মেজো চাচার ডায়েরি
বত্রিশ বছর এক ঘরে বন্দি থাকা মেজো চাচার ডায়েরিতে পরিবারের প্রতিটি মৃত্যু লেখা আছে, ঘটার কয়েক দিন আগে। শেষ লেখাটার তারিখ আগামীকাল, আর নামটা তানভীরের নিজের।
- ৫ মিনিট
- ০ বার পড়া হয়েছে
পশ্চিমের ঘর
মেজো চাচা মারা গেলেন বৃহস্পতিবার রাতে। কাউকে কিছু না জানিয়ে, যেভাবে সারা জীবন বেঁচে ছিলেন।
বগুড়ার শেরপুরে আমাদের পুরনো দোতলা বাড়ি। দোতলার পশ্চিমের ঘরটায় তিনি একা থাকতেন — বত্রিশ বছর। বিয়ে করেননি, চাকরি করেননি, নিচে নেমে খেতেও আসতেন না। কাজের লোক খাবারের থালা দরজার বাইরে রেখে যেত, ঘণ্টাখানেক পর খালি থালা ফিরে আসত।
ছোটবেলায় আমরা ভাইবোনেরা তাঁকে ভয় পেতাম। দাদি বলতেন, “আজমলের ঘরের দিকে যাবি না। ওর সামনে নিজের নাম কবি না।”
কেউ কখনো ব্যাখ্যা করেনি, কেন।
দাফনের পর আব্বা আমাকে বললেন ঘরটা গুছিয়ে দিতে। “তুই-ই তো ওর একটু কাছের ছিলি।”
কথাটা সত্যি। চাচা শুধু আমার সাথেই মাঝে মাঝে কথা বলতেন। একবার, আমি তখন বারো, তিনি আমার ডান হাতটা ধরে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলেছিলেন, “তুই আমার মতো লেখার হাত পাইছস, তানভীর। সাবধানে রাখিস।”
তখন ভেবেছিলাম, হাতের লেখার প্রশংসা।
জানাজায় লোক হয়েছিল কম। পাড়ার মুরুব্বিরা কবরস্থান থেকে ফেরার পথে নিচু গলায় কী সব বলাবলি করছিলেন। একজন আমাকে দেখে থেমে গেলেন, তারপর আব্বার কাঁধে হাত রেখে বললেন, “যাক, এখন অন্তত বাড়িটা শান্ত থাকবে।”
কথাটার মানে তখন বুঝিনি।
ঘরটায় ঢুকতেই কেরোসিন আর পুরনো কাগজের গন্ধ। জানালায় কালো কাপড়ের পর্দা, পেরেক দিয়ে আটকানো। টেবিলের ওপর একটা ঝরনা কলম, কালির দোয়াত, আর বাদামি চামড়ায় বাঁধানো মোটা একটা ডায়েরি।
তারিখগুলো
প্রথম পাতাটা খুলেই আমি চেয়ারে বসে পড়লাম।
দাদার মৃত্যুর গল্প আমাদের বাড়িতে সবাই জানে। বারো শ্রাবণ, বৃহস্পতিবার, আসরের নামাজের পর বারান্দার ইজিচেয়ারে। তসবিহটা মেঝেতে পড়ে ছিল, শোকের হুড়োহুড়িতে কেউ খেয়াল করেনি। রাতে দাদি কুড়িয়ে নিয়েছিলেন।
এন্ট্রিটা লেখা তিন দিন আগে।
আমি পাতা ওল্টাতে লাগলাম। আঙুল কাঁপছিল।
ছোট চাচি — পুকুরঘাটের শ্যাওলায় পা পিছলে, মাঘ মাসের এক কুয়াশার ভোরে। ডায়েরিতে লেখা পাঁচ দিন আগে, এমনকি গায়ের লাল শালটার কথাও আছে।
দাদি — ঘুমের মধ্যে, শবে বরাতের রাতে। লেখা এক সপ্তাহ আগে।
তারপর এমন একটা পাতা, যেটা পড়ে আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল।
শিপলু আমার চাচাতো ভাই। আট বছর আগে, নয় মার্চ, মহাস্থানগড়ের মোড়ে ট্রাকের সাথে মোটরসাইকেলের ধাক্কা। আমি নিজে হাসপাতালে গিয়েছিলাম। পুলিশ যখন মোটরসাইকেলটা ফেরত দিল, তখনো লাল হেলমেটটা পেছনের সিটে দড়ি দিয়ে বাঁধা।
এই কথা চাচা জানতেন কী করে? তিনি তো ওই ঘর থেকে বের হতেন না।
আর জানলেনই যদি — কেন কাউকে সাবধান করলেন না?
কালকের তারিখ
শেষ লেখাটা পাওয়া গেল ডায়েরির প্রায় মাঝামাঝি। তারপর বাকি সব পাতা সাদা।
তারিখটা দেখে আমি মোবাইলের ক্যালেন্ডার মিলিয়ে নিলাম। দুবার।
কালকের তারিখ।
কতক্ষণ বসে ছিলাম মনে নেই। বাইরে অন্ধকার নেমে এসেছিল, নিচতলা থেকে আম্মা ভাত খেতে ডাকছিলেন। আমি সাড়া দিইনি।
একটা যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করলাম। চাচা অসুস্থ ছিলেন। হয়তো পুরনো ঘটনাগুলো পরে লিখে আগের তারিখ বসিয়েছেন। হয়তো কেউ তাঁকে খবর এনে দিত। হয়তো—
কিন্তু শিপলুর হেলমেটের কথা পুলিশ আর আমি ছাড়া কেউ জানত না।
ঠিক করলাম, কাল ভোরের বাসে ঢাকা চলে যাব। ছাদে তো দূরের কথা, এই বাড়িতেই থাকব না। মাগরিবের সময় আমি থাকব গাবতলীতে, এখান থেকে দুশো কিলোমিটার দূরে।
ব্যাগ গোছাতে গোছাতে রাত দুটো বাজল। শেষবারের মতো ডায়েরিটা খুললাম, পাতাগুলোর ছবি তুলে রাখব বলে।
ঘরের বাতাস তখন অদ্ভুত রকম ভারী। সিলিং ফ্যানটা ঘুরছিল, কিন্তু গায়ে বাতাস লাগছিল না। ছাদের দিক থেকে একবার মনে হলো, কেউ খালি পায়ে হেঁটে গেল এ মাথা থেকে ও মাথা। তারপর আর কিছু না।
আর তখনই চোখে পড়ল, যা আগে পড়েনি।
লেখার হাত
চাচার সব লেখা ঝরনা কলমের কালো কালিতে, ডানদিকে হেলানো সরু অক্ষরে।
শেষ এন্ট্রিটা নীল বলপয়েন্টে। অক্ষরগুলো গোল, একটু বাঁদিকে ঝোঁকা। “ত”-এর মাথায় একটা বাড়তি টান — যেটা স্কুলে বাংলা স্যার কতবার লাল কালিতে কেটে দিয়েছেন।
এটা আমার হাতের লেখা।
আমি টেবিলের দিকে তাকালাম। আমার নীল বলপয়েন্ট কলমটা, যেটা সারা সন্ধ্যা শার্টের পকেটে ছিল বলে জানতাম, টেবিলের ওপর পড়ে আছে। ঢাকনা খোলা।
ডান হাতের মধ্যমায় নীল কালির দাগ।
মনে পড়ল চাচার কথা — “তুই আমার মতো লেখার হাত পাইছস।” মনে পড়ল, দাদি কেন তাঁর সামনে নাম বলতে মানা করতেন।
চাচা ভবিষ্যৎ দেখতেন না। চাচা লিখতেন। আর যার নাম লিখতেন—
বত্রিশ বছর তিনি নিজেকে একটা ঘরে বন্ধ করে রেখেছিলেন। কারো মুখ দেখতেন না, কারো নাম শুনতেন না, যাতে হাতটা কোনো নাম না পায়। তবু মাঝে মাঝে পেয়ে যেত।
আর মারা যাওয়ার আগে হাতটা খুঁজে নিয়েছে নতুন কাউকে।
শেষ এন্ট্রির নিচে, যেখানে একটু আগেও সাদা ছিল, এখন আরেকটা লাইন। নীল কালি এখনো চকচক করছে।
আমি ডায়েরিটা বন্ধ করলাম। হাতটা মুঠো করে উরুর নিচে চেপে বসে রইলাম, যতক্ষণ না আঙুলে ব্যথা করে।
ভোরের বাস আমি ধরিনি। কেন, জানি না। শুধু জানি, সারাটা দিন ওই পশ্চিমের ঘরে বসে ছিলাম, আর জানালার কালো পর্দার ফাঁক দিয়ে আলো একটু একটু করে কমে আসছিল।
মসজিদ থেকে মাগরিবের আজান ভেসে এল।
ছাদের সিঁড়ির মাথা থেকে, খুব শান্ত, খুব চেনা একটা গলা আমার নাম ধরে ডাকল।
মেজো চাচার গলা।
আমি যাব না। কিছুতেই যাব না।
কিন্তু খেয়াল করলাম, আমার খালি পা দুটো এরই মধ্যে প্রথম ধাপের ঠান্ডা সিমেন্টে।