রূপমহল হলের শেষ শো
তেত্রিশ বছর ধরে তালাবন্ধ মফস্বলের সিনেমা হল। মাঝরাতে নিজে নিজে চালু হয় পোড়া প্রজেক্টর, আর পর্দায় ভেসে ওঠা পুরনো দিনের দর্শকদের ভিড়ে একটা চেনা মুখ।
- ৫ মিনিট
- ০ বার পড়া হয়েছে
বন্ধ গেটের ওপারে
আমি রাফসান করিম। ফিল্ম স্কুল থেকে বেরিয়েছি দুই বছর হলো, এখনও কোনো ফিচার বানানোর টাকা জোগাড় হয়নি, তাই ছোট ছোট ডকুমেন্টারি বানাই। আমার এবারের ডকুমেন্টারির নাম ঠিক করেছিলাম “অন্ধকার পর্দা”। বিষয় বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া সিঙ্গেল-স্ক্রিন সিনেমা হল। গত এক বছরে এগারোটা জেলা ঘুরেছি। কোনোটা ভেঙে মার্কেট হয়েছে, কোনোটা গুদাম। শুধু নবীনগরের রূপমহল হলটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক যেমন ছিল, শুধু তালাবন্ধ।
হলের সামনের চায়ের দোকানে বসে শুনলাম, একানব্বই সালের ডিসেম্বরে এক রাতে শেষ শো চলার সময় প্রজেকশন রুমে আগুন লেগেছিল। কতজন মারা গিয়েছিল, কেউ ঠিক বলতে পারে না। কেউ বলে সাত, কেউ বলে সতেরো। তারপর থেকে হল আর খোলেনি।
দারোয়ান মতিন মিয়া, বয়স সত্তরের ওপরে, অনুমতি দিল না। “দিনের বেলা আসেন, ছবি তোলেন। রাইতে না।”
বলার সময় তার চোখ একবার হলের ওপরের দিকে, প্রজেকশন রুমের ছোট্ট চৌকো জানালাটার দিকে চলে গেল। তারপর সে তাড়াতাড়ি অন্যদিকে তাকাল।
কিন্তু আমার দরকার ছিল রাতের শট। অন্ধকার হলের ভেতর একটা টর্চের আলো, ধুলো উড়ছে, ভাঙা সিটের সারি। সেই ফ্রেমটা আমার মাথায় গেঁথে ছিল।
রাত সাড়ে এগারোটায় পেছনের দেয়ালের ভাঙা জানালা দিয়ে ঢুকলাম।
ধুলোর হলঘর
ভেতরে ঢুকেই গন্ধটা নাকে লাগল। পুরনো ভেলভেট, বাদুড়ের বিষ্ঠা, আর অনেক নিচে চাপা পড়া একটা পোড়া গন্ধ, তেত্রিশ বছরেও যেটা যায়নি।
হলটা বিশাল। নিচে সাধারণ শ্রেণি, ওপরে ডিসি আর মহিলাদের আলাদা ব্যালকনি। পর্দাটা এখনও টাঙানো, হলদেটে আর জায়গায় জায়গায় ছেঁড়া। দেয়ালে আধখসা পোস্টার, নায়কের রং-চটা মুখ।
বাইরে তখন মফস্বলের রাত। দূরে কোথাও একটা কুকুর ডাকছে, মাঝে মাঝে রিকশার টুংটাং। কিন্তু হলের মোটা দেয়াল পেরিয়ে সেসব শব্দ ভেতরে এসে কেমন মরে যাচ্ছিল। ভেতরের নীরবতাটা ছিল ভারী, যেন অনেক মানুষ একসঙ্গে দম আটকে বসে আছে।
ট্রাইপড বসালাম মাঝখানের সারিতে। টর্চের আলো ঘুরিয়ে সিটগুলোর ওপর ফেলতে লাগলাম। প্রতিটা সিটের পিঠে পেতলের ছোট্ট নম্বর। এফ-দশ, এফ-এগারো, এফ-বারো।
এফ-বারো সিটটা অদ্ভুত। চারপাশের সব সিটে পুরু ধুলো, ছেঁড়া গদি। শুধু এই একটা পরিষ্কার, যেন কেউ রোজ মুছে রাখে।
আমি ক্যামেরা চালু রেখে সিটটায় বসলাম। ভাবলাম, ফ্রেমে নিজেকে রাখব, একজন একা দর্শক।
ঠিক তখনই পেছনের ওপরের দেয়াল থেকে একটা শব্দ এল।
খটখট খটখট খটখট।
প্রজেক্টরের রিল ঘোরার শব্দ।
পর্দার ভেতরের দর্শক
প্রজেকশন রুমের ছোট্ট জানালা দিয়ে একটা সাদা আলোর ফালি বেরিয়ে এল। ধুলোর কণাগুলো সেই আলোয় সোনার মতো ভাসছে। আলোটা গিয়ে পড়ল পর্দায়।
প্রথমে শুধু দাগ আর ঝিরঝির। তারপর একটা ছবি ফুটে উঠল, সাদাকালো, কাঁপা কাঁপা।
ছবিটা একটা সিনেমা হলের। রূপমহলের। একই পর্দা, একই দেয়াল, একই পোস্টার, শুধু নতুন। আর হলভর্তি মানুষ।
লুঙ্গি পরা কৃষক, চাদর জড়ানো বুড়ো, ব্যালকনিতে বোরকা পরা মহিলারা কোলে বাচ্চা নিয়ে। কেউ বাদাম খাচ্ছে, কেউ বিড়ি ধরাচ্ছে। সবার মুখ পর্দার দিকে, মানে আমার দিকে। ক্যামেরাটা ধীরে ধীরে সারির পর সারি পার হয়ে যাচ্ছিল।
কিন্তু কিছু একটা ঠিক ছিল না। কেউ হাসছে না, কেউ নড়ছে না ঠিকমতো। বাদাম ভাঙার হাত মাঝপথে থেমে আছে, বিড়ির ধোঁয়া উঠছে না, ঝুলে আছে। মুখগুলো এত ফ্যাকাশে যে সাদাকালো ছবিতেও আলাদা করে চোখে পড়ে। যেন সবাই অনেকক্ষণ ধরে কিছু একটার অপেক্ষায় বসে আছে।
আমার হাত-পা জমে গেল। কারণ পর্দার ক্যামেরা যেখান দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেখানকার সিটগুলো আমার চারপাশে।
এ-সারি। বি-সারি। সি-সারি।
এফ-সারিতে এসে ক্যামেরা থামল।
এফ-বারো সিটে একজন যুবক বসে আছে। গায়ে গাঢ় রঙের জ্যাকেট, হাতে একটা কালো যন্ত্র ধরা, চোখ পর্দার দিকে।
লোকটা আমি।
পর্দার ভেতরে টর্চ হাতে একজন গেটম্যান হেঁটে এল আমার সিটের পাশে। আমার দিকে হাত বাড়াল। পর্দার আমি পকেট থেকে কিছু একটা বের করে তার হাতে দিলাম। সে কাগজটা আধখানা ছিঁড়ে বাকিটা ফেরত দিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে আমার বুকপকেটে কিছু একটা খসখস করে উঠল।
হলভর্তি মানুষ, সবাই একসঙ্গে, ধীরে মাথা ঘোরাল। পর্দা থেকে নয়, আমার চারপাশের অন্ধকার থেকে আমি শুনলাম শত শত পুরনো কাঠের সিটের ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ।
আমি দৌড়েছিলাম। কোন দিক দিয়ে বেরিয়েছি জানি না।
এফ-বারো
ভোরে মতিন মিয়া আমাকে হলের সিঁড়িতে পেল। আমার হাতে তখনও ক্যামেরা।
তাকে সব বললাম। বলতে বলতে টের পেলাম আমার গলা কাঁপছে, আর সকালের রোদেও আমার আঙুলগুলো বরফের মতো ঠান্ডা।
সে চুপ করে শুনল, তারপর বলল, “প্রজেক্টর ঐ আগুনেই গইলা গেছে, বাবা। কারেন্টের লাইনও কাটা।”
আমি বুকপকেটে হাত দিলাম। একটা আধছেঁড়া হলদে টিকিট। ছাপা অক্ষরে লেখা।
টিকিটটা দেখে মতিন মিয়ার মুখের রং বদলে গেল। অনেকক্ষণ পর সে বলল, তার আব্বা সেই রাতে গেটম্যান ছিলেন। আগুন লাগার আগে শো শুরু হতে দেরি হচ্ছিল। প্রজেক্টর বারবার আটকে যাচ্ছিল। আব্বা পরে বলতেন, হাউসফুল শো, সব টিকিট বিক্রি, শুধু একটা সিট খালি। এফ-বারো। টিকিট কেটেছিল কেউ একজন, কিন্তু আসেনি।
টিকিটটা আমি ফেলে দিতে চেয়েছিলাম। নবীনগর থেকে ফেরার বাসে জানালা দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছিলাম। ঢাকায় পৌঁছে মানিব্যাগ খুলে দেখি, টিকিটটা ভেতরে, ভাঁজ করা, যেন কেউ যত্ন করে রেখে দিয়েছে।
ঢাকায় ফিরে ক্যামেরার ফুটেজ দেখেছি। আমি হলে ছিলাম বড়জোর পনেরো মিনিট। ক্লিপের দৈর্ঘ্য দুই ঘণ্টা সাত মিনিট।
পুরোটা জুড়ে একটা অন্ধকার হল। আর এফ-বারো সিটে আমি বসে আছি, নিশ্চল, পর্দার দিকে তাকিয়ে।
শেষ কয়েক সেকেন্ডে ফুটেজের আমি ধীরে মাথা ঘোরাই, সোজা ক্যামেরার দিকে তাকাই, আর ঠোঁট নেড়ে কিছু একটা বলি।
পেছনের অন্ধকারে, প্রতিটা সারিতে, প্রতিটা সিটে, অস্পষ্ট মাথার সারি। সবাই আমার দিকে ফিরে আছে।
শব্দ নেই। কিন্তু ঠোঁট পড়তে আমার কষ্ট হয়নি।
“পরের শো রাত নয়টায়।”