মূল লেখায় যান

শাঁকচুন্নির শাঁখা

শ্রাবণের এক বৃষ্টির রাতে বাঁশবাগানের পুকুরঘাট থেকে ফিরল নতুন বউ মালতী—হাতে শাঁখা নেই। তারপর থেকে অমল বলে, বউ যেন আর আগের মানুষ নেই। আমি তো সব দেখি, সব বুঝি।

শ্যাশ্যামল দত্ত@shyamal
  • ৫ মিনিট
  • ০ বার পড়া হয়েছে
শাঁকচুন্নির শাঁখা

নতুন বউ

অমলের বিয়েটা হলো বৈশাখে। মেয়ে এল কোটালীপাড়া থেকে—মালতী। শ্যামলা, বড় বড় চোখ, হাসলে গালে টোল পড়ে। প্রথম যেদিন উলু দিয়ে বউ ঘরে তোলা হলো, আমি উঠোনের কোণের পিঁড়িতে বসে দেখছিলাম। ওর দুই হাতে নতুন শাঁখা আর লাল পলা, সিঁথিতে টকটকে সিঁদুর। আমার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠেছিল।

আমি এই বাড়ির মেয়ে। অমলের পিসি। কত বছর এ বাড়িতে আছি, গুনে বলতে পারি না। ঘরের কোণে আমার ছোট্ট জায়গাটুকু, একটা পুরোনো কাঠের তোরঙ্গ—এই আমার সংসার। কেউ আমাকে নিয়ে মাথা ঘামায় না। আমিও কারও কাজে নাক গলাই না। শুধু দেখি।

দিন কাটে উঠোনের রোদ দেখে, বর্ষায় পুকুরের দিক থেকে আসা ব্যাঙের ডাক শুনে। খিদে-তেষ্টা কবে থেকে টের পাই না, মনে নেই। লোকে বলে, কপাল পুড়লে মেয়েমানুষের সব স্বাদ চলে যায়। হবেও বা।

মালতী ভালো মেয়ে। ভোরে উঠে উঠোন নিকোয়, সন্ধ্যায় তুলসীতলায় প্রদীপ দেয়, শাঁখ বাজায়। শুধু একটা জিনিস আমার চোখ এড়ায়নি। বউ হয়ে আসার পর থেকেই ও মাঝে মাঝে আমার কোণটার দিকে তাকিয়ে থাকত। ভুরু কুঁচকে, যেন কিছু ঠাহর করার চেষ্টা করছে।


বাঁশবাগানের রাত

শ্রাবণ মাস। সারাদিন ঝমঝম বৃষ্টি। বাড়ির পেছনে ঘন বাঁশবাগান, তার ওপারে পুরোনো পুকুর। ঘাটটা শ্যাওলায় পিছল, ভাঙা সিঁড়ি। এ বাড়ির কেউ সন্ধ্যার পর ওদিকে যায় না।

সেদিন অমলের মা জ্বরে পড়েছিলেন। রাতে খাবার জল ফুরিয়ে গেল। মালতী নতুন মানুষ, কাউকে কিছু না বলে কলসি কাঁখে বেরিয়ে গেল পুকুরের দিকে।

আমিও গেলাম পিছু পিছু। একা মেয়ে, অন্ধকার, পিছল ঘাট—কেউ তো সঙ্গে থাকা চাই।

বাঁশবাগানের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে বাঁশে বাঁশে ঘষা লেগে কটকট শব্দ হচ্ছিল। বৃষ্টির ফোঁটা পাতা থেকে টুপটাপ ঝরছিল। মালতী ঘাটে নেমে কলসি ডোবাল। চুড়ির মতো রিনরিন করে উঠল ওর শাঁখা।

শব্দটা আমার কানে এসে লাগল। কত বছর শুনিনি এই শব্দ। নিজের হাতে।

তারপর কী হলো, আমার ঠিক মনে নেই। শুধু মনে আছে, মালতী চিৎকার করে উঠেছিল। কলসি গড়িয়ে গিয়েছিল জলে। আর ও দৌড়ে পালিয়েছিল বাঁশবাগানের ভেতর দিয়ে, পিছলে পড়তে পড়তে।

বাড়ি ফিরে দেখা গেল, ওর দুই হাত খালি। শাঁখা নেই। পলা নেই।


অমলের ভয়

পরদিন থেকে মালতী বদলে গেল।

খায় না, ঘুমায় না। রাতে বারবার জেগে উঠে বসে। সন্ধ্যার পর একা কোথাও যায় না, এমনকি তুলসীতলায়ও না। আর সবচেয়ে অদ্ভুত—ও এখন আমার কোণটার দিকে তাকালেই থরথর করে কাঁপে।

আমি রাতে ওর শিয়রে গিয়ে বসতাম, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে চাইতাম। যতবার কাছে যেতাম, ততবার ও চোখ খুলে চিৎকার করে উঠত। বুঝতাম, ওর ওপর যা ভর করেছে, সে আমাকে সইতে পারে না।

এক রাতে শুনলাম, অমল তার মায়ের কাছে বসে নিচু গলায় বলছে।

“মা, ও কেমন জানি হইয়া গেছে। রাতে উইঠা ঘরের কোণার দিকে আঙুল দেখায়। কয়, ওইখানে কে বইসা থাকে, ভিজা শাড়ি, ভিজা চুল। কয়, সে নাকি সেদিন রাইতে ঘাটে ওর হাত চাইপা ধরছিল।”

অমলের মা চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “ওঝা ডাক।”

আমি বুঝলাম। পুকুরঘাটে কিছু একটা ভর করেছে আমাদের নতুন বউয়ের ওপর। শাঁকচুন্নির গল্প তো ছোটবেলা থেকে শুনেছি—সধবা অবস্থায় যে বউ অপঘাতে মরে, সে শাঁকচুন্নি হয়। জ্যান্ত বউয়ের শাঁখা কেড়ে নেয়, তার জায়গা নিতে চায়। সংসারের লোভ তার যায় না।

আহা রে মেয়েটা। আমি ঠিক করলাম, ওঝা যতক্ষণ থাকবে, আমি মালতীর পাশে থাকব।


ওঝা

ওঝা এল শনিবার সন্ধ্যায়। শুকনো লম্বা মানুষ, গলায় রুদ্রাক্ষ, হাতে সরষে আর একগোছা ঝাঁটার কাঠি। উঠোনে আসন পেতে বসল। মন্ত্র পড়ে সরষে ছড়াতে লাগল চারদিকে।

মালতী অমলের পেছনে লুকিয়ে কাঁপছিল। আমি গিয়ে দাঁড়ালাম ওর ঠিক পাশে।

ওঝা হঠাৎ থেমে গেল।

তার চোখ মালতীর দিকে না। আমার দিকে। সোজা, স্থির।

অনেকক্ষণ কেউ কিছু বলল না। তারপর ওঝা খুব আস্তে, যেন ভয় পেয়ে, অমলের মাকে জিজ্ঞেস করল, “এই বাড়িতে কোনোদিন কোনো বউ ওই পুকুরে ডুইবা মরছিল? শাঁখা-সিঁদুর পইরা?”

অমলের মায়ের মুখ সাদা হয়ে গেল।

“আমার ননদ। কমলা। বিয়ার তিন মাসের মাথায় বাপের বাড়ি বেড়াইতে আইছিল। শ্রাবণের এক রাইতে ঘাটে জল আনতে গিয়া আর ফেরে নাই। চল্লিশ বছর হইল। লাশ পাওয়া গেছিল তিন দিন পর।” একটু থেমে বললেন, “হাতে শাঁখা আছিল না। কোনোদিন পাওয়া যায় নাই।”

ওঝা মাথা নাড়ল। “আপনাগো বউয়ের কিছু হয় নাই, মা। বউ যা দেখে, ঠিকই দেখে।”


তোরঙ্গ

আমি ঘরে ফিরে এলাম। কেউ বাধা দিল না। কেউ কোনোদিন দেয় না।

কোণে বসে অনেকক্ষণ ভাবলাম। কবে শেষ কেউ আমাকে ডেকে কথা বলেছে? কবে শেষ কেউ আমার পাতে ভাত বেড়ে দিয়েছে? মনে করতে পারলাম না। চল্লিশ বছর, ওঝা বলল। আমার কাছে তো কয়েকটা বর্ষা মাত্র।

তোরঙ্গটা খুললাম। ভেতরে ন্যাপথলিনের গন্ধ, পুরোনো লাল বেনারসির ভাঁজ। আর তার ওপর, যত্ন করে রাখা, এক জোড়া নতুন শাঁখা আর লাল পলা। এখনো একটু ভেজা। এখনো একটু পুকুরের শ্যাওলা লেগে।

আমি শাঁখা জোড়া হাতে পরলাম। ঠিক মাপে বসে গেল, যেন আমার জন্যই গড়া। কবজিতে শাঁখার ঠান্ডা ছোঁয়া—চল্লিশ বছর পর।

রিনরিন করে উঠল।

পাশের ঘর থেকে মালতীর চাপা কান্না থেমে গেল। ও শব্দটা শুনেছে।

ওঝা কাল সকালে চলে যাবে। অমলের মা পরশু বাপের বাড়ি যাবেন, বলে রেখেছেন। বাড়িতে থাকবে শুধু অমল আর মালতী।

আর শ্রাবণ তো এখনো শেষ হয়নি। খাবার জল ফুরোবেই। কাউকে না কাউকে ঘাটে যেতেই হবে।

আমি অপেক্ষা করব। বাঁশবাগানের ভেতর, পিছল সিঁড়ির ধারে।

আমার তো এখন শাঁখা আছে। বাকিটুকুও একদিন হবে।

০ বার পড়া হয়েছে · প্রকাশ ১ অক্টোবর ২০২৬

এরপর কী পড়বেন

সব দেখুন
রহস্য

পদ্মার চরের অচেনা লোক

বানের পানি নামার পর চরের ঘাটে এসে বসে এক অচেনা লোক। সে গ্রামের সবার গোপন কথা জানে, আর জিজ্ঞেস করলে বলে দেয় কার মৃত্যু কোন দিন।

অঅধীর সেন
  • ৫ মিনিট
  • ১ বার পড়া হয়েছে

৪ অক্টোবর ২০২৬

অলৌকিক

ঝড়ের রাতের অতিথি

দশ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের রাতে চরফ্যাশনের এক ঘরের দরজায় কড়া নাড়ল ভেজা এক কিশোর। সবাই দ্বিধায়, শুধু দাদি ছুটে গিয়ে খিল খুললেন—কারণ এই মুখ তিনি চেনেন, বহু বছর আগের এক ঝড়ের রাত থেকে।

অঅধীর সেন
  • ৫ মিনিট
  • ১ বার পড়া হয়েছে

৩ অক্টোবর ২০২৬

লোককাহিনি

বেলতলার ব্রহ্মদৈত্য

পোড়ো ভিটার বেলগাছে থাকেন এক জ্ঞানী ব্রহ্মদৈত্য, যিনি পথিককে শুধু ধাঁধা জিজ্ঞেস করেন। কুয়াশার রাতে তেইশ বছরের অভিজ্ঞ এক মাস্টার দুটোর ঠিক উত্তর দিলেন। তৃতীয়টার দিলেন না।

শ্যাশ্যামল দত্ত
  • ৬ মিনিট
  • ০ বার পড়া হয়েছে

৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬