জমিদারবাড়ির নাচঘর
মুক্তাগাছার এক ভাঙা জমিদারবাড়িতে ছবি তুলতে গিয়েছিল তিন বন্ধু। সন্ধ্যা নামতেই নাচঘরের ঝাড়বাতি দুলে উঠল, আর বহু দূর থেকে ভেসে এল ঘুঙুরের শব্দ—যে ঘুঙুর একশো বছর ধরে থেমে আছে।
- ৫ মিনিট
- ১৭ হাজার বার পড়া হয়েছে
- ১.১ হাজার জন পছন্দ করেছেন
ভাঙা প্রাসাদ
ময়মনসিংহ শহর থেকে ঘণ্টাখানেকের পথ। মূল রাস্তা ছেড়ে একটা সরু ইটের রাস্তা, দুই পাশে গজারি আর শিমুল। রাস্তার শেষে হঠাৎ গাছপালার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসে একটা বিশাল লাল ইটের দালান—তিনতলা, সামনে সারি সারি গ্রিক ধাঁচের থাম, ছাদের কার্নিশে ভাঙা পরির মূর্তি। কোনো পরির মাথা নেই, কোনোটার ডানা।
স্থানীয়রা বলে রায়চৌধুরী বাড়ি। দেশভাগের পর জমিদার পরিবার কলকাতায় চলে গিয়েছিল, তারপর থেকে বাড়িটা পড়ে আছে। দিনের বেলা মাঝেমধ্যে ফটোগ্রাফার আর ইউটিউবাররা আসে। সন্ধ্যার পর কেউ থাকে না।
তন্ময়, রিয়াজ আর দীপা এসেছিল একটা ডকুমেন্টারির জন্য। তিনজনই চারুকলার ছাত্র। তাদের পরিকল্পনা ছিল সূর্যাস্তের আলোয় নাচঘরের ছবি তোলা—শুনেছিল, পশ্চিমের রঙিন কাচের জানালা দিয়ে শেষ বিকেলের আলো ঢুকলে নাচঘরের মেঝে রংধনুর মতো হয়ে যায়।
গেটের পাশে বসা বুড়ো পাহারাদার টাকা নিয়ে তালা খুলে দিল। তারপর বলল, "সূর্য ডোবার আগে বাইর হইয়া যাইবেন। আর নাচঘরের ঝাড়বাতির নিচে দাঁড়াইবেন না।"
রিয়াজ হেসে বলল, "ঝাড়বাতি পড়ে যাবে নাকি, চাচা?"
বুড়ো হাসল না। "একশো বছরে পড়ে নাই। পড়ব না। কিন্তু নিচে যে দাঁড়ায়, সে বাজনা শুনে।"
রঙিন আলো
নাচঘরটা দোতলায়। বিশাল একটা হলঘর, মার্বেলের মেঝে ফাটা, দেয়ালে ছেঁড়া বিলাতি কাগজ, এক কোনায় উল্টে পড়ে থাকা একটা পিয়ানোর কঙ্কাল। আর ছাদের ঠিক মাঝখানে ঝুলছে একটা বিশাল ঝাড়বাতি—বেলজিয়ামের কাচ, ধুলোয় ধূসর, তবু প্রতিটি প্রিজম আলো পেলে জ্বলে ওঠে।
সূর্য যখন পশ্চিমে ঢলে পড়ল, তখন সত্যিই অলৌকিক একটা দৃশ্য তৈরি হলো। রঙিন কাচের জানালা দিয়ে লাল, নীল, সবুজ আলো এসে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল। ঝাড়বাতির প্রিজমগুলো সেই আলো ভেঙে হাজার টুকরো করে দেয়ালে ছুড়ে দিল। গোটা ঘর যেন নড়তে শুরু করল—আলোর ঢেউয়ে।
দীপা ক্যামেরা নিয়ে ঝাড়বাতির ঠিক নিচে গিয়ে দাঁড়াল। ওপরের দিকে লেন্স তাক করল।
"দীপা, ওখান থেকে সর," তন্ময় বলল, আধা ঠাট্টায়।
"এক মিনিট। এই শটটা—"
ঠিক তখনই ঝাড়বাতিটা দুলে উঠল। খুব সামান্য। বাতাস নেই, জানালা বন্ধ। তবু প্রিজমগুলো একটার সঙ্গে আরেকটা লেগে টুংটাং শব্দ করল।
আর সেই শব্দের ফাঁকে, অনেক দূর থেকে, যেন বাড়ির একেবারে ভেতর থেকে, ভেসে এল আরেকটা শব্দ।
ঝুম। ঝুম। ঝুম-ঝুম।
ঘুঙুর।
একশো বছর আগের রাত
তিনজনই স্থির হয়ে গেল। শব্দটা থামল না। বরং সঙ্গে যোগ হলো আরেকটা শব্দ—তবলার বোল, আর একটা সারেঙ্গির করুণ টান। কেউ যেন অনেক দূরের কোনো ঘরে, অনেক দূরের কোনো সময়ে, একটা মুজরার আসর বসিয়েছে।
রিয়াজ ফোনের রেকর্ডার চালু করল। তার হাত কাঁপছিল।
দীপা ঝাড়বাতির নিচে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে ঘুরছিল। তার মুখে একটা অদ্ভুত প্রশান্তি, চোখ আধবোজা। তন্ময় তার নাম ধরে ডাকল। দীপা শুনল না। তার পা দুটো মেঝেতে একটা ছন্দে নড়তে শুরু করেছে—খুব ধীরে, খুব নিখুঁত, কত্থকের তেহাই।
দীপা কোনোদিন নাচ শেখেনি।
তন্ময় দৌড়ে গিয়ে তাকে ঝাড়বাতির নিচ থেকে টেনে সরিয়ে আনল। দীপা হঠাৎ চোখ খুলল, যেন গভীর ঘুম থেকে জেগেছে। তার চোখে পানি।
"ও কাঁদছিল," সে ফিসফিস করে বলল। "মেয়েটা। নাচতে নাচতে কাঁদছিল। আর বাবু সাহেব হাসছিলেন।"
"কোন মেয়ে? কোন বাবু?"
দীপা ঝাড়বাতির দিকে তাকাল। "ওর নাম চন্দ্রা। ওকে বেনারস থেকে আনা হয়েছিল। ও বাড়ি ফিরতে চেয়েছিল। বাবু বলেছিলেন, নাচ থামালে ফিরতে দেবেন না। তাই ও নেচেছিল। সারা রাত। তারপর—"
দীপা থেমে গেল। ঘুঙুরের শব্দ হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেছে।
পাহারাদারের গল্প
তারা যখন নিচে নেমে এল, তখন অন্ধকার পুরোপুরি নেমে এসেছে। বুড়ো পাহারাদার গেটের পাশে হারিকেন জ্বেলে বসে ছিল। দীপার মুখের দিকে একবার তাকিয়েই সে বুঝে গেল।
"নিচে দাঁড়াইছিলেন।"
প্রশ্ন নয়, বিবৃতি।
সে তাদের বসতে বলল, তারপর গল্পটা বলল—তার দাদার কাছ থেকে শোনা, যিনি এই বাড়িতেই পাহারাদার ছিলেন। ছোট জমিদার নরেন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরী ছিলেন বিলাসী আর নিষ্ঠুর। বেনারস থেকে এক কিশোরী নর্তকীকে এনেছিলেন, এক বছরের চুক্তিতে। বছর শেষ হলে চন্দ্রা ফিরতে চাইল। নরেন্দ্রনারায়ণ রাজি হলেন—এক শর্তে। শেষ রাতের আসরে তাকে নাচতে হবে ভোর পর্যন্ত, এক মুহূর্ত না থেমে। থামলে চুক্তি নতুন করে শুরু।
চন্দ্রা নেচেছিল। সারা রাত। ঝাড়বাতির নিচে, একশো মোমবাতির আলোয়। ভোরের আলো যখন রঙিন কাচ দিয়ে ঢুকল, তখন সে থামল।
আর পড়ে গেল। আর উঠল না।
"তার পায়ের ঘুঙুর খুইলা বাবু ঝাড়বাতিতে বাঁইধা রাখছিলেন," পাহারাদার বলল। "ট্রফির মতো। তার পরের বছর বাবুর একমাত্র পোলা ঝাড়বাতির নিচে খেলতেছিল। হঠাৎ নাকি ঘুঙুর বাজল, আর পোলাটা নাচতে শুরু করল। থামে না। থামাইতে পারে না কেউ। তিন দিন পর—"
সে কথাটা শেষ করল না।
"তারপর থেকা যে ঝাড়বাতির নিচে দাঁড়ায়, চন্দ্রা তারে দিয়া নাচ শেষ করাইতে চায়। ওর নাচটা তো অসমাপ্ত রইয়া গেছে। ও ভোর দেখছে, কিন্তু বাড়ি ফিরতে পারে নাই।"
ঢাকায় ফিরে রিয়াজ রেকর্ডিংটা বাজাল। প্রথমে শুধু ঝাড়বাতির টুংটাং। তারপর ঘুঙুর। তবলা। সারেঙ্গি। একেবারে স্পষ্ট।
তারপর রেকর্ডিংয়ের একেবারে শেষে, যখন তারা সিঁড়ি দিয়ে নামছিল, একটা মেয়ের গলা—খুব কাছে, প্রায় মাইক্রোফোনের গায়ে মুখ লাগিয়ে বলা:
দীপা এখন কত্থক শেখে। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলে, হঠাৎ শখ হলো। কিন্তু তার গুরু একদিন অবাক হয়ে বলেছিলেন, দীপা যে তেহাইটা নাচে, সেটা বেনারস ঘরানার একটা বহু পুরোনো বোল—যেটা আজ আর কেউ শেখায় না। দীপা কোথায় শিখল, গুরু বুঝতে পারেন না।
দীপা জানে। প্রতি রাতে, ঘুমের মধ্যে, কেউ তাকে শেখায়। ধৈর্য ধরে। একটা একটা করে বোল।
আর দীপা জানে, যেদিন সে পুরো নাচটা শিখে ফেলবে, সেদিন তাকে আবার ফিরে যেতে হবে মুক্তাগাছার সেই নাচঘরে। ঝাড়বাতির নিচে দাঁড়াতে হবে। আর নাচটা শেষ করতে হবে—ভোর পর্যন্ত।
কারণ চন্দ্রা কথা দিয়েছে, এবার শেষ হলে সে দুজনেই বাড়ি ফিরবে।