মূল লেখায় যান

গজারি বনের চোখ

মধুপুরের গজারি বনে পথ হারিয়েছিল চার বন্ধু। রাত যত বাড়ল, গাছের ফাঁকে ফাঁকে জ্বলে উঠতে লাগল জোড়া জোড়া চোখ—আর একসময় তারা বুঝল, চোখগুলো শিয়ালের নয়।

নিনিশাচর রায়হান@nishachar
  • ৫ মিনিট
  • ৫.১ হাজার বার পড়া হয়েছে
  • ২৬০ জন পছন্দ করেছেন
গজারি বনের চোখ

ক্যাম্পিং

পরিকল্পনাটা ছিল আসিফের। মধুপুরের গজারি বনে এক রাত ক্যাম্পিং—তাঁবু, কাঠের আগুন, গিটার, আর শহরের কোলাহল থেকে একটা রাতের মুক্তি। সঙ্গে তিন বন্ধু: তানভীর, নাফিস আর অর্ক। সবাই বুয়েটের শেষ বর্ষের ছাত্র, পরীক্ষার আগে শেষ একটু আনন্দ।

স্থানীয় গাইড হিসেবে নিয়েছিল জনি মৃ নামে এক গারো তরুণকে। জনি বনের প্রতিটি পথ চেনে। কিন্তু বিকেলে তাঁবু খাটানোর জায়গা দেখে সে মাথা নাড়ল।

"এখানে না, দাদা। এটা পুরোনো জায়গা।"

"পুরোনো মানে?"

জনি গাছগুলোর দিকে তাকাল। এখানে গজারিগুলো অন্য জায়গার চেয়ে মোটা, পুরোনো, ডালপালা এমনভাবে ছড়ানো যে মাথার ওপর আকাশ প্রায় দেখা যায় না। "আমার দাদি বলত, এই জায়গায় বনের পাহারাদারেরা থাকে। রাতে তারা দেখে। কেউ বেশি শব্দ করলে, আগুন বেশি বড় করলে, তারা রাগ করে।"

আসিফ হাসল। "তোমার দাদি নিশ্চয়ই অনেক গল্প জানতেন।"

জনি হাসল না। সন্ধ্যার আগেই সে ফিরে গেল নিজের গ্রামে। যাওয়ার আগে বলে গেল, "রাতে কেউ নাম ধরে ডাকলে তাঁবু থেকে বের হবেন না। আর আগুন নিভাবেন না।"


প্রথম জোড়া

রাত নয়টা পর্যন্ত সব ঠিক ছিল। আগুন জ্বলছে, মুরগি ঝলসানো হচ্ছে, অর্ক গিটারে গান ধরেছে। বনের অন্ধকার চারপাশ থেকে চেপে আছে, কিন্তু আগুনের বৃত্তের ভেতর উষ্ণতা আর হাসি।

নাফিস প্রথম দেখল।

"ওইটা কী?"

আগুনের আলোর সীমানার ঠিক বাইরে, দুটো গাছের ফাঁকে, দুটো আলোর বিন্দু। সবুজাভ হলুদ। স্থির।

"শিয়াল," তানভীর বলল। "খাবারের গন্ধ পেয়েছে।"

কিন্তু একটু পর আরেক জোড়া দেখা দিল। ডান দিকে। তারপর বাম দিকে। তারপর পেছনে। দশ মিনিটের মধ্যে ক্যাম্পের চারপাশে অন্তত বিশ জোড়া চোখ, একটা নিখুঁত বৃত্ত তৈরি করে।

অর্ক গিটার বাজানো থামিয়ে দিল।

চোখগুলো নড়ছিল না। পলকও ফেলছিল না। আর সবচেয়ে অস্বস্তিকর ব্যাপার—চোখগুলো মাটি থেকে অনেক উঁচুতে। শিয়ালের চোখ হাঁটুর উচ্চতায় থাকে। এই চোখগুলো ছিল মানুষের মাথার উচ্চতায়। কোনো কোনোটা আরও ওপরে।

আগুনের আলোর সীমানার বাইরে, গাছের ফাঁকে ফাঁকে জোড়া জোড়া চোখ

আসিফের ভুল

আসিফ ভয় পেলে রেগে যায়। সেটাই হলো। সে উঠে দাঁড়িয়ে একটা জ্বলন্ত কাঠ তুলে নিল, তারপর চোখগুলোর দিকে ছুড়ে মারল। চিৎকার করে বলল, "যা! ভাগ এখান থেকে!"

কাঠটা গিয়ে পড়ল একটা গজারি গাছের গোড়ায়। স্ফুলিঙ্গ ছড়াল।

সব চোখ একসঙ্গে নিভে গেল।

এক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর বনের ভেতর থেকে একটা শব্দ উঠল। বাতাস নয়। বাতাস ছিল না। শত শত গাছের পাতা একসঙ্গে কাঁপার শব্দ, যেন গোটা বন একটা দীর্ঘ শ্বাস টানল।

তারপর আগুনটা নিভে গেল।

কেউ পানি ঢালেনি। কেউ ফুঁ দেয়নি। দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা আগুন এক মুহূর্তে ছাই হয়ে গেল, যেন কেউ অদৃশ্য একটা হাত দিয়ে চেপে ধরল।

অন্ধকার। সম্পূর্ণ, নিরেট অন্ধকার।

তানভীর মোবাইলের টর্চ জ্বালাল। আলো পড়ল আসিফের জায়গায়।

আসিফ নেই।


নাম ধরে ডাক

তিনজন তাঁবুর ভেতর ঢুকে জিপার টেনে দিল। জনির কথা মনে পড়েছিল। তারা একে অপরের হাত ধরে বসে রইল, মোবাইলের আলোয়। নেটওয়ার্ক নেই। কাউকে ডাকার উপায় নেই।

রাত একটার দিকে বাইরে থেকে আসিফের গলা।

"নাফিস! তানভীর! বের হ! আমি পথ হারাইছিলাম, এখন ফিরছি। আগুনটা জ্বালা, কিছু দেখা যায় না!"

নাফিস জিপারের দিকে হাত বাড়াল। অর্ক তার হাত চেপে ধরল।

"দাঁড়া। ও কখনো 'হারাইছিলাম' বলে না। আসিফ ঢাকার ছেলে। ও বলে 'হারিয়েছিলাম'।"

বাইরের গলা আবার ডাকল। এবার একটু কাছে। তাঁবুর কাপড়ের ঠিক ওপাশে।

তাঁবুর কাপড়ে একটা ছায়া পড়ল। মোবাইলের আলো ভেতর থেকে কাপড়ে পড়ায় বাইরের কিছু দেখা যায় না, কিন্তু ছায়াটা যে তাঁবুর চূড়া ছাড়িয়ে উঠে গেছে, সেটা বোঝা যাচ্ছিল। অনেক লম্বা। মানুষের চেয়ে অনেক লম্বা।

কেউ দরজা খুলল না। ভোর পর্যন্ত বাইরের গলা ডাকতে থাকল—কখনো আসিফের গলায়, কখনো নাফিসের মায়ের গলায়, কখনো এমন একটা ভাষায় যেটা তারা কেউ চেনে না। ভোরের প্রথম পাখির ডাকের সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল।


সকালে জনি ফিরে এল তার দাদিকে নিয়ে। শতবর্ষী এক গারো নারী, চোখে ছানি, হাতে একটা লাঠি। তিনি ক্যাম্পের ছাইয়ের সামনে বসে অনেকক্ষণ মাটিতে হাত রাখলেন। বিড়বিড় করে কিছু বললেন নিজের ভাষায়। তারপর উঠে গিয়ে সেই গজারি গাছটার গোড়ায় দাঁড়ালেন, যেখানে আসিফের ছোড়া কাঠ পড়েছিল। গাছের বাকলে একটা কালো পোড়া দাগ।

তিনি গাছের কাছে ক্ষমা চাইলেন। মাথা নুইয়ে, দুই হাত জোড় করে, অনেকক্ষণ।

তারপর জনিকে বললেন কিছু। জনি অনুবাদ করল:

"দাদি বলছে, আপনাদের বন্ধু ফেরত আসবে। কিন্তু সে যা নিয়ে গেছে, তা রেখে আসতে হবে।"

দুপুরে আসিফকে পাওয়া গেল বনের আরেক প্রান্তে, একটা শুকনো খালের পাড়ে বসে। শরীরে কোনো আঘাত নেই। সে কথা বলছিল, হাঁটছিল, সবাইকে চিনছিল।

শুধু তার দুই চোখ বন্ধ।

ডাক্তাররা বলেছিলেন, চোখে কোনো সমস্যা নেই। কর্নিয়া, রেটিনা, অপটিক নার্ভ—সব স্বাভাবিক। কিন্তু আসিফ কিছুই দেখতে পায় না। আজ তিন বছর।

আর আসিফ একটা কথা কাউকে বলে না, শুধু অর্ককে একবার বলেছিল, এক গভীর রাতে:

"আমি অন্ধ না, অর্ক। আমি দেখি। শুধু এখানে দেখি না। প্রতি রাতে আমি সেই বনে দাঁড়িয়ে থাকি, গাছের ফাঁকে, আগুনের আলোর বাইরে। আর দেখি নতুন কেউ ক্যাম্প করছে কিনা।"

৫.১ হাজার বার পড়া হয়েছে · প্রকাশ ২৪ জুন ২০২৬

এরপর কী পড়বেন

সব দেখুন
ভূতের গল্প

স্কন্ধকাটার শেষ ট্রেন

রাত বারোটার লোকাল ট্রেনে একা এক যাত্রী। প্ল্যাটফর্মের লোকটা হাত নাড়ছে ঠিকই, কিন্তু তার কাঁধের ওপর মাথাটা নেই।

নিনিশাচর রায়হান
  • ১১ মিনিট
  • ২৫ হাজার বার পড়া হয়েছে

৩ জুলাই ২০২৬

সত্য ঘটনা অবলম্বনে

চারতলার ৪১৩ নম্বর রুম

হলের চারতলায় ৪১৩ নম্বর রুমটা বারো বছর ধরে তালাবদ্ধ। নতুন সিট বরাদ্দের তালিকায় হঠাৎ সেই রুমের নাম এল, আর প্রথম রাতেই দরজায় টোকা—ঠিক তিনটা বেজে তেরো মিনিটে।

নিনিশাচর রায়হান
  • ৫ মিনিট
  • ২২ হাজার বার পড়া হয়েছে

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

লোককাহিনি

গেছো ভূতের বাঁশবাগান

গ্রামের শেষ মাথার বাঁশবাগান পেরোলেই স্কুল। সন্ধ্যার পর ওই পথে হাসির শব্দ শোনা যায়, অথচ আশেপাশে কেউ থাকে না।

শ্যাশ্যামল দত্ত
  • ১১ মিনিট
  • ২০ হাজার বার পড়া হয়েছে

১১ জুলাই ২০২৬