নীলকুঠির সিঁড়ি
যশোরের পরিত্যক্ত নীলকুঠির মিনারে ওঠার প্যাঁচানো সিঁড়িতে তেত্রিশটা ধাপ। চার বন্ধু গুনে গুনে উঠেছিল। কিন্তু নামার সময় যে-ই গোনে, প্রতিবার একটা করে ধাপ বেশি হয়।
- ৫ মিনিট
- ০ বার পড়া হয়েছে
কপোতাক্ষের পাড়ে
নীলকুঠিটা খুঁজে বের করেছিল মৌ। ইতিহাসে মাস্টার্স করছে, পুরোনো দালানকোঠা দেখলে তার চোখ চকচক করে। যশোরের এক প্রত্যন্ত গ্রামে, কপোতাক্ষের পাড়ে, ঝোপজঙ্গলে ঢাকা একটা ব্রিটিশ আমলের কুঠি। কোনো গাইডবুকে নাম নেই, কোনো সাইনবোর্ড নেই।
আমরা চারজন গিয়েছিলাম — আমি অনিক, মৌ, শুভ আর রিয়াদ। অক্টোবরের শেষ, আকাশ পরিষ্কার, বাতাসে ধানের গন্ধ। যশোর শহর থেকে লোকাল বাসে এক ঘণ্টা, তারপর ভ্যানে আরও চল্লিশ মিনিট কাঁচা রাস্তা। ভ্যানওয়ালা ছেলেটা কুঠির নাম শুনে প্রথমে যেতে চায়নি। শেষে দ্বিগুণ ভাড়ায় রাজি হয়েছিল, তবে শর্ত দিয়েছিল — মাগরিবের আগে ফিরতে হবে, সে তার পরে ওই রাস্তায় থাকবে না।
রিয়াদ সারা রাস্তা ভূতের গল্প বলে মৌকে খেপাচ্ছিল। শুভ ড্রোন নিয়ে এসেছিল, ভিডিও বানাবে। আমি শুধু জানালা দিয়ে তাকিয়ে ছিলাম, আর ভাবছিলাম, এত সুন্দর একটা বিকেল কেন যেন একটু বেশিই নিস্তব্ধ।
কুঠির চৌহদ্দিতে ঢুকতেই একটা অদ্ভুত গন্ধ নাকে এল। টক, পচা, ভারী। মৌ বলল, এখানে একসময় নীলের হাউজ ছিল, বিশাল চৌবাচ্চায় নীলগাছ পচিয়ে রং বের করা হতো। দেড়শো বছর পরেও মাটি সেই গন্ধ ছাড়েনি।
মূল দালানের ছাদ ধসে পড়েছে। দেয়াল ফুঁড়ে বট-অশ্বত্থ। কিন্তু এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে একটা গোল ইটের মিনার, প্রায় অক্ষত। ভেতরে লোহার প্যাঁচানো সিঁড়ি উঠে গেছে ছাদ পর্যন্ত।
কুঠির পাহারাদার বলতে এক বুড়ো, নিজাম চাচা। বাঁশের লাঠি হাতে আমাদের পেছন পেছন ঘুরছিলেন। মিনারের দরজায় এসে তিনি হঠাৎ পথ আটকে দাঁড়ালেন।
“উঠবেন, ওঠেন। তয় একটা কথা। সিঁড়ি গুনবেন না।”
রিয়াদ হেসে উঠল। “কেন চাচা, গুনলে কী হয়?”
বুড়ো উত্তর দিলেন না। শুধু চোখ নামিয়ে সরে দাঁড়ালেন।
তেত্রিশ
অবশ্যই আমরা গুনেছিলাম।
মৌ সবার আগে, জোরে জোরে। প্রতিটা ধাপে লোহার ঠং ঠং শব্দ, মিনারের গোল দেয়ালে প্রতিধ্বনি। ভেতরে আলো কম, ঘুলঘুলি দিয়ে সরু রোদের ফালি এসে পড়ছে। দেয়ালে কালচে-নীল ছোপ, যেন বহুদিন আগে কেউ রঙের বালতি উল্টে দিয়েছিল।
“একত্রিশ, বত্রিশ, তেত্রিশ।”
ছাদ। চারদিকে খোলা মাঠ, দূরে কপোতাক্ষের রুপালি বাঁক। মৌ ফোন বের করে ছবি তুলল, আর বলল গল্পটা। এই মিনার থেকে সাহেব নজর রাখত মাঠে, কোন চাষি নীল বুনছে আর কে বুনছে না। যারা বুনত না, তাদের আনা হতো এই কুঠিতে। মিনারের নিচে নাকি একটা গুদামঘর ছিল। সেখান থেকে অনেকে আর ফেরেনি।
রোদের মধ্যেও আমার গা শিরশির করে উঠল।
শুভ ড্রোন ওড়াতে চেয়েছিল, কিন্তু ড্রোনটা উঠেই কেমন টলমল করে নেমে এল, যেন বাতাসে কিছু ধাক্কা দিচ্ছে। রিমোটের পর্দায় এক মুহূর্তের জন্য দেখা গেল, মিনারের ছায়াটা মাঠের ওপর অস্বাভাবিক লম্বা হয়ে পড়েছে। আমরা কেউ কিছু বললাম না।
নামার সময় রিয়াদ আগে গেল, দুষ্টুমি করে চেঁচিয়ে গুনতে গুনতে। নিচ থেকে তার গলা ভেসে এল, “চৌত্রিশ!”
আমরা হাসলাম। রিয়াদ তো এমনই।
তারপর নামল মৌ। ধীরে, সাবধানে, ঠোঁট নেড়ে গুনতে গুনতে। নিচে পৌঁছে সে চুপ করে রইল। ওপর থেকে আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কত?”
অনেকক্ষণ পর উত্তর এল, “চৌত্রিশ।”
শুভ নামল। “পঁয়ত্রিশ।” এবার তার গলায় কোনো হাসি নেই।
একটা ধাপ বেশি
আমি নামলাম সবার শেষে। এক হাতে রেলিং, প্রতিটা ধাপে পা রেখে থেমে, মনে মনে স্পষ্ট করে গুনে।
এক। দুই। তিন।
বিশের পর থেকে আলো কমে এল। ঘুলঘুলিগুলো কোথায় গেল? ওঠার সময় তো ছিল।
ত্রিশ। একত্রিশ। বত্রিশ। তেত্রিশ।
নিচে মেঝে দেখা যাচ্ছে না।
চৌত্রিশ। পা রাখতেই টের পেলাম ধাপটা ভেজা। ঠান্ডা, পিচ্ছিল। আর সেই টক পচা গন্ধটা হঠাৎ এত তীব্র হয়ে উঠল যে চোখে পানি এসে গেল।
পঁয়ত্রিশ।
ছত্রিশ।
এই ধাপটা লোহার না। নরম। পায়ের তলায় একটু দেবে গেল, যেমন দেবে যায় কাঁধ, কিংবা পিঠ।
আর ঠিক আমার পায়ের নিচ থেকে কেউ খুব আস্তে নিশ্বাস ফেলল।
আমি বাকি ধাপগুলো কীভাবে পেরিয়েছি জানি না। মাটিতে আছড়ে পড়লাম। ওপরে তাকিয়ে দেখি সিঁড়িটা যেমন ছিল তেমনই — শুকনো, মরচে-ধরা, নিরীহ।
শুধু আমার কেডসের তলায় গাঢ় নীল ছোপ।
নিজাম চাচা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমাদের মুখ দেখেই বুঝে গেলেন। লাঠিতে ভর দিয়ে খুব ক্লান্ত গলায় বললেন—
বাহাত্তর
ঢাকায় ফিরে আমরা কেউ ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলিনি। গ্রুপ চ্যাটে শুধু ছবিগুলো পড়ে রইল। মৌ একটা ছবিও পোস্ট করেনি।
কেডস জোড়া আমি তিনবার সাবান দিয়ে ধুয়েছি। নীল দাগ ওঠেনি। শেষে ফেলে দিয়েছি ডাস্টবিনে। কিন্তু পরের কয়েক রাত ঘুমের মধ্যে সেই টক পচা গন্ধটা নাকে আসত, আর মনে হতো খাটের নিচে কেউ খুব ধীরে, খুব সাবধানে নিশ্বাস নিচ্ছে।
আমি থাকি মোহাম্মদপুরে, একটা পুরোনো পাঁচতলা বাড়ির চারতলায়। লিফট নেই। সিঁড়িটা আমার মুখস্থ — বাহাত্তরটা ধাপ। কলেজে ওঠার পর থেকে হাজারবার গুনেছি, অভ্যাসে।
ফেরার দশ দিন পর, রাত বারোটায় লোডশেডিং। ফোনের টর্চ জ্বেলে উঠছি। মাথা ক্লান্ত, আর পুরোনো অভ্যাসে ঠোঁট নিজে থেকেই গুনে যাচ্ছে।
সত্তর। একাত্তর। বাহাত্তর।
আমার দরজা আসেনি।
টর্চটা নিচে নামালাম। সামনে আরও একটা ধাপ। সিমেন্টের ওপর একটা ভেজা পায়ের ছাপ। খালি পা, ফাটা গোড়ালি।
নীল।
আর ঠিক আমার পেছনে, এক ধাপ নিচ থেকে, খুব শান্ত, গ্রামের টানে একটা গলা আমার হয়ে গুনে দিল—
“তিয়াত্তর।”
পকেটে ফোনটা কেঁপে উঠল। গ্রুপ চ্যাটে মৌর মেসেজ, এক লাইনের।
“তোরা কেউ আর সিঁড়ি গুনিস না। আমার বাসার সিঁড়ি আজ সাতটা বেশি।”