মূল লেখায় যান

পুরোনো আয়না

নিলাম থেকে কেনা সেগুন কাঠের আয়নাটা শোবার ঘরে টাঙানোর পর থেকে রুমানার প্রতিবিম্ব এক সেকেন্ড দেরিতে নড়ে। বর্ষার এক রাতে সে দেখল, প্রতিবিম্বটা আর তার সঙ্গে নড়ছেই না।

কাকালবেলা মাহমুদ@kalbela
  • ৫ মিনিট
  • ৪.৩ হাজার বার পড়া হয়েছে
  • ১৯০ জন পছন্দ করেছেন
পুরোনো আয়না

নিলামের আয়না

পুরান ঢাকার ইসলামপুরে পুরোনো আসবাবের একটা নিলামঘর আছে। বিয়ের পর নতুন সংসার সাজাতে রুমানা আর ফাহিম সেখানে গিয়েছিল সস্তায় একটা খাট খুঁজতে। খাট পায়নি, পেয়েছিল একটা আয়না।

লম্বা, প্রায় মানুষ-সমান। সেগুন কাঠের ফ্রেম, চারকোনায় খোদাই করা পদ্মফুল। কাচটা একটু ঘোলাটে, কোনায় কোনায় রুপালি প্রলেপ উঠে গেছে। নিলামদার বলেছিলেন, এক জমিদার পরিবারের সম্পত্তি, শাঁখারীবাজারের একটা ভাঙা বাড়ি থেকে আনা।

দাম আশ্চর্য রকম কম। রুমানা তখনই কিনে ফেলেছিল।

ফাহিম আপত্তি করেনি। শুধু আয়নাটা ভ্যানে তোলার সময় নিলামদার একটা কথা বলেছিলেন, হাসতে হাসতে, যেন ঠাট্টা: "আপা, রাতে ঘরের বাতি নিভাইলে আয়নাটা কাপড় দিয়া ঢাইকা রাইখেন। পুরান আয়না, অনেক কিছু দেখছে। ঘুমাইতে পারে না।"


এক সেকেন্ড

আয়নাটা শোবার ঘরে, খাটের ঠিক উল্টো দিকের দেয়ালে টাঙানো হলো। রুমানার খুব পছন্দ। সকালে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে সে নিজেকে দেখত, আর ভাবত—কত মানুষ, কত বছর ধরে এই কাচে নিজেদের দেখেছে।

প্রথম সপ্তাহের শেষে সে ব্যাপারটা খেয়াল করল।

চিরুনি নামানোর সময় আয়নার রুমানা যেন একটু দেরি করে নামাল। খুব সামান্য। এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশ। রুমানা হাত তুলল আবার, নামাল। এবার ঠিক একসঙ্গে। সে হাসল নিজের ওপর—চোখের ভুল।

কিন্তু পরদিন আবার। তার পরদিন আবার। আর প্রতিদিন দেরিটা একটু বাড়ছে। এক সপ্তাহ পর এটা আর ভুল বলে উড়িয়ে দেওয়ার উপায় রইল না। রুমানা মাথা ঘোরালে আয়নার রুমানা পুরো এক সেকেন্ড পর মাথা ঘোরায়। যেন একটা ভিডিও, সামান্য দেরিতে চলছে।

ফাহিমকে দেখাল। ফাহিম আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ল। প্রতিবিম্বও নাড়ল, একসঙ্গে।

"কই? ঠিকই তো আছে।"

রুমানা পাশে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ল। ফাহিমের প্রতিবিম্ব সঙ্গে সঙ্গে। রুমানার প্রতিবিম্ব—এক সেকেন্ড পর।

ফাহিম দেখল না। সে তখন নিজের দিকে তাকিয়ে ছিল।

পরের সপ্তাহে রুমানা একা ইসলামপুরে গেল। নিলামঘরের বুড়ো মালিক প্রথমে কিছু বলতে চাইলেন না। তারপর চা আনিয়ে, দোকানের পেছনের অন্ধকার ঘরে বসিয়ে, আস্তে আস্তে বললেন। আয়নাটা শাঁখারীবাজারের যে বাড়ি থেকে এসেছে, সেখানে একশো বছর আগে এক নববধূ থাকত। বিয়ের এক মাসের মাথায় সে নিখোঁজ হয়। কেউ বলে পালিয়েছিল, কেউ বলে শ্বশুরবাড়ির লোকেরা কিছু করেছিল। শুধু বাড়ির বুয়া বলেছিল, শেষ রাতে সে বউটাকে আয়নার সামনে বসে থাকতে দেখেছিল—চুল আঁচড়াচ্ছিল, আর আয়নার বউটা আঁচড়াচ্ছিল না।

"তারপর থেকে আয়নাটা তিনবার বিক্রি হইছে, আপা," বুড়ো বললেন। "তিনবারই ফেরত আইছে। কেউ কারণ কয় না। খালি কয়, রাতে ঢাইকা রাখতে ভুইলা গেছিলাম।"

রুমানা বাড়ি ফিরে আয়নার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। আয়নার রুমানাও তাকিয়ে রইল। কিন্তু রুমানা যখন চোখ সরাল, তার মনে হলো—নিশ্চিত নয়, শুধু মনে হলো—আয়নার রুমানা চোখ সরায়নি।


বর্ষার রাত

আষাঢ়ের প্রথম বড় বৃষ্টির রাতে বিদ্যুৎ চলে গেল। ফাহিম অফিসের কাজে রাজশাহী। রুমানা একা। মোমবাতি জ্বালিয়ে সে খাটে বসে বই পড়ছিল। বাইরে বৃষ্টির একটানা শব্দ, মাঝে মাঝে মেঘের গর্জন।

নিলামদারের কথা মনে পড়ল। কিন্তু আয়না ঢাকার মতো বড় কাপড় হাতের কাছে ছিল না, আর উঠতে ইচ্ছে করছিল না। সে বইয়ে মন দিল।

কিছুক্ষণ পর মনে হলো কেউ তাকে দেখছে।

সে মাথা তুলল। আয়নায় মোমবাতির আলোয় ঘরটা দেখা যাচ্ছে—খাট, আলমারি, জানালা। আর খাটে বসে থাকা রুমানা।

রুমানা হাত থেকে বইটা নামিয়ে রাখল।

আয়নার রুমানা বইটা নামাল না। সে বই হাতে বসে রইল, মাথা নিচু। তারপর ধীরে, খুব ধীরে, মাথা তুলল। আর সরাসরি রুমানার দিকে তাকাল।

তার মুখে হাসি।

রুমানা হাসছিল না।

মোমবাতির আলোয় আয়নার ভেতরের ঘরটা আর এই ঘর রইল না

আয়নার ভেতরের মেয়েটা বই রেখে উঠে দাঁড়াল। খাট থেকে নামল। এগিয়ে এল আয়নার কাচের দিকে। কাছ থেকে রুমানা দেখল, মুখটা তারই, কিন্তু পুরোপুরি নয়। চোখের নিচে কালি। ঠোঁট ফ্যাকাশে। আর পরনে রুমানার নাইটি নয়—একটা পুরোনো ধরনের সাদা শাড়ি, লাল পাড়।

মেয়েটা কাচে হাত রাখল। ভেতর থেকে। তারপর ঠোঁট নাড়ল। কোনো শব্দ নেই, কিন্তু রুমানা পড়তে পারল:


যে ফিরে এল

ফাহিম পরদিন দুপুরে ফিরল। রুমানা দরজা খুলে দিল, হাসিমুখে।

সব ঠিকঠাক। রুমানা রান্না করল, গল্প করল, রাজশাহীর খবর জিজ্ঞেস করল। শুধু কয়েকটা ছোট ব্যাপার ফাহিমের চোখে পড়ল, যেগুলো সে তখন গুরুত্ব দেয়নি।

রুমানা মোবাইল চালাতে একটু অস্বস্তি বোধ করছিল, যেন নতুন শিখছে। ভাতে হাত দিয়ে খাওয়ার সময় সে এমন ভঙ্গিতে খাচ্ছিল, যেমন ফাহিমের দাদি খেতেন। আর কথার মধ্যে মাঝে মাঝে এমন কিছু শব্দ বলছিল—"সোয়ামি", "পালঙ্ক", "দেরাজ"—যেগুলো আজকাল কেউ বলে না।

রাতে শোবার আগে ফাহিম দেখল, আয়নাটা একটা মোটা চাদর দিয়ে ঢাকা।

"ঢেকে দিলে যে?"

রুমানা খাটে শুয়ে, দেয়ালের দিকে ফিরে, খুব শান্ত গলায় বলল:

"রাতে ও ঘুমাইতে পারে না। খালি কাচে হাত দিয়া ধাক্কায়। শব্দ করে। আমি একশো বছর ধইরা জানি সেইটা কেমন লাগে। কিন্তু এইবার আর আমার পালা না।"

ফাহিম অন্ধকারে শুয়ে রইল, চোখ খোলা। চাদরে ঢাকা আয়নার দিক থেকে খুব ক্ষীণ একটা শব্দ আসছিল।

ঠক। ঠক। ঠক।

কাচের ওপর আঙুলের টোকা। ভেতর থেকে।

৪.৩ হাজার বার পড়া হয়েছে · প্রকাশ ১১ জুন ২০২৬

এরপর কী পড়বেন

সব দেখুন
সত্য ঘটনা অবলম্বনে

চারতলার ৪১৩ নম্বর রুম

হলের চারতলায় ৪১৩ নম্বর রুমটা বারো বছর ধরে তালাবদ্ধ। নতুন সিট বরাদ্দের তালিকায় হঠাৎ সেই রুমের নাম এল, আর প্রথম রাতেই দরজায় টোকা—ঠিক তিনটা বেজে তেরো মিনিটে।

নিনিশাচর রায়হান
  • ৫ মিনিট
  • ২২ হাজার বার পড়া হয়েছে

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পরিত্যক্ত বাড়ি

সিরিজ: রাতের বাড়ি · পর্ব ১

রাতের বাড়ি — পর্ব ১

সূত্রাপুরের গলির শেষে দোতলা পুরোনো বাড়ি, ভাড়া আশ্চর্য রকম কম। কেয়ারটেকার শুধু দুটো নিয়ম বলে দিয়েছিল—চিলেকোঠা খুলবেন না, আর রাত তিনটায় কলের পানি বন্ধ করতে যাবেন না।

ততমসী আফরোজ
  • ৫ মিনিট
  • ১৮ হাজার বার পড়া হয়েছে

১৯ জুলাই ২০২৬

পরিত্যক্ত বাড়ি

সিরিজ: রাতের বাড়ি · পর্ব ২

রাতের বাড়ি — পর্ব ২

চিলেকোঠার ট্রাঙ্কে পাওয়া গেল ১৯৬৪ সালের একটা ডায়েরি আর একটা ছোট ফ্রক। নূরী নামের মেয়েটা এ বাড়িতেই থাকত—আর যেদিন সে হারিয়ে যায়, সেদিনও উঠানের কল সারা রাত খোলা ছিল।

ততমসী আফরোজ
  • ৫ মিনিট
  • ১৪ হাজার বার পড়া হয়েছে

২ আগস্ট ২০২৬