাইছস তোরা?” গলাটা কাঁপছিল। “কে দিছে তোগো এই পুতুল?”
কেউ কোনো উত্তর দিল না। নানু পুতুলটা তুলে নিলেন দুই আঙুলে, যেন আগুনে পোড়া কিছু। তারপর একটাও কথা না বলে ঘরে চলে গেলেন।
তুলি তাকিয়ে দেখল, কলাপাতার ওপর লালবানু একা শুয়ে আছে। তার কাজলের চোখ দুটো ফেরানো ঘরের দিকে — যেদিকে নানু বরকে নিয়ে গেলেন।
বউ যায় শ্বশুরবাড়ি
পরিবর্তনটা শুরু হলো সে রাত থেকেই।
মাঝরাতে মিতুর ঘুম ভেঙে গেল খসখস শব্দে। চৌকির পাশে তুলি নেই। হারিকেনের আলোয় দেখা গেল, তুলি রান্নাঘরের মাচার মইয়ের নিচে দাঁড়িয়ে ওপরের দিকে তাকিয়ে আছে। ঠোঁট নড়ছে।
“কী করিস?”
তুলি ঘাড় না ফিরিয়ে বলল, “বউ তো শ্বশুরবাড়ি গেছে। আমি দেখবার আইছি।”
ঢাকার মেয়ে তুলি কোনোদিন “আইছি” বলে না।
পরদিন সকালে নানু দেখলেন, তুলি বাঁ হাতে ভাত মাখছে। অথচ তুলি ডানহাতি। খাওয়া শেষে থালা সরিয়ে সে নানুর দিকে তাকিয়ে হাসল, তারপর বলল, “বুবু, আমারে একটা কাগজের নাও বানায়া দিবি?”
নানুর হাত থেকে কাঁসার গ্লাস পড়ে ঝনঝন করে উঠল।
“বুবু” — নানুকে এই নামে ডাকার মানুষ এই পৃথিবীতে একজনই ছিল।
সেদিন সন্ধ্যায় নানু মিতু আর রুমাকে কাছে ডাকলেন। হারিকেনের সলতে কমিয়ে দিয়ে, অনেকক্ষণ চুপ থেকে বললেন গল্পটা।
বাবলু তাঁর ছোট ভাই। উনিশশো চৌষট্টি সালের এক আষাঢ় মাসে, আট বছর বয়সে, টাইফয়েডে মারা যায়। মারা যাওয়ার আগের সপ্তাহে সে পাশের বাড়ির এক মেয়ের পুতুলের সাথে নিজের পুতুলের বিয়ে ঠিক করেছিল। নিজের হাতে বরের টুপি বানিয়েছিল জরি কেটে কেটে।
বিয়ের দিন সকালে জ্বর উঠল একশো পাঁচ। বিকেলে সব শেষ।
“মরার আগে খালি কইতেছিল,” নানুর গলা ভেঙে গেল, “‘বুবু, আমার বিয়াটা হইল না।’ মা পুতুলটা রুমালে মুইড়া ট্রাংকে তুইলা রাখছিল। কইছিল, এইটা কেউ খুলবি না। অর বিয়া যার পুতুলের লগে হইব, তার বউ তো শ্বশুরবাড়ি যাইবই।”
তিল
পরদিন ভোরে নানু বাবলুর পুতুলটা নিয়ে গেলেন বাড়ির পেছনের পারিবারিক কবরস্থানে। ছোট্ট কবরটার পাশে গর্ত খুঁড়ে, দোয়া-দরুদ পড়ে, মাটিচাপা দিয়ে এলেন।
দুপুরে মিতু মাচায় উঠল লালবানুকে খুঁজতে। তুলি সকাল থেকে পুতুলটা কোথাও খুঁজে পাচ্ছিল না — অথবা খুঁজছিলই না, শুধু বসে বসে কাগজের নৌকা ভাঁজ করছিল।
ট্রাংকের ঢাকনা আধখোলা।
ভেতরে, সাদা রুমালের ওপর পাশাপাশি শুয়ে আছে দুটো পুতুল। বাবলু আর লালবানু। বরের জরির টুপিতে কাঁচা মাটি লেগে আছে। এখনো ভেজা।
সেদিন বিকেলেই তুলির মা এলেন ঢাকা থেকে, খবর পেয়ে। নানু আর কিছু বলেননি, শুধু বলেছিলেন, “মাইয়াটারে নিয়া যা। আইজই।”
গাড়িতে ওঠার আগে নানু শেষবার তুলির মুখটা দুই হাতে ধরলেন। আর তখনই তাঁর বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।
তুলির বাঁ গালে জন্ম থেকে একটা কালো তিল ছিল। সবাই বলত, লক্ষ্মী তিল।
তিলটা নেই। গাল একদম মসৃণ, ফ্যাকাশে।
নানু ছুটে গেলেন মাচায়। কাঁপা হাতে ট্রাংক খুলে লালবানুকে তুলে নিলেন জানালার আলোয়।
কাপড়ের মুখে কাজলের দুটো চোখ। আর বাঁ গালে, যেখানে আগে কিছুই ছিল না — ছোট্ট, নিখুঁত, একটা কালো তিল।
বাইরে গাড়ির হর্ন বাজল। নানু মাচার ফোকর দিয়ে দেখলেন, তুলি পেছনের কাচে মুখ চেপে বসে আছে। বাঁ হাত তুলে নাড়ছে তাঁর দিকে।
ঠোঁট নড়ল। শব্দ শোনা গেল না, কিন্তু নানু পড়তে পারলেন। ষাট বছর আগে এই একই কথা তিনি শুনেছিলেন, এক আষাঢ়ের বিকেলে।
“বুবু, আবার আমু।”