মূল লেখায় যান

ডাইনির চুলের বেণি

নতুন বউ রুবিনা লক্ষ করে, পাশের বাড়ির জরিনা বুবু সবার চিরুনি থেকে ঝরে পড়া চুল চেয়ে নেয়। তারপর গ্রামে দেখা দিতে থাকে ছোট ছোট কাপড়ের পুতুল, আর মানুষ একে একে অসুখে পড়ে।

রূরূপসী নাহার@ruposhi
  • ৫ মিনিট
  • ০ বার পড়া হয়েছে
ডাইনির চুলের বেণি

নতুন বউ

রুবিনার বিয়ে হয়েছিল ফাল্গুনে, সিরাজগঞ্জের যমুনার পাড়ের এক গ্রামে। স্বামী সোহেল বিয়ের দশ দিনের মাথায় ফিরে গেল মালয়েশিয়ায়, কাজের ভিসা শেষ হওয়ার আগে। বাড়িতে রইল রুবিনা আর তার শাশুড়ি।

শাশুড়ি মানুষটা ভালো। নরম গলা, হাসিমুখ, নতুন বউকে কোনো কাজে হাত লাগাতে দেন না। প্রতি সন্ধ্যায় রুবিনাকে পিঁড়িতে বসিয়ে নিজে তার চুলে নারকেল তেল দিয়ে আঁচড়ে দেন, বলেন, “এত লম্বা চুল, বউ, যত্ন না করলে চলে?”

বাড়ির পাশে, বাঁশের বেড়ার ওপারে, একটা ভাঙাচোরা ঘরে একা থাকে জরিনা বুবু। বিধবা, রোগা, চোখ দুটো কোটরে বসা। প্রথম সকালেই রুবিনা যখন উঠানে বসে চুল আঁচড়াচ্ছিল, জরিনা বেড়ার ফাঁক দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলেছিল, “চিরুনির চুল ফালাইয়ো না, বউ। আমারে দিয়ো।”

গলাটা ছিল ফ্যাসফেসে, প্রায় মিনতির মতো। রুবিনার অস্বস্তি লাগল। কারো ঝরা চুল কেউ চেয়ে নেয়, এমন কথা সে বাপের বাড়িতে কখনো শোনেনি।

রুবিনা অবাক হয়ে কিছু বলার আগেই শাশুড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে এসে তার হাত থেকে চিরুনিটা কেড়ে নিয়েছিলেন।

রাতে তিনি নিচু গলায় বলেছিলেন, “ওর হাতে একটা চুলও দিবা না। চুল দিয়া মানুষ বান্ধা যায়। ওই মাইয়া ডাইনি। পুরা গেরাম জানে।”

তারপর তিনি রুবিনার চিরুনি থেকে চুলগুলো খুঁটে খুঁটে তুলে নিয়েছিলেন, গোল করে পাকিয়ে বলেছিলেন, “এইগুলা আমি চুলায় দিয়া দিমু। তুমিও এমনে পুড়াইবা।”


কাপড়ের পুতুল

চৈত্রের শুরুতে প্রথম পুতুলটা পাওয়া গেল।

মুদি দোকানদার হাশেম চাচার দোকানের পেছনে, কাঁঠাল গাছের গোড়ায়। আঙুলের মাপের একটা কাপড়ের পুতুল, ছেঁড়া লুঙ্গির টুকরো দিয়ে বানানো, গলায় কয়েক গাছি পাকা চুল দিয়ে শক্ত করে প্যাঁচানো। পরদিন থেকে হাশেম চাচা বিছানায়। জ্বর, কাশি, রাতে ঘুমের মধ্যে চিৎকার।

তারপর দক্ষিণপাড়ার রিনার তিন বছরের ছেলেটা। তার বালিশের নিচে পাওয়া গেল ছোট্ট লাল কাপড়ের পুতুল, গলায় নরম, পাতলা, বাচ্চার চুল। ছেলেটা খাওয়া ছেড়ে দিল।

তারপর আরও। ঘরের চালে গোঁজা, পুকুরঘাটের সিঁড়ির ফাঁকে, গোয়ালের খুঁটির নিচে। প্রতিটার গলায় চুল। প্রতিটার পরে কেউ না কেউ অসুখে পড়ে।

গ্রামে ফিসফাস শুরু হলো। আর সেই ফিসফাস উসকে দিতে শাশুড়ির বেশি কিছু বলতে হলো না। পানের বাটা হাতে পাড়ায় বসে শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন — “কার চিরুনির চুল কে জমায়, সবাই তো জানে।”

জরিনা কিন্তু থামেনি। রোজ সকালে সে বেড়ার ধারে এসে দাঁড়াত, কখনো কারো বাড়ির উঠান ঝাঁট দিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে, কখনো এক মুঠো চালের বদলে চিরুনির চুল চেয়ে নিত। লোকে ভয়ে দিত, আবার ভয়েই তার পেছনে থুতু ফেলত। কেউ কেউ তার ঘরের সামনে দিয়ে যাওয়া ছেড়ে দিল।

রুবিনা একটা জিনিস খেয়াল করেছিল, কিন্তু তখন গুরুত্ব দেয়নি। চুল পুড়লে একটা তীব্র, কটু গন্ধ হয়, যা একবার শুঁকলে ভোলা যায় না। শাশুড়ি প্রতি সন্ধ্যায় বলেন চুল চুলায় দিয়েছেন। অথচ এ বাড়ির রান্নাঘরে সে গন্ধ রুবিনা একদিনও পায়নি।


জরিনার ঘর

এক দুপুরে জরিনা হাটে গেল। রুবিনা বেড়া টপকে ঢুকল তার ঘরে।

অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে, মাটির মেঝে। একটা চৌকি, একটা হাঁড়ি, একটা ছেঁড়া জায়নামাজ। আর চালের আড়া থেকে ঝুলছে একটা বেণি।

সাপের মতো মোটা, মেঝে ছুঁইছুঁই লম্বা। কালো, পাকা, বাদামি, লালচে, কোঁকড়া, সোজা — শত শত মানুষের চুল একসঙ্গে গাঁথা। কোথাও কোথাও বাচ্চাদের মিহি চুল।

রুবিনার গা গুলিয়ে উঠল। সে বেণিটা টেনে নামাল, আঁচলে পেঁচাল।

দরজায় ছায়া পড়ল।

জরিনা দাঁড়িয়ে আছে। চিৎকার করল না, তেড়ে এল না। শুধু তার কোটরের চোখ দুটো ভয়ে বড় হয়ে গেল। সে কাছে এসে রুবিনার কবজি চেপে ধরল, আর এমন গলায় ফিসফিস করল যেন দেয়ালেরও কান আছে।

রুবিনা ঝটকা দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিল। দৌড়ে বাড়ি ফিরল। বুক ধড়ফড় করছে। ডাইনিরা তো এভাবেই কথা ঘোরায়, এভাবেই মানুষকে মানুষের বিরুদ্ধে লাগায়।

সে বেণিটা তুলে দিল শাশুড়ির হাতে।

শাশুড়ির চোখ দুটো এক মুহূর্তের জন্য জ্বলে উঠল। তারপর তিনি রুবিনার মাথায় হাত রাখলেন। “লক্ষ্মী বউ আমার। আইজ রাইতেই পুড়ামু।”


চুলার পাশে

মাঝরাতে রুবিনার ঘুম ভাঙল একটা শব্দে। খসখস, খসখস। যেন কেউ খুব ধৈর্য নিয়ে কিছু খুলছে।

রান্নাঘরে কুপি জ্বলছে।

রুবিনা পা টিপে টিপে গিয়ে দরজার ফাঁকে চোখ রাখল।

শাশুড়ি বসে আছেন চুলার পাশে। চুলা নেভানো। কোলের ওপর সেই বেণি, আর তিনি একটা একটা করে চুল খুলছেন, আলাদা করছেন, আঙুলে পেঁচিয়ে মাপছেন। তাঁর সামনে মেঝেতে সারি দিয়ে সাজানো কাপড়ের পুতুল। বিশটা, ত্রিশটা, হয়তো আরও বেশি।

একেবারে শেষের পুতুলটার গায়ে লাল বেনারসির টুকরো। সোনালি জরির পাড়।

রুবিনার বিয়ের শাড়ির আঁচল। গত সপ্তাহে যেটার এক কোনা কাটা অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল, আর শাশুড়ি বলেছিলেন ইঁদুরে কেটেছে।

পুতুলটার গলায় তখনো কিছু বাঁধা হয়নি।

শাশুড়ি পেছন ফিরলেন না। শুধু কোমল, স্নেহভরা গলায় বললেন, “ঘুম ভাঙছে, বউ? আসো, বসো। চুলটা আঁচড়াইয়া দেই।”

পরদিন ভোরে জরিনা বুবুকে তার ঘরে পাওয়া গেল, চৌকিতে শুয়ে, নিথর। গ্রামের লোকে বলল, ডাইনির পাপ ডাইনিকেই খেয়েছে। শাশুড়ি জানাজায় গিয়ে সবার চেয়ে বেশি কাঁদলেন।

রুবিনা এখনো সে বাড়িতেই থাকে। কোথায় যাবে? সোহেল ফোনে বলে, মা তোমাকে খুব ভালোবাসে।

প্রতি সন্ধ্যায় শাশুড়ি তাকে পিঁড়িতে বসিয়ে চুল আঁচড়ে দেন। খুব যত্ন করে, খুব ধীরে।

আর আঁচড়ানো শেষে রুবিনা যখন চিরুনিটা হাতে নেয়, দেখে, তাতে একটা চুলও লেগে নেই।

কখনোই থাকে না।

০ বার পড়া হয়েছে · প্রকাশ ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এরপর কী পড়বেন

সব দেখুন
রহস্য

পদ্মার চরের অচেনা লোক

বানের পানি নামার পর চরের ঘাটে এসে বসে এক অচেনা লোক। সে গ্রামের সবার গোপন কথা জানে, আর জিজ্ঞেস করলে বলে দেয় কার মৃত্যু কোন দিন।

অঅধীর সেন
  • ৫ মিনিট
  • ১ বার পড়া হয়েছে

৪ অক্টোবর ২০২৬

অলৌকিক

ঝড়ের রাতের অতিথি

দশ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের রাতে চরফ্যাশনের এক ঘরের দরজায় কড়া নাড়ল ভেজা এক কিশোর। সবাই দ্বিধায়, শুধু দাদি ছুটে গিয়ে খিল খুললেন—কারণ এই মুখ তিনি চেনেন, বহু বছর আগের এক ঝড়ের রাত থেকে।

অঅধীর সেন
  • ৫ মিনিট
  • ১ বার পড়া হয়েছে

৩ অক্টোবর ২০২৬

পরিত্যক্ত বাড়ি

রূপমহল হলের শেষ শো

তেত্রিশ বছর ধরে তালাবন্ধ মফস্বলের সিনেমা হল। মাঝরাতে নিজে নিজে চালু হয় পোড়া প্রজেক্টর, আর পর্দায় ভেসে ওঠা পুরনো দিনের দর্শকদের ভিড়ে একটা চেনা মুখ।

নিনিশাচর রায়হান
  • ৫ মিনিট
  • ০ বার পড়া হয়েছে

২ অক্টোবর ২০২৬