সিসিটিভির চার নম্বর ক্যামেরা
রাত দুটো চল্লিশে সিঁড়ির ক্যামেরায় দেয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়ায় ভেজা চুলের এক নারী। প্রতি রাতে এক তলা করে নিচে নামে, অথচ সিঁড়িতে গেলে কেউ নেই।
- ৫ মিনিট
- ০ বার পড়া হয়েছে
রাতের শিফট
উত্তরার নীলাচল টাওয়ারে নাইটগার্ডের চাকরিটা পেলাম কার্তিকের শুরুতে। দশতলা আবাসিক ভবন, চল্লিশটা ফ্ল্যাট, গেটের পাশে কাচঘেরা একটা ছোট গার্ডরুম। রাত দশটা থেকে সকাল আটটা পর্যন্ত ডিউটি। বেতন খারাপ না, কুড়িগ্রামে মায়ের ওষুধের টাকা পাঠানোর জন্য যথেষ্ট।
আমার নাম শফিকুল ইসলাম, সবাই শফিক ডাকে। এর আগে গাজীপুরে একটা কারখানার গেটে দুই বছর পাহারা দিয়েছি। রাত জাগা আমার অভ্যাস আছে। অন্ধকার, নির্জনতা, কুকুরের ডাক, এসবে আমার কোনোদিন ভয় লাগেনি।
গার্ডরুমের টেবিলে একটা মনিটর, আট ভাগে ভাগ করা। এক নম্বর গেট, দুই নম্বর পার্কিং, তিন নম্বর লিফটের সামনে। চার নম্বর সিঁড়ি। প্রতি তলার সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ে একটা করে ক্যামেরা, মনিটরের চার নম্বর ঘরে সেগুলো পালা করে আসে, দশ সেকেন্ড করে। দেয়ালে বড় করে তলার নম্বর লেখা, তাই কোন তলা দেখাচ্ছে বোঝা যায়।
ম্যানেজার সাহেব চাবি বুঝিয়ে দিতে দিতে বললেন, আমার আগের গার্ড হারুন হঠাৎ চাকরি ছেড়ে চলে গেছে, বেতনও নেয়নি। “গ্রামের মানুষ, কী মাথায় ঢুকছে কে জানে।”
নয় তলা
প্রথম চার রাত কাটল নির্ঝঞ্ঝাট। বারোটার পর শেষ গাড়িটা পার্কিংয়ে ঢোকে, তারপর পুরো ভবন চুপ। শুধু জেনারেটর রুম থেকে একটা মৃদু গুঞ্জন, আর মাঝে মাঝে মশার কয়েলের ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে মনিটরের নীলচে আলো।
পঞ্চম রাতে প্রথম দেখলাম।
রাত তখন দুটো চল্লিশ। পুরো ভবন ঘুমিয়ে। মনিটরে চার নম্বর ঘরের ছবি বদলাচ্ছে। দশ তলা, খালি। নয় তলা।
নয় তলার ল্যান্ডিংয়ে একজন মহিলা দাঁড়িয়ে আছে।
পিঠ ক্যামেরার দিকে, মুখ দেয়ালের দিকে, দেয়ালের একদম গা ঘেঁষে। পরনে ফিকে সবুজ একটা শাড়ি, লম্বা চুল পিঠ বেয়ে নেমে গেছে, আর চুলগুলো ভেজা, ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ছে মেঝেতে।
দশ সেকেন্ড পর ছবি বদলে আট তলা দেখাল। আমি পাগলের মতো বোতাম টিপে নয় তলায় ফিরিয়ে আনলাম। মহিলা তখনও দাঁড়িয়ে, একচুলও নড়েনি।
টর্চ আর লাঠি নিয়ে লিফটে উঠলাম। নয় তলায় দরজা খুলতেই একটা গন্ধ ধাক্কা দিল। পচা কচুরিপানা আর বদ্ধ ডোবার পানির গন্ধ। ল্যান্ডিং খালি। মেঝে শুকনো।
নিচে ফিরে রেকর্ডিং পিছিয়ে দেখলাম। দেখলাম, লিফট থেকে আমি বেরোচ্ছি, টর্চ ঘোরাচ্ছি, ল্যান্ডিংয়ে দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকাচ্ছি।
আর মহিলাটা পুরো সময় সেখানেই ছিল। আমার থেকে এক হাত দূরে, দেয়ালের দিকে মুখ করে।
আমি তার পাশ দিয়ে হেঁটে গিয়েছিলাম। আমার কাঁধ প্রায় তার ভেজা চুল ছুঁয়ে গিয়েছিল।
হারুনের ফোন
পরের রাতে সে আট তলায়। তার পরের রাতে সাত। প্রতি রাতে ঠিক দুটো চল্লিশে, প্রতি রাতে এক তলা নিচে। একই ভঙ্গি, দেয়ালের দিকে মুখ, ভেজা চুল থেকে পানি পড়ছে। কিন্তু সিঁড়িতে নেমে দেখলে কিছুই নেই, শুধু সেই ডোবার গন্ধ, যেটা পরের দিন দুপুর পর্যন্ত থেকে যায়।
দিনের গার্ড জামাল ভাইকে রেকর্ডিং দেখালাম। তিনি অনেকক্ষণ মনিটরের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, “কই? খালি সিঁড়ি তো।”
সেদিনই ম্যানেজারের খাতা ঘেঁটে হারুনের নম্বর বের করলাম। প্রথম তিনবার সে ফোন ধরল না। চতুর্থবার ধরল, কিন্তু অনেকক্ষণ কিছু বলল না। তারপর ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, “কয় তলায় আছে অহন?”
“ছয়।”
ফোনের ওপাশে লম্বা একটা শ্বাস। হারুন বলল, বিল্ডিংটা যে জমিতে, সেখানে আগে একটা ডোবা ছিল। ভরাট করার আগে এক বর্ষায় সেই ডোবায় এক বউ ডুবেছিল, লাশ পাওয়া যায়নি। কেউ বলে পা পিছলে, কেউ বলে অন্য কিছু। মাটি ভরাট হয়েছে, দালান উঠেছে, কিন্তু সে এখনও ওপর থেকে নিচে নামে।
আমি চাকরি ছাড়তে পারিনি। মায়ের অপারেশনের তারিখ পড়েছে সামনের মাসে, অগ্রিম বেতনটা আগেই নিয়ে ফেলেছি।
নিচতলা
পাঁচ। চার। তিন। দুই।
প্রতিটা সংখ্যা আমি গুনেছি দাঁতে দাঁত চেপে। দিনের বেলা ঘুমাতে পারতাম না। চোখ বুজলেই দেখতাম একটা ভেজা পিঠ, দেয়ালের দিকে ফেরানো, আর মেঝেতে জমতে থাকা পানির ছোট্ট একটা কালো পুকুর।
দোতলার রাতে সে আর পুরোপুরি দেয়ালের দিকে মুখ করে ছিল না। মাথাটা সামান্য ঘোরানো, যেন কাঁধের ওপর দিয়ে নিচের দিকে তাকাচ্ছে। গার্ডরুমের দিকে।
পরের রাতে আমি মনিটরের চার নম্বর ঘরের ওপর খবরের কাগজ সেঁটে দিলাম। গেটের বাতি জ্বেলে দিলাম, রেডিও চালালাম, দোয়া-দরুদ যা জানি পড়তে থাকলাম।
দুটো বাজল। দুটো ত্রিশ।
দুটো চল্লিশে রেডিওর শব্দ হঠাৎ ঘড়ঘড় করে থেমে গেল। গার্ডরুমের বন্ধ কাচঘরে ছড়িয়ে পড়ল সেই গন্ধ। কচুরিপানা। বদ্ধ পানি।
আমি পেছনে তাকালাম না। চোখ রাখলাম মনিটরের এক নম্বর ঘরে, গেটের ক্যামেরায়। সেখান থেকে কাচের ভেতর দিয়ে গার্ডরুমটা দেখা যায়।
দেখলাম, চেয়ারে আমি বসে আছি। আর আমার ঠিক পেছনে, দেয়ালের কোণে, ফিকে সবুজ শাড়ি।
এবার তার মুখ দেয়ালের দিকে নয়। আমার দিকে।
ঘাড়ের পেছনে ঠান্ডা পানির একটা ফোঁটা পড়ল।
দিনের শিফট
সকাল আটটায় জামাল ডিউটিতে এসে গার্ডরুম খালি পেল। চেয়ারটা টেবিল থেকে একটু সরানো, মেঝেতে কয়েক ফোঁটা কাদাপানি। রেজিস্টার খাতায় শফিকের সই রাত দুটো পর্যন্ত, তারপর আর কিছু নেই।
ম্যানেজার রেকর্ডিং পিছিয়ে দেখলেন। গেটের ক্যামেরায় রাত দুটো চল্লিশ পর্যন্ত শফিক চেয়ারে বসা, মাথা নিচু। দুটো একচল্লিশে ছবিটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য ঝিরঝির করে উঠল। ছবি যখন ফিরল, চেয়ার খালি। গেট বন্ধ, তালা ভেতর থেকে লাগানো।
শফিককে আর কোথাও পাওয়া যায়নি। তার ফোন বন্ধ, কুড়িগ্রামের বাড়িতেও সে ফেরেনি।
দুই সপ্তাহ পর নতুন নাইটগার্ড এল, সাতক্ষীরার এক তরুণ ছেলে। প্রথম কয়েক রাত কিছু হলো না।
পঞ্চম রাতে, দুটো চল্লিশে, মনিটরের চার নম্বর ঘরে দশ তলার ল্যান্ডিং ভেসে উঠল।
সেখানে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে, দেয়ালের দিকে মুখ করে। পরনে নীল গার্ডের ইউনিফর্ম, কাঁধে ব্যাজ। ইউনিফর্মটা ভেজা, আর তা থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে মেঝেতে।