দিঘির ঘাটের ছায়া
মাগরিবের আজান হচ্ছে, আর শিউলি দাদির নিষেধ অমান্য করে খোলা চুলে নেমে গেল পুরোনো দিঘির কালো পানিতে। তারপর বাড়িতে কবিরাজ আসে, ফিসফাস চলে — কিন্তু আসল প্রশ্নটা কেউ করে না।
- ৫ মিনিট
- ০ বার পড়া হয়েছে
দাদির নিষেধ
আমাদের বাড়ির পেছনের দিঘিটার নাম কেউ জানে না। সবাই বলে ‘বড় দিঘি’। কালো পানি, চারপাশে তাল আর হিজল গাছ, আর পশ্চিম পাড়ে একটা ভাঙা শানবাঁধানো ঘাট — যার শেষ সিঁড়িটা পানির নিচে কোথায় গিয়ে থেমেছে, কেউ বলতে পারে না।
দাদি বলতেন, “মাগরিবের ওয়াক্তে চুল খোলা রাইখা ঘাটে যাইবি না, শিউলি। ওই সময় ওরা পানির তলা থেকে উঠে।”
গ্রামের মহিলারা দুপুরে সেই ঘাটে কাপড় কাচে, বাসন মাজে, গল্প করে। কিন্তু সূর্য হেলে পড়লেই ঘাট খালি। বুড়িরা বলে, বহু বছর আগে এক নতুন বউ সন্ধ্যায় সেখানে গোসলে নেমে আর ওঠেনি, শুধু তার লাল গামছাটা ভেসে উঠেছিল তিন দিন পর। কেউ কেউ বলে, সে ওঠেনি ঠিকই, কিন্তু অন্য কেউ উঠে এসেছিল তার বদলে।
আমি পনেরো বছরের মেয়ে, ক্লাস নাইনে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ি। দাদির কথায় মুখ টিপে হাসতাম।
কিন্তু সেই কার্তিক মাসে আমার হাসার মতো অবস্থা ছিল না। আব্বা আমার বিয়ে ঠিক করেছিলেন। পাত্র বাজারের আড়তদার, বয়স আমার আব্বার কাছাকাছি। আমি কেঁদেছিলাম, আম্মা চুপ করে ছিলেন, আর দাদি শুধু আমার মাথায় হাত বুলিয়েছিলেন, অনেকক্ষণ ধরে, চুলের ভেতর আঙুল চালিয়ে।
তখনই বুদ্ধিটা মাথায় এল।
জিনে-ধরা মেয়েকে কেউ ঘরে তোলে না।
মাগরিবের ঘাট
সেদিন আকাশ ছিল লালচে-বেগুনি। মসজিদ থেকে আজান ভেসে আসছিল। আমি ইচ্ছে করে খোঁপা খুলে দিলাম, তারপর সবার চোখের সামনে দিয়ে হেঁটে গেলাম দিঘির দিকে।
দাদি দাওয়া থেকে ডাকলেন, “শিউলি! ফির্যা আয়!”
আমি ফিরলাম না।
ঘাটের সিঁড়িতে পা দিতেই পানির ঠান্ডা হাড় পর্যন্ত ঢুকে গেল। কার্তিকের পানি এত ঠান্ডা হওয়ার কথা না। আমি গলা পর্যন্ত ডুবলাম। খোলা চুল পানিতে ছড়িয়ে গেল কালো শ্যাওলার মতো।
আর তখনই মনে হলো, পানির নিচে কেউ আমার চুল ধরে আস্তে টানল।
খুব আস্তে। যেভাবে কেউ বেণি করার আগে চুল আঁচড়ায়।
আমি ছিটকে উঠে এলাম। পেছনে ফিরে দেখি পানি স্থির, আয়নার মতো। আর ঘাটের ওপরের সিঁড়িতে, আধো-অন্ধকারে, কেউ একজন বসে আছে।
পলক ফেলতেই দেখি কেউ নেই।
নিজেকে বোঝালাম — ভয়ের চোখ। তারপর পরিকল্পনা মতো ভেজা কাপড়ে বাড়ি ফিরে দাওয়ায় আছড়ে পড়লাম, চোখ উল্টে দিলাম, আর গলা মোটা করে যা মুখে এল বলতে লাগলাম।
কবিরাজ
পরের তিন দিন আমি অভিনয় করলাম। ভাতের থালা ছুড়ে ফেলতাম, রাতে উঠানে বসে একা হাসতাম, আম্মাকে চিনতে না পারার ভান করতাম। আড়তদারের বাড়ি থেকে খবর এল, বিয়ের কথা আপাতত থাক।
আমার বুকের ভেতর একটা গোপন আনন্দ।
শুধু একটা জিনিস বুঝতে পারছিলাম না। প্রতি রাতে, ঘুমের মধ্যে, টের পেতাম কেউ আমার চুলে আঙুল চালাচ্ছে। চোখ খুললে দেখতাম দাদি পাশে শুয়ে আছেন, চোখ বন্ধ, নিশ্বাস ভারী। আর বালিশে আমার ঝরে পড়া চুল একটাও থাকত না।
আব্বা মসজিদের ইমাম সাহেবকে ডেকেছিলেন। তিনি এসে কোরআন তেলাওয়াত করলেন, দোয়া পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে দিলেন। তাঁর শান্ত গলার সামনে আমার অভিনয় করতে লজ্জা লাগছিল, আমি চুপ করে বসে রইলাম। যাওয়ার সময় তিনি আব্বাকে নিচু গলায় বললেন, “মেয়েটার মধ্যে আমি তেমন কিছু দেখি না। তবে ঘরের সবাই আল্লাহর নাম নেবেন, নামাজ ছাড়বেন না।”
পাড়ার লোকের চাপে চতুর্থ দিন এলেন কবিরাজ — পাশের গ্রামের মতিন কবিরাজ, সাদা দাড়ি, হাতে একটা পিতলের থালা আর শুকনো মরিচ।
তিনি আমার সামনে বসে অনেকক্ষণ চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমি চোখ উল্টানোর চেষ্টা করলাম। তিনি আমার কপালে হাত রাখলেন, তারপর সরিয়ে নিলেন, যেন কিছুই পাননি।
তারপর তাঁর চোখ ঘুরে গেল আমার পেছনে।
দাদি সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন, পানের বাটা হাতে।
কবিরাজের মুখ সাদা হয়ে গেল। তিনি থালা গুটিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। আব্বা অবাক হয়ে বললেন, “কী হইল, কবিরাজ সাব?”
কবিরাজ আমার কানের কাছে ঝুঁকে এমন নিচু গলায় বললেন যে শুধু আমি শুনলাম।
তিনি টাকা না নিয়েই চলে গেলেন।
পঞ্চাশ বছরের ঘাট
সে রাতে আমি ঘুমের ভান করে পড়ে রইলাম।
মাঝরাতে দাদি উঠলেন। খুব সাবধানে, শব্দ না করে। দরজার খিল খুলে বেরিয়ে গেলেন।
আমি পিছু নিলাম।
আকাশে চাঁদ ছিল না। দিঘির পানি কালির মতো কালো। দাদি ঘাটের সিঁড়িতে বসে আছেন, পানির দিকে মুখ করে। তাঁর সাদা চুল, যা আমি জীবনে কখনো খোলা দেখিনি, পিঠজুড়ে ছড়ানো। আর তিনি চুল আঁচড়াচ্ছেন — ধীরে, খুব ধীরে।
পানিতে তাঁর ছায়া পড়েছে। কিন্তু ছায়াটা চুল আঁচড়াচ্ছে না।
ছায়াটা মুখ তুলে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।
আমার গলা দিয়ে শব্দ বেরোল না। দাদি পেছন না ফিরেই কথা বললেন। গলাটা দাদির, অথচ দাদির না।
“পঞ্চাশ বছর আগে আমিও তোর মতো মাগরিবের ওয়াক্তে চুল খুইলা নামছিলাম, বইন। আমারও বিয়া ঠিক হইছিল এক বুড়ার লগে।” একটু থেমে তিনি হাসলেন। “তয় আমি অভিনয় করি নাই।”
তিনি চিরুনিটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। দাঁতে জড়িয়ে আছে লম্বা, কালো, ভেজা চুল।
আমার চুল।
“তিন রাইত ধইরা আঁচড়াইতেছি,” পানির ছায়াটা বলল, ঠোঁট না নেড়ে। “এই বুড়া শরীর আর টানে না। নরম চুল লাগে। নতুন শরীর লাগে।”
আমি পেছন ফিরে দৌড় দিলাম। ঘরে ঢুকে খিল দিয়ে আম্মাকে জড়িয়ে ধরে বাকি রাত কাঁপলাম।
সকালে দাদিকে পাওয়া গেল ঘাটের সিঁড়িতে, চোখ বোজা, মুখে অদ্ভুত শান্তি। ইমাম সাহেব জানাজা পড়ালেন। গ্রামের সবাই বলল, ভালো মানুষ ছিলেন, ঘুমের মধ্যেই চলে গেছেন।
আমি কাউকে কিছু বলিনি। আড়তদারের বাড়ি থেকে আর কোনো খবর আসেনি, আসবেও না। জিনে-ধরা মেয়ের বদনাম একবার ছড়ালে আর মোছে না।
শুধু আজকাল মাগরিবের আজান হলে আমার খোঁপা একা একা খুলে যায়। আর আয়নায় তাকালে মনে হয়, আমার চোখ দুটো আমার চেয়ে অনেক বেশি বয়সী।