অ্যাম্বুলেন্সের পেছনের সিট
রাত দেড়টা, ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক, পেছনে চেইন টানা একটা লাশ। নবীনগর মোড়ে এসে রেডিও নিজে নিজে বন্ধ হয়ে গেল, আর পেছন থেকে কেউ জিজ্ঞেস করল, “ভাই, কয়টা বাজে?”
- ৫ মিনিট
- ০ বার পড়া হয়েছে
রাত দেড়টার কল
লাশ টানতে টানতে মানুষের ভয় থাকে না, ভাই। আমারও ছিল না। লাশ তো লাশই, কাপড়ে মোড়া একটা ভারী জিনিস। জ্যান্ত মানুষরে ডরাইবেন, মরা মানুষ কিছু করে না।
বাইশ বছরে কত লাশ টানছি, হিসাব নাই। লঞ্চডুবির লাশ, আগুনে পোড়া লাশ, একবার ফ্যাক্টরিতে আগুন লাগার পর টানা চার দিন ঘুমাই নাই। লাশের পাশে বইসা ভাত খাইছি, পেছনের স্ট্রেচারে শুইয়া ঘুমাইছি। কোনোদিন কিছু হয় নাই।
এইটা আমি বিশ্বাস করতাম। ওই রাতের আগ পর্যন্ত।
শ্রাবণ মাস, রাত দেড়টা। মেডিকেলের মর্গ থেইকা কল আসল। নবীনগরের কাছে বাসচাপা পড়ছে একটা ছেলে, উনিশ-বিশ বছর বয়স, সাভারের এক গার্মেন্টসে কাজ করত। বাড়ি মানিকগঞ্জের শিবালয়, তেওতার দিকে। পকেটে আইডি কার্ড পাইছে, ওইটা দিয়া ঠিকানা।
সাথে কোনো আত্মীয় নাই। এক চাচাতো ভাই নাকি সকালের বাসে যাইব। কাগজপত্র সব ঠিক, মর্গের লোক কইল, “রাইতেই পৌঁছায়া দেন, মায়ে বইসা আছে।”
লাশটা সাদা ব্যাগে ভইরা পেছনে স্ট্রেচারে শোয়াইলাম। চেইন টাইনা দিলাম মাথা পর্যন্ত। তারপর গাড়ি ছাড়লাম।
পেছন থেকে নিঃশ্বাস
গাবতলী পার হইয়া আমিনবাজার, তারপর হেমায়েতপুর। রাস্তা ফাঁকা, খালি মাঝে মাঝে মালের ট্রাক। বৃষ্টি থামছে কিছুক্ষণ আগে, পিচ ভিজা, হেডলাইটে চকচক করতেছে।
সাভার বাজার পার হওয়ার পর প্রথম শুনলাম।
পেছন থাইকা। খুব আস্তে। লম্বা কইরা শ্বাস টানার শব্দ, তারপর ছাড়ার শব্দ। ঘুমন্ত মানুষ যেমনে শ্বাস নেয়।
আমি ভাবলাম ইঞ্জিনের আওয়াজ। রেডিওটা ছাড়লাম, পুরান দিনের গান।
নবীনগর মোড়ে আইসা — যেইখানে ছেলেটা চাপা পড়ছিল — রেডিও নিজে নিজে বন্ধ হইয়া গেল। আর তখন শব্দটা আর ভুল শোনার উপায় নাই। পরিষ্কার, স্পষ্ট শ্বাস। আর সাথে একটা গোঙানি, যেন কেউ ঘুমের মধ্যে কথা কইতে চাইতেছে।
আমি গাড়ি সাইড করলাম। পেছনের দরজা খুললাম, টর্চ মারলাম।
ব্যাগটা যেমন ছিল তেমনই। চেইন লাগানো। কোনো নড়াচড়া নাই।
খালি একটা জিনিস। ব্যাগের যেইখানে মুখটা থাকার কথা, প্লাস্টিকের ভিতরের দিকে ঝাপসা কুয়াশা জমছে। গোল হইয়া। যেমনে ঠান্ডা কাচে নিঃশ্বাস ফেললে জমে।
আমি দরজা লাগাইয়া দিলাম। দোয়া-দরুদ যা জানি পড়তে পড়তে আবার স্টিয়ারিং ধরলাম। কী করমু কন? মাঝরাস্তায় লাশ ফালায়া তো চইলা যাইতে পারি না। মায়ে বইসা আছে।
“ভাই, কয়টা বাজে?”
ধামরাই পার হওয়ার পর কথা শুরু হইল।
গলাটা ভাঙা, ভিজা, যেন মুখ ভর্তি পানি। আমার সারা শরীর জমে গেল। কিন্তু মুখ দিয়া আপনাআপনি বাইর হইয়া গেল, “আড়াইটা।”
কিছুক্ষণ চুপ। তারপর, “মায় কি জাগনা আছে?”
আমি কিছু কইলাম না। হাত কাঁপতেছিল, স্টিয়ারিং ঘামে পিছলাইতেছিল।
“আমার এক পায়ের স্যান্ডেল রাস্তায় রইয়া গেছে, ভাই। মায় দিছিল ঈদে।”
আমি আয়নার দিকে তাকাইতে চাই নাই। তবু চোখ চইলা গেল। ভিতরের আয়নায় পেছনের অন্ধকারটা দেখা যায়, স্ট্রেচারের সাদা ব্যাগটা আবছা। কিছু নড়ে নাই। কেউ উইঠা বসে নাই।
কিন্তু গাড়ির ভিতরে ঠান্ডা নামতেছিল। শ্রাবণ মাসের গুমট রাত, এসি বন্ধ, অথচ আমার নিঃশ্বাসে ধোঁয়া উঠতেছিল। আর একটা গন্ধ — ভিজা মাটি আর ডিজেলের, রাস্তার পাশে বৃষ্টির পরে যেমন গন্ধ হয়।
“চাচাতো ভাইয়ে কি সকালে আসব? ওর কাছে আমার বেতনের টাকা আছে। মায়েরে দিতে কইয়েন।”
মানিকগঞ্জ শহরের কাছে আইসা গলাটা হঠাৎ জোরে কইল, একদম আমার কানের পাশে, যেন কেউ পেছনের সিট থেইকা সামনে ঝুঁইকা আইছে:
“ভাই, ব্রেক ধরেন! সামনে!”
আমি ব্রেক চাপলাম পুরা জোরে। চাকা পিছলাইয়া গাড়ি থামল। আর ঠিক তখন বাঁকের ওপাশ থাইকা হেডলাইট ছাড়া একটা বালুর ট্রাক রং সাইড দিয়া ছুইটা গেল। আমার গাড়ির বাম্পার থেইকা দুই হাত দূর দিয়া।
আমি অনেকক্ষণ বইসা রইলাম। বুক ধড়ফড় করতেছে।
পেছন থাইকা খুব আস্তে, “আমারে যে চাপা দিছে, সেও এমনে আসছিল।”
তারপর বাকি রাস্তা সে-ই পথ চিনাইল। “বরংগাইলের পরে বামে।” “পুকুরপাড় দিয়া সোজা।” “ওই যে টিনের ঘর, আলো জ্বলতেছে।” আমি ঠিকানা জানতাম না। একটা মোড়েও ভুল হয় নাই।
খালি গাড়ি
উঠানে কুপি হাতে এক মহিলা দাঁড়ায়া আছিল। আমি কিছু কওয়ার আগেই কইল, “আমার রাসেলরে আনছেন? ও খোয়াবে কইছে, আইজ রাইতে আইব।”
লাশ নামাইলাম। কান্নাকাটি, মানুষজন, আমি আর দাঁড়াই নাই। ভোরের আজানের আগে আগে গাড়ি ঘুরাইলাম ঢাকার দিকে। খালি গাড়ি। পেছনে খালি স্ট্রেচার।
তেওতা ছাড়ায়া দুই কিলো আইছি, তখন আবার শুনলাম।
প্রথমে ভাবলাম মনের ভুল। এত রাত জাগা, এত ডর — কান তো ভুল শুনবই। জানালার কাচ নামাইয়া দিলাম, বাইরের ভিজা বাতাস ঢুকুক। ধানক্ষেতের ওপর দিয়া তখন ভোরের আলো একটু একটু ফুটতেছে।
শ্বাস। পেছন থাইকা।
তারপর গলাটা, এবার আর ভাঙা না, কেমন জানি শান্ত:
“ভাই, আমি নামি নাই। মায় এত কান্দে, ওইখানে থাকতে পারলাম না।”
কাচের কুয়াশা
রহমত ভাই — নাম না বললেও দোকানদার তাঁকে এই নামেই ডাকছিল — চায়ের কাপ নামিয়ে রাখলেন। বললেন, “এরপর থেইকা ও আমার লগেই থাকে। নতুন লাশ নিয়া গেলে রাস্তা দেখায়। ট্রাক আসলে আগে কয়। আমি আর ডরাই না।”
তাঁর হাসিটা কেমন যেন ক্লান্ত।
আমি বিশ্বাস করিনি, সত্যি বলতে। শহুরে মানুষের যা হয় — ভেবেছিলাম রাত-জাগা ড্রাইভারের ক্লান্ত মাথার গল্প।
উঠে দাঁড়ানোর সময় চোখ গেল রাস্তার পাশে পার্ক করা তাঁর সাদা অ্যাম্বুলেন্সটার দিকে। আশ্বিনের ভ্যাপসা দুপুর, রোদ ঝাঁ ঝাঁ করছে।
পেছনের কাচটা ঝাপসা। ভেতর থেকে। যেন কেউ খুব কাছে মুখ এনে নিঃশ্বাস ফেলছে।
আর সেই কুয়াশার ওপর, আঙুল দিয়ে লেখা, কাঁচা হাতের অক্ষরে:
ভাই, কয়টা বাজে?