স্টুডিওর পুরোনো নেগেটিভ
দাদার বন্ধ স্টুডিওতে পঞ্চাশ বছরের নেগেটিভ স্ক্যান করতে গিয়ে নাভিদ দেখল, প্রতিটি দশকের ছবির পেছনে একই ঝাপসা অবয়ব—আর প্রতিবার সেটা ক্যামেরার একটু বেশি কাছে।
- ৫ মিনিট
- ০ বার পড়া হয়েছে
ছায়ালিপি
দাদা মারা যাওয়ার তিন মাস পর উকিল সাহেব জানালেন, কুষ্টিয়ার থানাপাড়ার স্টুডিওটা দাদা আমার নামে লিখে দিয়ে গেছেন। আর কারও নামে না। শুধু আমার।
‘ছায়ালিপি স্টুডিও’। উনিশ শ আটষট্টি সালে খোলা, দুই হাজার আঠারোতে বন্ধ। পঞ্চাশ বছর।
শাটার তুলতেই ভেতর থেকে একটা পুরোনো গন্ধ বেরিয়ে এল—ফিক্সারের ঝাঁঝ, ভেজা কাগজ আর ধুলো। দেয়ালে বাঁধানো সাদা-কালো ছবি: বিয়ের বর-কনে, বেণি-করা স্কুলের মেয়ে, টুপি-পরা বৃদ্ধ। ঘরের মাঝখানে কাঠের তেপায়ার ওপর দাদার ক্যামেরা, কালো কাপড়ে ঢাকা। পেছনে আঁকা পর্দা—নদী, পালতোলা নৌকা, দূরে একটা গম্বুজ।
ছোটবেলায় ঈদের ছুটিতে এই স্টুডিওতে কত দুপুর কাটিয়েছি। দাদা আমাকে কখনো ক্যামেরার সামনে বসতে দিতেন না। বলতেন, ‘তুই পেছনে থাক, আমার পাশে।’ তখন ভাবতাম, কাজ শেখাতে চান।
আমি ঢাকায় একটা বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কাজ করি। মাথায় প্ল্যান এল—পুরোনো নেগেটিভগুলো স্ক্যান করে একটা আর্কাইভ বানাব। একটা মফস্বল শহরের পঞ্চাশ বছরের মুখ। ভালো একটা প্রজেক্ট হবে।
পেছনের ঘরে টিনের ট্রাঙ্কভর্তি নেগেটিভ। প্রতিটা খামে দাদার গোটা গোটা হাতে লেখা সাল আর তারিখ।
অফিস থেকে দুই সপ্তাহ ছুটি নিলাম।
পেছনের দরজায়
প্রথম চার দিন সব স্বাভাবিক। স্ক্যানারে নেগেটিভ ঢোকাই, স্ক্রিনে উল্টো আলো-ছায়া সোজা হয়ে মানুষ হয়ে ওঠে। কেউ হাসছে, কেউ ভয়ে কাঠ হয়ে বসে আছে, যেন ক্যামেরা একটা বন্দুক।
পঞ্চম দিন, উনিশ শ সত্তরের একটা বিয়ের ছবিতে প্রথম খেয়াল করলাম।
বর-কনের পেছনে, স্টুডিওর পেছনের দরজার ফ্রেমে, একটা ঝাপসা অবয়ব। মানুষের মতো লম্বা, কিন্তু কোনো রেখা স্পষ্ট না। যেন শাটার খোলা থাকতে কেউ খুব দ্রুত হেঁটে গেছে।
লং এক্সপোজারে এমন হয়। পাত্তা দিলাম না।
কিন্তু পরের রোলে আবার। তার পরেরটায়ও। প্রতিটা ছবিতে না, তবে প্রতি বছরে অন্তত কয়েকটায়। সবসময় একই রকম—মুখহীন, ধোঁয়াটে, ধূসর।
সফটওয়্যারে কনট্রাস্ট বাড়ালাম, শার্পনেস বাড়ালাম। কিছুতেই কোনো রেখা ধরা দিল না। মনে হচ্ছিল, ফিল্ম যেন ইচ্ছে করে ওটাকে ঝাপসা রাখছে—যেমন মানুষ কোনো কিছু দেখেও না-দেখার ভান করে।
রাত জেগে বছর ধরে ধরে সাজালাম। তখনই আসল ব্যাপারটা চোখে পড়ল।
আটষট্টি থেকে বাহাত্তর—ওটা দাঁড়িয়ে আছে পেছনের দরজায়। আশির দশকে—আঁকা পর্দার কিনারে। নব্বইয়ে—খদ্দেরদের চেয়ারের ঠিক পেছনে। দুই হাজার দশের পরের ছবিগুলোতে ওটা আর পেছনে নেই। বসে থাকা মানুষের কাঁধের পাশে, প্রায় গা ঘেঁষে।
পঞ্চাশ বছর ধরে ওটা একটু একটু করে এগোচ্ছিল।
ক্যামেরার দিকে।
দাদার খাতা
ট্রাঙ্কের তলায় একটা লাল মলাটের খাতা পেলাম। হিসাবের খাতা ভেবেছিলাম। কিন্তু শেষের পাতাগুলোয় অন্য রকম লেখা, কালি জায়গায় জায়গায় ছড়িয়ে গেছে।
শেষ লেখাটার তারিখ দাদার মৃত্যুর দুই দিন আগের।
ফুপুকে ফোন করে জিজ্ঞেস করলাম, দাদা শেষ দিকে কেমন ছিলেন। ফুপু অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “শেষ কয়েক বছর আব্বা রাতে স্টুডিওতেই থাকতেন। ক্যামেরার পেছনে একটা টুল পেতে বসে থাকতেন, ঘুমাতেন না। জিজ্ঞেস করলে বলতেন, পাহারা দিই।”
“কিসের পাহারা?”
“বলতেন না। শুধু বলতেন, নাভিদ যেন কোনোদিন এই দোকানের তালা না খোলে।”
অথচ দোকানটা দাদা আমার নামেই লিখে দিয়ে গেছেন। নাকি দাদার হাত দিয়ে অন্য কেউ লিখিয়েছে?
খাতাটা বন্ধ করলাম। বাইরে তখন মাঝরাত। থানাপাড়ার রাস্তায় একটা রিকশার ঘণ্টি বাজতে বাজতে মিলিয়ে গেল। স্টুডিওর পুরোনো সিলিং ফ্যানটা ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে ঘুরছিল।
তারপর মনে পড়ল, তিন দিন আগে আমি কী করেছিলাম।
শেষ রোল
আর্কাইভের জন্য একটা ‘আজকের স্টুডিও’ সিরিজ তুলতে চেয়েছিলাম। দাদার ক্যামেরাতেই। আলমারিতে কয়েকটা মেয়াদোত্তীর্ণ ফিল্ম ছিল। একটা রোল ভরে ফাঁকা স্টুডিওর ছবি তুলেছিলাম। তেপায়ায় বসিয়ে, নানা কোণ থেকে।
রোলটা ডার্করুমে ডেভেলপ করে শুকাতে ঝুলিয়ে রেখেছিলাম। দেখা হয়নি।
ডার্করুমটা ছোট, জানালাহীন। দেয়ালে দাদার হাতে লেখা একটা হলদে কাগজ সাঁটা: ‘বাতি জ্বালানোর আগে পেছনটা দেখে নিও।’ ছোটবেলায় ভাবতাম, ফিল্মে আলো লাগার ভয়ে লেখা। আজ প্রথমবার মনে হলো, হয়তো অন্য কোনো কারণে।
লাল বাতি জ্বেলে নেগেটিভের ফালিটা আলোর সামনে ধরলাম।
প্রথম ফ্রেম: চেয়ারের পাশে ঝাপসা অবয়ব।
দশম ফ্রেম: চেয়ার আর ক্যামেরার মাঝামাঝি।
বিশতম: লেন্সের হাত দুয়েক সামনে। এখন আর ধোঁয়ার মতো না। কাঁধের রেখা বোঝা যায়। মাথাটা একটু কাত, যেন কৌতূহলে কিছু দেখছে।
ত্রিশতম: পুরো ফ্রেমজুড়ে শুধু একটা ধূসর মুখের অংশ। এত কাছে যে ফোকাসে আসেনি। কেবল একটা চোখ। খোলা।
আমার হাত কাঁপছিল। শেষ ফ্রেমে আঙুল সরালাম।
ফ্রেমটা প্রায় কালো। এটা স্টুডিওর ছবি না। এটা ডার্করুমের ছবি। লাল বাতি, দড়িতে ঝোলানো ফিল্মের ফালি, আর একজন মানুষ পিঠ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে, হাতে নেগেটিভ তুলে আলোর দিকে দেখছে।
আমি।
ছবিটা তোলা হয়েছে আমার ঠিক পেছন থেকে।
ডার্করুমের দরজায় তখনো ভেতর থেকে ছিটকিনি দেওয়া।
অথচ এই ঘরে আমি কোনোদিন ক্যামেরা আনিনি। আর শেষ ফ্রেমটা আমি তুলিনি—কাউন্টারে একটা বাকি রেখেই রোল খুলে ফেলেছিলাম। স্পষ্ট মনে আছে।
আমি ঘুরে তাকাইনি। তাকানোর দরকার হয়নি।
স্টুডিওর দিক থেকে, যেখানে তেপায়ার ওপর কালো কাপড়ে ঢাকা ক্যামেরাটা দাঁড়িয়ে আছে, খুব চেনা একটা শব্দ এল।
খট।
শাটার পড়ার শব্দ। দাদার ক্যামেরার এই শব্দ আমি ছোটবেলা থেকে চিনি।
ক্যামেরায় এখন কোনো ফিল্ম নেই। আমি নিশ্চিত।
দাদা লিখেছিলেন, ও ছবির ভেতর থেকে বাইরে আসতে চায়। লেখেননি, ও বাইরে এলে ভেতরের জায়গাটা খালি থাকে কি না। কাউকে দিয়ে সেটা ভরতে হয় কি না।
আজ সকালে আয়নায় নিজের মুখটা একটু ঝাপসা দেখলাম। চোখ মুছলাম।
তারপরও।