বেলতলার ব্রহ্মদৈত্য
পোড়ো ভিটার বেলগাছে থাকেন এক জ্ঞানী ব্রহ্মদৈত্য, যিনি পথিককে শুধু ধাঁধা জিজ্ঞেস করেন। কুয়াশার রাতে তেইশ বছরের অভিজ্ঞ এক মাস্টার দুটোর ঠিক উত্তর দিলেন। তৃতীয়টার দিলেন না।
- ৬ মিনিট
- ০ বার পড়া হয়েছে
ভিটার বেলগাছ
ফরিদপুরের মধুখালী থেকে মাইল চারেক ভেতরে কাজলদিঘি গ্রাম। গ্রামের হাইস্কুল আর বাজারের মাঝখানে একটা পোড়ো ভিটা — দেশভাগের সময় এক পণ্ডিত পরিবার ভিটা ছেড়ে চলে গিয়েছিল, তারপর থেকে সেখানে কেউ ঘর তোলেনি। ভাঙা তুলসীমঞ্চ, ইটের স্তূপ, আর ভিটার কোণে একটা প্রকাণ্ড বেলগাছ।
গাছটার বয়স কেউ জানে না। গুঁড়ি এত মোটা যে দুজন মানুষ হাত ধরাধরি করে বেড় পায় না। ডালপালা ছড়িয়ে আছে রাস্তার ওপর ছাতার মতো।
গ্রামের লোকে বলে, ওই গাছে ব্রহ্মদৈত্য থাকেন।
ভয়ের গলায় নয়, সমীহের গলায় বলে। কারণ এই দৈত্য অন্য ভূতদের মতো নয়। তিনি ঘাড় মটকান না, পথ ভোলান না। তিনি শুধু প্রশ্ন করেন। রাতে কেউ গাছের তলা দিয়ে গেলে ওপর থেকে একটা গম্ভীর, মার্জিত গলা ভেসে আসে — “দাঁড়াও। একটা ধাঁধার উত্তর দিয়ে যাও।”
ঠিক উত্তর দিলে পথ ছেড়ে দেন। কেউ কেউ বলে, আশীর্বাদও করেন।
আর ভুল উত্তর দিলে? বুড়োরা মাথা নাড়েন। “কিছু একটা রাইখা যাইতে হয়।”
কী রেখে যেতে হয়, কেউ পরিষ্কার করে বলতে পারে না।
মোজাম্মেল হক এসব কথায় হাসতেন। কাজলদিঘি হাইস্কুলের বাংলার শিক্ষক, তেইশ বছর ধরে পড়াচ্ছেন। গ্রামের সবাই তাঁকে চেনে, নাম ধরে সালাম দেয়। ছাত্রদের খাতায়, স্কুলের বোর্ডে, হেডস্যারের ফাইলে — সর্বত্র তাঁর নাম লেখা, গোটা গোটা অক্ষরে।
তিনি বলতেন, “জ্ঞানী ভূত যদি থেকেই থাকেন, তাঁর সাথে একদিন তর্ক করে আসব।”
তিনটি প্রশ্ন
অগ্রহায়ণের এক রাতে টেস্ট পরীক্ষার খাতা দেখতে দেখতে দেরি হয়ে গেল। স্কুল থেকে যখন বের হলেন, তখন রাত এগারোটা পেরিয়েছে। কুয়াশা নেমেছে ঘন হয়ে, টর্চের আলো তিন হাত গিয়েই হারিয়ে যাচ্ছে।
বেলগাছের কাছে আসতেই টের পেলেন, ঝিঁঝির ডাক থেমে গেছে।
বাতাসে একটা গন্ধ — ধূপ আর পাকা বেলের মেশানো, ভারী, মিষ্টি।
তারপর ওপর থেকে গলাটা এল।
মোজাম্মেল হকের পা দুটো মাটিতে গেঁথে গেল। টর্চটা ওপরে তুললেন — ডালপালার অন্ধকারে কিছুই দেখা গেল না। শুধু মনে হলো, অনেক উঁচুতে, পাতার ফাঁকে, একজোড়া শীর্ণ পা ঝুলছে। সাদা ধুতির পাড় নড়ছে বাতাস ছাড়াই।
গলা শুকিয়ে এসেছিল, তবু শিক্ষকের অভ্যাসে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন।
“প্রথম ধাঁধা,” গলাটা বলল, ধীরে, প্রতিটি শব্দ মেপে। “আগুনে জন্মায়, আকাশে চড়ে, কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে পড়ে।”
এক মুহূর্ত ভেবে মোজাম্মেল বললেন, “মেঘ। সূর্যের তাপে জল বাষ্প হয়, মেঘ হয়ে আকাশে ওঠে, বৃষ্টি হয়ে নামে।”
ওপরে একটা মৃদু, সন্তুষ্ট শব্দ। “উত্তম। দ্বিতীয়। যত নেবে, তত পেছনে ফেলে যাবে।”
এটা তিনি জানতেন। “পায়ের ছাপ।”
“উত্তম।” এবার গলাটা একটু নেমে এল, যেন কেউ ডাল বেয়ে কাছে আসছে। মোজাম্মেলের ঘাড়ের কাছে ঠান্ডা লাগল। “তৃতীয়। এবং শেষ।”
“যা তোমার, একান্তই তোমার। অথচ তুমি নিজে তাকে সবচেয়ে কম ব্যবহার করো, অন্যেরা করে সবচেয়ে বেশি।”
মোজাম্মেল হক ভাবলেন। কুয়াশার ভেতর নিজের নিঃশ্বাসের শব্দ শুনলেন। তেইশ বছরের শিক্ষকতা, হাজার হাজার ছাত্র। তাঁর যা আছে, যা তিনি নিজে কম খরচ করেন, অথচ অন্যেরা নিয়ে যায় দু হাত ভরে—
“বিদ্যা,” তিনি বললেন। দৃঢ় গলায়।
অনেকক্ষণ কোনো শব্দ নেই।
তারপর ওপর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস। শুকনো পাতা ঝরার মতো।
“ভুল, মাস্টার। বিদ্যা দিলে কমে না, বাড়ে — এ তো তুমি নিজেই ক্লাসে পড়াও। উত্তর ছিল, নাম।”
“তোমার নাম তোমার। কিন্তু তুমি নিজেকে কদাচিৎ নাম ধরে ডাকো। ডাকে অন্যেরা।”
একটু থেমে, প্রায় করুণার সুরে:
“তবে নামটাই রেখে যাও।”
নামহীন
কীভাবে বাড়ি পৌঁছেছিলেন, মনে নেই। সকালে ঘুম ভাঙল জ্বরের ঘোরে। স্ত্রী মাথায় পানি ঢালছিলেন।
“কাল রাতে কোথায় ছিলে? কত ডাকলাম—” বলে তিনি থেমে গেলেন। ভুরু কুঁচকে তাকালেন স্বামীর দিকে, যেন একটা শব্দ জিভের ডগায় এসে আটকে গেছে। তারপর শুধু বললেন, “শুনছ? ওঠো।”
দুপুরে স্কুলে গেলেন। ছাত্ররা উঠে দাঁড়িয়ে সালাম দিল। “স্যার।” শুধু “স্যার।”
হেডস্যার শিক্ষক-হাজিরার খাতা এগিয়ে দিলেন। মোজাম্মেল দেখলেন, তেইশ বছর ধরে যে লাইনে সই করে আসছেন, সেখানে নামের ঘরটা ফাঁকা। কালি মুছে যায়নি, ঘষা দাগও নেই। যেন কোনোদিন কিছু লেখাই হয়নি।
“আপনি, মানে, স্যার—” হেডস্যার আমতা আমতা করলেন। “আপনার নামটা যেন কী? আশ্চর্য, মুখে আসছে না।”
মোজাম্মেল কলম তুলে নিজের নাম লিখতে গেলেন।
কলমটা কাগজের ওপর স্থির হয়ে রইল।
তিনি জানেন তাঁর একটা নাম আছে। জানেন, সেটা কাল পর্যন্ত ছিল। কিন্তু যেখানে নামটা থাকার কথা, মাথার ভেতর সেখানে শুধু একটা ঠান্ডা, সাদা ফাঁকা জায়গা। কুয়াশার মতো।
সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে দেয়ালে টাঙানো বিএড পাসের সার্টিফিকেটটা নামালেন। কাচের নিচে তাঁর ছবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিল, তারিখ। নামের জায়গায় শুধু একটা সাদা দাগ।
এবার প্রশ্ন আমার
তিন রাত পর তিনি আবার গেলেন বেলতলায়। একা, টর্চ ছাড়া।
“নামটা ফেরত দিন,” অন্ধকারের দিকে মুখ তুলে বললেন। “আরেকটা ধাঁধা দিন। এবার ঠিক বলব।”
ওপর থেকে উত্তর এল, কিন্তু গলাটা এবার অন্যরকম। হালকা, প্রায় আনন্দিত।
“আমিও একদিন এই কথা বলেছিলাম, মাস্টার। বহু বছর আগে, এই গাছের তলায়। আমারও একটা নাম ছিল। আজ আর মনে নেই, কী ছিল।”
“নিয়ম একটাই। কেউ তোমার ধাঁধার উত্তর ভুল দিলে, তার নামটা তুমি পাবে। যেকোনো একটা নাম। তাতেই চলে যায়।”
পাতার খসখস। একটা হালকা বাতাস। তারপর গাছটা নীরব হয়ে গেল, এমন নীরব যেমন আগে কখনো ছিল না।
পরদিন থেকে গ্রামের লোকে ভিটাটার কথা বলতে গিয়ে একটা অদ্ভুত নাম বলতে লাগল। কেউ জানে না কোথা থেকে এল নামটা। কেউ জানে না সে কে ছিল।
সবাই বলে, “মোজাম্মেল হকের বেলগাছ।”
আর স্কুলের বাংলার শিক্ষক, যাঁর নাম কারো মনে পড়ে না, আজকাল প্রায় রাতেই দেরি করে বাড়ি ফেরেন। গাছটার নিচে, ঘন কুয়াশায়, অপেক্ষা করেন। পথিকের পায়ের শব্দ শুনলে গলাটা পরিষ্কার করে নেন, ক্লাসে যেমন করতেন।
তারপর বলেন, নরম, ধৈর্যশীল গলায়:
“দাঁড়াও। একটা ধাঁধার উত্তর দিয়ে যাও।”