চা-বাগানের বাংলো
শ্রীমঙ্গলের টিলার মাথায় ব্রিটিশ আমলের বাংলো। বর্ষার রাতে ঢাকা দেওয়া গ্রামোফোনে বেজে ওঠে পুরনো ইংরেজি গান, আর চৌকিদার বুধু সন্ধ্যার পর কিছুতেই ভেতরে পা রাখে না।
- ৫ মিনিট
- ০ বার পড়া হয়েছে
টিলার ওপরের বাংলো
শ্রাবণের শেষ সপ্তাহে আমি লাখাইছড়া চা-বাগানে সহকারী ম্যানেজার হয়ে যোগ দিলাম। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে জিপে চল্লিশ মিনিট, তারপর টিলার গা বেয়ে কাদামাখা লাল মাটির রাস্তা। দুপাশে ছাঁটা চা-গাছের সারি, ছায়াগাছের ডালে আটকে থাকা মেঘ, আর সবকিছুর ওপর একটানা ঝুম বৃষ্টি।
আমার থাকার জায়গা বাগানের সবচেয়ে উঁচু টিলার মাথায়, ব্রিটিশ আমলের একটা বাংলো। কাঠের মেঝে, উঁচু ছাদ, চওড়া বারান্দা, ফায়ারপ্লেসের ওপর একটা ধোঁয়াটে আয়না। বড় ম্যানেজার রহমান সাহেব চাবি দিতে দিতে বললেন, “বাংলোটা পুরনো, তবে মজবুত। একটু স্যাঁতসেঁতে, এই যা।”
বাংলোর চৌকিদার বুধু ওঁরাও। ষাটের কাছাকাছি বয়স, শুকনো শরীর, চোখ দুটো সবসময় মাটির দিকে। প্রথম দিনই সে জানিয়ে দিল, সন্ধ্যার পর সে বাংলোর ভেতরে ঢুকবে না। বারান্দার কোণে তার একটা টুল থাকবে, একটা হারিকেন থাকবে, সে ওখানেই বসে পাহারা দেবে।
“ভেতরে কী সমস্যা, বুধু?”
সে উত্তর দিল না। শুধু বলল, “সাহেব, রাতে গান শুনলে উঠবেন না। শুয়ে থাকবেন।”
প্রথম দুই দিন কাটল ব্যস্ততায়। ফ্যাক্টরির হিসাব, সেকশনে সেকশনে ঘোরা, পাতিতোলা মেয়েদের ঝুড়ি ওজন। সন্ধ্যায় বাংলোয় ফিরে দেখতাম, বুধু বারান্দায় হারিকেন জ্বেলে বসে আছে, আর ভেতরের সব ঘরের দরজা সে বাইরে থেকে ভেজিয়ে রেখেছে।
আমি হেসেছিলাম। শহরে বড় হওয়া মানুষ, বাগানের লোকজনের এসব কথা আগেও শুনেছি।
গ্রামোফোন
বসার ঘরের এক কোণে সাদা কাপড়ে ঢাকা একটা জিনিস ছিল। তৃতীয় দিন বিকেলে কৌতূহলে কাপড়টা সরালাম। একটা পুরনো হাতলওয়ালা গ্রামোফোন, পিতলের চোঙটা জায়গায় জায়গায় সবুজ হয়ে গেছে। টার্নটেবিলের ওপর একটা কালো রেকর্ড, তার কাগজের খাপটা পাশে রাখা।
রেকর্ডের লেবেল প্রায় মুছে গেছে। শুধু পড়া যায় একটা ইংরেজি গানের নাম, আর নিচে ছোট অক্ষরে সাল, ১৯৩৮।
আমি হাতল ঘোরালাম না। কেন জানি না, ঘোরাতে ইচ্ছে করল না। কাপড়টা আবার ঢেকে দিলাম।
সেই রাতে বৃষ্টি ছিল প্রবল। বাংলোর ছাদ টালির, তাই শব্দটা ভোঁতা আর গম্ভীর। রাত দুটোর দিকে ঘুম ভাঙল। প্রথমে ভেবেছিলাম বৃষ্টির শব্দ। তারপর বুঝলাম, বৃষ্টির ভেতর দিয়ে আরেকটা শব্দ আসছে।
একটা গান।
খসখসে, অনেক দূর থেকে আসা একটা মেয়েলি গলা, পুরনো দিনের ইংরেজি সুর। থেমে থেমে, যেন কেউ খুব ধীরে হাতল ঘোরাচ্ছে।
আমি বিছানায় শক্ত হয়ে শুয়ে রইলাম। বুধুর কথা মনে পড়ল। তবু শেষে উঠলাম, টর্চ হাতে বসার ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালাম।
ঘর অন্ধকার। গ্রামোফোনের ওপর সাদা কাপড়টা ঠিক আগের মতো ঢাকা। গান থেমে গেছে।
কিন্তু ফায়ারপ্লেসের সামনের পুরনো চামড়ার আরামকেদারাটা আস্তে আস্তে দুলছিল। যেন এইমাত্র কেউ উঠে গেছে।
ঘরে একটা গন্ধ ভাসছিল। পাইপের তামাক আর ভেজা উলের গন্ধ।
আগের সাহেব
পরদিন সকালে বুধুকে চেপে ধরলাম। অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে সে বারান্দার কাঠের রেলিংয়ে আঙুল বোলাতে বোলাতে বলল।
দেশভাগের বছর এ বাংলোয় থাকতেন হার্ডিং সাহেব। বর্ষার এক রাতে তাঁর মেম ম্যালেরিয়ায় মারা যান। তারপর থেকে সাহেব প্রতি রাতে মেমের প্রিয় রেকর্ডটা বাজাতেন, আরামকেদারায় বসে, দরজা বন্ধ করে। এক সকালে বাবুর্চি দরজা ভেঙে দেখে, সাহেব কেদারায় বসে আছেন, চোখ খোলা, রেকর্ড ঘুরছে, কিন্তু কোনো শব্দ নেই।
“সে তো অনেক আগের কথা,” আমি বললাম।
বুধু মাথা নাড়ল। “আপনার আগে ফারুক সাহেব ছিলেন। সাত বছর আগে। তিনিও গান শুনতেন। প্রথমে ভয় পেতেন, তারপর আর পেতেন না। শেষের দিকে সন্ধ্যা হলেই নিজে গিয়ে কেদারায় বসতেন। বলতেন, মেম সাহেব তাঁর জন্য গান গায়।”
“তারপর?”
“এক শ্রাবণের সকালে তাঁকেও ঐ কেদারায় পাওয়া গেল। ডাক্তার বলল হার্ট।”
আমার গায়ে কাঁটা দিল। কারণ কাল রাতে গানটা এত স্পষ্ট ছিল যে পাশের টিলার শ্রমিক লাইন থেকেও শোনা যাওয়ার কথা।
কাগজের খাপ
রহমান সাহেবকে বললাম অন্য কোয়ার্টারে সরিয়ে দিতে। তিনি বললেন, এই বর্ষায় খালি কোয়ার্টার নেই, দুই সপ্তাহ সহ্য করতে হবে। গ্রামোফোনটা সরিয়ে ফেলতে বললাম। বুধু রাজি হলো না, অন্য কোনো শ্রমিকও না। শেষে আমি নিজেই সেটা তুলে স্টোররুমে রেখে তালা দিলাম।
সেই রাতেও গান বাজল।
পরের রাতেও।
অদ্ভুত ব্যাপার, প্রতি রাতে ভয়টা একটু একটু কমছিল। সুরটা এত বিষণ্ণ, এত কোমল, যেন কেউ খুব একা হয়ে কাউকে ডাকছে। পঞ্চম রাতে টের পেলাম, আমি আর বিছানায় শক্ত হয়ে শুয়ে নেই। আমি অপেক্ষা করছি।
সপ্তম রাতে আমি বসার ঘরে গিয়ে আরামকেদারায় বসলাম। কখন উঠেছি, কখন হেঁটে গেছি, মনে নেই। শুধু মনে আছে, ঘরটা খুব ঠান্ডা, ফায়ারপ্লেসে আগুন নেই অথচ মুখের একপাশে আগুনের আঁচের মতো কমলা আলো। আর গানটা আমার ঠিক কানের কাছে, যেন কেউ পেছন থেকে ঝুঁকে গুনগুন করছে।
ভোরে বুধুর চিৎকারে ঘুম ভাঙল। সে বারান্দার জানালা দিয়ে আমাকে দেখছিল, মুখ ছাইয়ের মতো ফ্যাকাশে। আমি কেদারায় বসে আছি, কোলের ওপর সেই রেকর্ডের কাগজের খাপ।
স্টোররুমের তালা তখনও বন্ধ।
শেষ নাম
খাপটা জানালার আলোয় ধরলাম। এতদিন খেয়াল করিনি, তার উল্টো পিঠে কয়েকটা লাইন লেখা। আলাদা আলাদা হাতের লেখা, আলাদা কালি।
শেষ লাইনের কালি তখনও পুরো শুকায়নি। হাতের লেখাটা আমার নিজের।
আমি কখন লিখেছি, মনে নেই।
সেদিনই ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে এসেছি। ঢাকায় ফিরেছি তিন দিন হলো, ইস্তফাপত্র পাঠিয়ে দিয়েছি। ভেবেছিলাম দূরত্বই যথেষ্ট।
শুধু একটা কথা কাউকে বলিনি। আজ রাতে ঢাকায় বৃষ্টি নেমেছে। শ্যামলীর রাস্তার হর্ন, জেনারেটরের গোঙানি, সব ছাপিয়ে খুব দূর থেকে একটা খসখসে মেয়েলি গলা ভেসে আসছে। পাশের ঘরে আম্মা টিভি দেখছেন, তিনি কিছুই শুনছেন না।
শ্রাবণ মাস শেষ হতে আর চার দিন বাকি।
আর আমার ঘরের কোণে, যেখানে কাল রাতেও কিছু ছিল না, এখন একটা পুরনো চামড়ার আরামকেদারা। সেটা আস্তে আস্তে দুলছে।